একটি হতাশা জয়ের গল্প (সত্যি ঘটনা)

0

সারা বুশরা দ্যুতি:

সন্তান ধারণের ব্যাপারটি যখন নিশ্চিত হয়েছিলাম তখন কল্পনায় ছিল আমাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনার পরিবারের জন্য এটি সবচেয়ে আনন্দের খবর হবে, কারণ দুটি পরিবারেই এটি প্রথম গ্রান্ডচাইল্ড। দু পরিবারের সবাই এ খবরে উল্লাসে মেতে উঠবে। আমার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও কনসার্ন দ্বিগুণ হয়ে যাবে। আমার সন্তানটি যখন পৃথিবীতে আসবে, সবার আদর, ভালোবাসা ও আশীর্বাদে তার জীবন হয়ে উঠবে মঙ্গলময়।

কল্পনায় সবই সুন্দর। বাস্তবটা অন্যরকম, আমার বা আমার সন্তানের সাথে এরকম কিছুই হলো না। নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম এই বলে যে, আমি দেশের বাইরে থাকি, অতো দূর থেকে কার পক্ষে আর কতটুকুই বা করা সম্ভব? আমার মায়ের ক্যান্সারের চিকিৎসা চলছিল। আপ্রাণ প্রচেষ্টার পরও তিনি আমার কাছে আসতে পারলেন না। আমার শ্বশুরের সে সময় পরপর দু’বার হার্টে অপারেশন হলো, তাই স্বাভাবিকভাবেই তাকে নিয়েই শ্বশুরবাড়িতে সবাই ব্যতিব্যস্ত ছিল। ওই বাড়িতে তাই আমার খোঁজখবর নেয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হলো না।

এর মধ্যে আমার দাদী মারা গেলেন। আমার হাসব্যান্ড এর তখন কোনো এক কারণে সেই সময়টাতেই অফিসে কাজের চাপ খুব বাড়লো। পরিশ্রান্ত হয়ে সে বাড়ি ফিরতো। তখন আর নিজের মনের কথাগুলো বলা হয়ে উঠতো না।

আমি সে সময়ে স্কুলে জব করতাম। বেশ অনেকটা পথ হেঁটে, তারপর বাকিটুকু বাসে করে যাওয়া আসা করতে হতো। Gestational diabetic ধরা পড়ার কারণে খাবার দাবারে ভীষণভাবে রেস্ট্রিকশন এসে গিয়েছিলো। নিজে নিজে ইনসুলিন নিতাম রোজ ঘড়ি ধরে…আর অন্যান্য শারীরিক কষ্টগুলো আলাদা করে নাই বা বললাম, ধীরে ধীরে ন’টা মাস কেটে গেলো।

একটি সরকারি হসপিটালে আমার মেয়ের জন্ম হলো। শেষ মুহূর্তে কিছু কমপ্লিকেসি দেখা দেয়াতে ডাক্তাররা সি সেকশন করতে বাধ্য হলেন। বাংলাদেশে যেমন ওটাই নরমাল, এখানে তা নয়, এখানকার ডাক্তাররা সি সেকশন করাটা পারতপক্ষে প্রেফার করেন না। আমাকে বলে দিলেন, এটা একটা মেজর অপারেশন। নিজের টেক কেয়ার করবে, খুব সাবধানে থাকবে। ভারী কিছু তুলবে না, ড্রাইভ করবে না ইত্যাদি ইত্যাদি।

দুদিনের মাথায় তারা আমাকে ছেড়ে দিলো। আমি নিজেও বাড়ি আসতে চাইছিলাম। হসপিটালে দুই রাত কাটিয়ে আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। বাচ্চার বাবাকেও তারা থাকতে দেয়নি রাতে। খুব অসহায় বোধ করছিলাম। লন্ডন থেকে কিছুটা দূরের একটি শহরে থাকায় আমার কোনো বন্ধু, কোনো আত্মীয়, এমনকি চেনা কেউও হাসপাতালে আমাকে বা আমার শিশুটিকে দেখতে আসেনি। পুরো দুটো দিন আমি একা ছিলাম, মাঝরাতে বহুবার বেল বাজিয়েও কোনো নার্সকে কাছে পাইনি।
যেখানে আমার নিজের একটু সেবা, একটু যত্ন দরকার, সেখানে আমার একাই নিজেকে সামলে আরেকটি ছোট্ট শিশুকে দেখাশোনা করতে হবে এবং সেটা নিজের সব শারীরিক কষ্ট উপেক্ষা করে সেই প্রথম উপলব্ধি করলাম। সেই নিঃসঙ্গ অসহায় রাতে হসপিটালের ছোট্ট রুমে দুদিনের একটি শিশুকে কোলে নিয়ে জীবনের সবচেয়ে আশ্চর্য আর কঠিন সত্যিটা টের পেলাম। তখনও জানি না এক বিশ্রী রোগের সূচনা ইতিমধ্যে হয়ে গেছে।

বাড়ি ফেরার কয়েকদিনের মাথায় রোগটা প্রকট হয়ে ধরা দিলো। পৃথিবীর সবকিছু অসহনীয় লাগতে লাগলো। সব হাসি আনন্দ গান সব মুছে দিয়ে কে যেন জোর করে আমাকে একটা অন্ধকার কুঠুরিতে বন্ধ করে দিয়েছে, যেখান থেকে আর আমার মুক্তির পথ নেই, এটাই কেবল মনে হতে লাগলো। আমি মূল্যহীন, আমার জীবন অর্থহীন। কেউ আমাকে ভালোবাসে না…সবাই আমাকে ভুলে গেছে। কারো জীবনে আমাকে আর প্রয়োজন নেই।

একটি শিশু আমার আছে, আমার বেঁচে থাকতে হবে শুধুমাত্র তাকে দেখাশোনা করার জন্য, আমি না চাইলেও। শিশুটি যে আমার অনেক শখের, অনেক চাওয়ার, সেটি আর মানতে ইচ্ছে করতো না, সারাক্ষণ একটা ক্রোধ কাজ করতে লাগলো। যে শিশুটির আমার জীবনে আনন্দ ও পরিপূর্ণতা নিয়ে আসার কথা, সে নিয়ে আসলো শুধু কষ্ট আর যন্ত্রণা।

শিশুটিকেও হিংসা করা শুরু করলাম। মনে হলো তার মতো এইটুকু মানুষের দেখাশোনা করার জন্যও আমার মতো একজন 24/7 আছে, কিন্তু আমি এতোই অধম যে আমার খেয়াল করার জন্য কারো কাছে পাঁচ মিনিটও নেই। আমি আরও সরব হলাম। চিৎকার, আহাজারি করে কান্নাকাটি শুরু করলাম। নিজের বাচ্চার প্রতি অপরিসীম এক বিরক্তি ভাব, সংসারের প্রতি ঔদাসীন্য, আর স্বামীর প্রতি নিদারুণ ক্ষোভে যখন তখন ফেটে পড়তে লাগলাম। পুরো পৃথিবীকে মনে হতো শত্রু।

রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে শরীরটা অসম্ভব দুর্বল হয়ে গেছিলো। খাওয়া দাবার এর কোনো নিয়ম ছিলো না। আমার স্বামী অফিস থেকে এসে খাবারের ব্যবস্থা করতো, তখন কিছু খেতাম। আত্মীয় স্বজন কারো সাথে কথা বলতাম না ফোনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায়, পাছে তাদের কাছে এই অস্বাভাবিক অবস্থা ধরা পড়ে যায়। দেশের মানুষ শুনলে নিশ্চই বলবে,
‘এইগুলা কী সব ফালতু অসুখের নাম যে শুনি আজকাল! ষোলো বছর বয়স নাকি যে একা একা কিছু পারবে না? এসব আসলে কোনো রোগ না, শুধু দুঃখ বিলাস। যুগে যুগে মেয়েরা কতো কষ্টই তো করলো, এগুলা আবার বলার মতো কিছু নাকি? আমরা যেন আর মা হই নাই , হুহ!’

এসব শোনার থেকে আমার ওই ভয়ঙ্কর বিভীষিকাময় জীবনেই থাকি থাকি! কেউ তো উপকার কিছু করবে না, খামোখা কিছু বলে মুখ নষ্ট করে কী লাভ?

বাচ্চাটা সারারাত জেগে থাকতো, আর একটু পর পর কাঁদতো দেখে তার বাবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতো। মানুষটার ঘুম প্রয়োজন কারণ তার অফিসে গিয়ে কাজ করতে হয়। তাই বাচ্চা নিয়ে আমি সারারাত আরেক রুমে বসে থাকতাম, এমন দিনও গেছে আমি সারা রাত সোফায় বসে নীরবে কাঁদছি, আর অপেক্ষা করছি কতক্ষণে সকাল হবে আর মেয়েটা একটু ঘুমোবে। টিভি, সিনেমা সব সবকিছুর আকর্ষণ হারিয়ে গেছিল, কিছুই দেখতে ইচ্ছা করতো না। সব বন্ধ করে শুধু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বসে অপেক্ষা করতাম।

একদিন আমার স্বামীকে বললাম এই বাচ্চাটা আমার দরকার নেই। অন্য কাউকে দিয়ে এসো, ওর জন্য আমার জীবনটা শেষ হয়ে গেছে। আমি আর পারছি না। সে আমাকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলো, বললো একটু ধৈর্য ধরতে, বাচ্চাটা একটু বড়ো হলে আমি বেটার ফিল করবো,তখন আমার এতো কষ্ট থাকবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। বোঝানোর পরও তার কথায় কাজ হলো না। হওয়ার কথা নয়। The feeling of being abandoned was killing me inside … লজিক বোঝার স্টেটে আমি ছিলাম না।

ওর উপর ক্ষোভে তখন আমি অন্ধ হয়ে যাচ্ছি। সারাক্ষণ মনে হতো, আমার পাশে তো ও ছাড়া কেউ নেই, সেটা কেন ওর চোখে পড়ছে না? কেন ধৈর্য হারিয়ে বারবার রেগে যাচ্ছে? কেন ঠাণ্ডা মাথায় হাসি মুখে আমাকে স্নেহ করে কথা বলছে না? সে কি বুঝতে পারছে না আমি কত বঞ্চিত, কত একা? সে কেন আমার বাকি সব অভাবগুলো তার ভালোবাসা দিয়ে পূরণ করে দিচ্ছে না?

এখন যখন যুক্তি দিয়ে ভাবি, তখন বুঝি ওর জন্যও ওই পরিস্থিতি কঠিন ছিল। সেও এরকম অভূতপূর্ব ঘটনার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলো না। সারাদিন কাজের মধ্যেও ভয়ে ভয়ে থাকা, বৌ-বাচ্চা ঠিক আছে কিনা, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলো কিনা!

দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি এসে খাবার দাবারের বাবস্থা করা, সেইসাথে স্ত্রী অনবরত চিৎকার করে কাঁদছে, পাগলের মতো অস্থির হচ্ছে, সেও হয়তো অসহায়ত্ব বোধ থেকেই ধৈর্য হারাতো! একজন বিষন্ন মানুষ তার আশেপাশের সবাইকে বিষন্ন করে দেয়। অসুস্থ মানুষের পাশে নিজেকে সুস্থ রাখাই যেখানে বিরাট চ্যালেঞ্জ, সেখানে আদর্শ হাসব্যান্ডের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া গল্প বা সিনেমার নায়ক ব্যতিত কারো পক্ষে কতটা সম্ভব সেটা নিশ্চয়ই প্রশ্ন সাপেক্ষ।

মনোবিজ্ঞানের ছাত্রী হিসেবে ডিপ্রেশন সম্পর্কে আমার অনেক কিছুই জানা ছিল। পোস্ট নাটাল ডিপ্রেশন সম্পর্কেও ভাসা ভাসা ধারণা ছিল। কিন্তু নিজের জীবনে যখন কিছু ঘটে তখন পূঁথিগত বিদ্যা প্রয়োগ করা যায় না। ডক্টরের পরামর্শ নেয়াই তখন একমাত্র অপশন ছিল। কারণ নেটে এই রোগটি সম্পর্কে পড়ে ততদিনে আমরা জেনে গেছি, এই রোগী এক্সট্রিমে গেলে শুধু আত্মহত্যা নয়, নিজের সন্তানকে পর্যন্ত মেরে ফেলতে পারে।

গেলাম ডাক্তারের কাছে। তিনি সব শুনে আমাকে সান্ত্বনা দিলেন। বললেন, তুমি কোনো মানসিক রোগী নও, অনেক মেয়েদের হয়, এটা সাময়িক। নিজেকে ভালোবাসাতে কখনো কার্পণ্য করা যাবে না। অন্য কেউ কেয়ার না করুক, তুমি নিজেই যথেষ্ট তোমার জন্য। আর কে বলেছে বাচ্চার ক্ষতি হবে তোমার সাথে থাকলে? আমি তো দেখতে পাচ্ছি কী সুন্দর হেলদি বাচ্চা, তার মানে তুমি মা হিসেবে তোমার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছো। নাইস, ক্লিন জামা কাপড় পরিয়ে এনেছো। চুল বেঁধে দিয়েছো। ম্যাচ করে হেয়ার ব্যান্ড লাগিয়েছো। কত প্রিটি লাগছে তোমার মেয়েকে। এগুলো তো সব তোমারি অবদান। You are doing a great job, very well done.

আমি জানি একথাগুলো রোগীকে মানসিকভাবে বেটার ফিল করানোর জন্যই বলা, তবু আমার মনে হলো সত্যিই তো, আমি তো কখনো আমার বাচ্চাকে অবহেলা করিনি, এতো কষ্টের মধ্যেও ওর সব কাজ করেছি, ঠিকমতো খেয়াল রেখেছি। নিজের সাথে অবিরত যুদ্ধ করতে করতে বিধ্বস্ত হয়েছি, কিন্তু মেয়েটাকে কখনো, কোনোভাবে অযত্ন করিনি। বহুদিন পরে যেন মনে হলো আমি অনেক বড় কিছু করতে পারি/পারছি…. আর সেটা কারো চোখে অবশেষে ধরা পড়েছে। কেউ তো স্বীকার করলো যে, বাচ্চা মানে শুধুই দুধ খাওয়ানো বা ন্যাপি চেঞ্জ করা নয়। এর থেকে অনেক অনেক বেশি কিছু।

যে মেয়েটি সদ্য মা হয় সে প্রতি মুহূর্তে দিশাহারা হয় কীভাবে কী করবো ভেবে। প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে এক কঠিন পরীক্ষার মতো লাগে যেখানে সে না চিনে কোনো প্রশ্ন, না জানে সেগুলোর উত্তর… পৃথিবীর সব নব্য মা’ র এই নতুন পরিস্থিতে ধাতস্থ হতে সময় লাগে। তার উপর সে যদি মেন্টালি আনস্টেবল থাকে, সাথে যোগ হয় একাকিত্ব, তাহলে তো পুরো ব্যাপারটা অকল্পনীয় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

কোনও মেয়ে মা হওয়া শিখে আসে না। করতে করতে শেখে। আর এই শেখার সাথে লাগে আশেপাশের মানুষের সহযোগিতা, স্নেহ, সহমর্মিতা এবং সবচেয়ে প্রধান জিনিস সেটা হচ্ছে এপ্রিসিয়েশন। তাকে স্বীকৃতি দেয়া যে, ‘তুমি অনেক বড় একটা কাজ করছো এবং কাজটির জন্য তুমি নি:সন্দেহে শ্রদ্ধা ও প্রশংসার দাবিদার”…এই সামান্য কথাটার যে কতখানি মূল্য সেদিন বুঝতে পারলাম।

যাই হোক, আমার চিকিৎসক মানসিক সাপোর্ট এর সাথে সাথে আমাকে একটি ওষুধও দিলেন।
ডিপ্রেশনের ওষুধের সমস্যা হলো, ওষুধটা অনেকটা ড্রাগস্ এর মতোই যেটা একবার শুরু করলে ফট করে ছাড়ার নিয়ম নেই, ধীরে ধীরে ছাড়তে হয় নাহলে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। পুরো ব্যাপারটি ভালো করে বুঝিয়ে দিলেন তিনি। প্রথম ছয় মাস লাগাতার সাইকেল মেইনটেইন করে খেতে হবে, তারপর একটু কমিয়ে, এভাবে আস্তে আস্তে ছাড়তে হবে। নিয়মে যেন কোনো ব্যতিক্রম না হয়, আর কোনভাবেই যেন কোনো দিন/সাইকেল মিস না হয়, বারবার সতর্ক করে দিলেন।

আমি মৃদু আপত্তি জানিয়েছিলাম যে ওষুধের উপর এতটা নির্ভরশীল হতে চাই না, এটা অনেকটা এডিকশনের মতো, খেলে একটু রিলাক্স লাগে, না খেলে আবার সেই আগের মতো। তখন ওষুধ কন্টিনিউ করা ছাড়া গতি নেই…দুদিকেই অসুবিধা। তবু সেই মুহূর্তে হয়তো সাময়িক মুক্তির প্রয়োজনটা বেশি ছিল, তাই ওষুধ কন্টিনিউ করাটাই মনস্থ করলাম।

গড়িয়ে গিয়েছিলো আরো কিছুটা সময়, শরীর আগের থেকে ভালো হলো, সেই সাথে আপ্রাণ চেষ্টা ছিল মনোবলটা ফিরে পাওয়ার। এরকমই একটা সময়ে একদিন হঠাৎ একটা ঘটনা ঘটলো। খুবই তুচ্ছ ঘটনা, কিন্তু সেটা আমার মনোজগতে বিরাট এক ধাক্কা মেরে জীবনটাকে আবার পাল্টে দিলো…

ঘটনাটা বলি,
মেয়েটা ঘুমোচ্ছিলো। তার শরীরটা দুদিন ধরে বেশ খারাপ। অনেক সাধনা করে বহু সময় নিয়ে তাকে ঘুম পাড়ানো লাগে। সামান্য শব্দ হলেই সে উঠে যায়, আমি বাথরুমেও ভয়ে যাই না, পাছে খাট থেকে নামার সামান্য শব্দে তার ডিসটার্ব হয়। গত আট ঘন্টা ধরে তার শরীরের অস্বস্তি এমন পর্যায়ে যে, বেডে আর শোয়ানো যাচ্ছে না। আমি তাকে কোলে নিয়ে একভাবে সাত/আট ঘন্টা ধরে ঠায় বসা, আমি নড়লেই সে ঘুম ভেঙ্গে চিৎকার করে কাঁদে।

আমি মোটামুটি স্ট্যাচু অবস্থায় আছি, হাত ঘাড় কোমর সব ব্যথায় টনটন করছে। বাচ্চার বাবা সাইড টেবিলে খাবার এনে রাখলো আমার জন্য, বললো, আমি ওকে কোলে নিচ্ছি তুমি গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে মুখটা ধুয়ে এসে খাবারটা খাও.. আমি অতি সন্তর্পনে তাকে তার বাবার কোলে দিতেই সে আবার বিকট চিৎকার দিলো। খেয়াল করে দেখলাম তার চোখ বন্ধ। আধো ঘুম আধো জাগরণে সে চিৎকারটা দিয়েছে। আমি আমার হাতটা বাড়িয়ে তার গায়ে রাখলাম। সঙ্গে সঙ্গে সে আবার ঘুমিয়ে পড়লো। তখন বাবার হাতের ভাঁজটা ঠিক করে দিলাম, বললাম এভাবে নাও, আরাম পাবে। গুছিয়ে আবার তাকে তার তার বাবার কোলে দিতেই মেয়ে ঘুমের মধ্যেই কেঁদে উঠলো, আবার হাত সরালাম আবারও কান্না। এরকম বার চারেক হওয়ার পর আমি তার বাবাকে বললাম, তুমি আমার সাথে বেসিন পর্যন্ত এসো, আমি একহাত ওর গায়ে দিয়ে রাখবো, আরেক হাতে মুখ ধোবো। সে তাই করলো।

এই যে মুহূর্তটি আমার জীবনে আসলো সেই মুহূর্তেই আমি আবিষ্কার করলাম, এই ছোট্ট বাচ্চাটা আমার উপর কী পরিমাণ নির্ভরশীল! আমার একটা সামান্য স্পর্শ তার জন্য কতখানি অপরিহার্য! সে চোখ বন্ধ করে আমাকে অনুভব করতে পারে, আমার গায়ের গন্ধ চিনে, আমার মধ্যেই তার সবটুকু আশ্রয়, সবটুকু আরাম। তার কান্না তার বাবা শত চেষ্টা করলেও থামাতে পারে না, কিন্তু আমি তার একটা আঙুলে হাত বুলিয়েই তাকে চুপ করাতে পারি।

কী অদ্ভুত, কী অসাধারণ, কী অবর্ণননীয় এই অনুভূতি! কে বলে আমি মূল্যহীন? এই বাচ্চাটির তো পুরো পৃথিবীটাই আমিময়। আর তাকেই কিনা আমি আমার শত্রু ভেবে এসেছি? আমার জীবন নষ্ট করার জন্য কতবার তাকে দায়ী করেছি? একবার ভাবলাম না এই ছোট্ট বাচ্চাটা যে আমার কোল জুড়ে পরম নির্ভরতায়, পরম প্রশান্তিতে ঘুমোচ্ছে, সে আমার থেকেও অনেক অনেক বেশি অসহায়। তার বয়সে আমি কত মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি। নানী, দাদী, চাচা, ফুপু, মামা, খালা, জ্ঞাতি গোষ্ঠি, আত্মীয় স্বজন, এমনকি পাড়ার লোকজনেরও নয়নের মনি ছিলাম আমি, জয়েন্ট ফ্যামিলিতে আমার জন্ম। ঘর ভর্তি লোক, কত স্নেহ, কত আদর। কত সৌভাগ্যবতী আমি! আর আমার মেয়েটা কতো দুঃখী। তাকে আদর করার, প্রশ্রয় দেয়ার, যত্ন করার কেউ নেই তার মা ছাড়া। আর সেই মা-ই কিনা তাকে একদিন শুধু অপবাদ দিয়ে এসেছে? কী লজ্জা! কী লজ্জা! এই নিস্পাপ শিশুটির কী দোষ ছিল? সেতো নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসেনি। কেন তার সাথে এই অবিচার?

অনুশোচনার আর শেষ হয় না যেন। সেদিন মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমার সাথে যাই হোক না কেন, আমার মেয়েটাকে কোনোভাবেই, কখনোই কোনো দিক থেকে বঞ্চিত করবো না। অন্য কাউকেও করতে দিবো না। আমাকে কেউ ভালোবাসুক বা না বাসুক, আমি কারো চোখে গুরুত্বপূর্ণ হই বা না হই, আমার মেয়ের কখনোই তার গুরুত্ব হারাবে না। আমাকে নিজের ভেতর এতোটা ভালোবাসা ধারণ করতে হবে যেন অন্য কোথাও থেকে মেয়ের কোনো কমতি হলে সেটা আমি পূরণ করে দিতে পারি।

সেদিনের সেই মনের জোর আজও অক্ষুন্ন আছে আমার, আজ আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি, কারো কোনো সাহায্য ছাড়া নিজের মনের জোরে ওই হতাশার সময়টা পার করতে পেরেছি। জীবনকে ইতিবাচক ভাবে নিয়ে নতুন করে বাঁচতে শিখেছি।

তবে এটাও সত্য, এখনও যখন কোনো হবু/নতুন মাকে অনেক আদর-যত্ন পেতে দেখি, নিজের অজান্তেই চাপা একটা দীর্ঘশাস বের হয়। যখন কোনো বেবি শাওয়ার এর প্রোগ্রামে মুখে একরাশ আলো মেখে একটি মেয়েকে আসরের মধ্যমনি হয়ে বসে থাকতে দেখি, আর তাকে ঘিরে বাকি সবার আনন্দ উল্লাস দেখি, চোখের ভেতরটা কেমন জ্বালা করে আবছা হয়ে যায়, যখন দেখি একটি ছোট্ট শিশুকে তার নানী-দাদীরা গোসল দিচ্ছেন, বাচ্চাটিকে সাজিয়ে গুজিয়ে প্রথম মুখে ভাত এর আয়োজন করেছেন, অথবা বাচ্চাটির আঙ্গুল ধরে তাকে হাঁটা শেখাতে চাইছেন, বুকের ভেতরটা কেমন চিনচিন করে ওঠে।

এসব আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে এখনো ঝামেলা পোহাতে হয়, তবে একসময় ঠিকই গা ঝাড়া দিয়ে উঠি, খারাপ লাগাটাকে বেশিক্ষণ পাত্তা দিতে চাই না। জীবনের মূল্য অনেক অনেক বেশি। আমি নিজেকেই নিজে ভালোবেসে কাটিয়ে দিতে পারি এ জীবন। পড়ে গিয়েও তাই নিজে নিজেই উঠে দাঁড়াই, দুঃখের দিন পার করে নিজে নিজেই সুখ খুঁজে বের করি, অনেক অপ্রাপ্তির মধ্যেও সামান্য প্রাপ্তিতে অভিভূত হই… হেরে গেলেও হার মানি না… কারণ হতাশার কাছে পরাজয় স্বীকার করবো না বলে যে ব্রত নিয়েছিলাম, সেটা যে আমাকে রক্ষা করতেই হবে!!!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 574
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    574
    Shares

লেখাটি ৩,৩৯০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.