রবীন্দ্রনাথের আলো সবার কাছে পৌঁছায় না

0

লুসিফার লায়লা:

রবীন্দ্রনাথ আমার পারিবারিক সূত্রে পাওয়া সম্পদ। তাঁকে পাবার জন্যে কিছুমাত্র কষ্ট করতে হয়নি। সেকারণেই কিনা জানি না, রবীন্দ্রনাথকে কখনো আমার চেনা সংসারের বাইরের কেউ বলে মনেই হয়নি অনেককাল পর্যন্ত। এই মনে না হওয়ার সবচাইতে অসুবিধার দিক ছিল এটাই যে, ওতে করে আমি কেবল তাঁকে চিনেছি, জানা শোনার কিংবা তাঁকে পাবার পথ আমার জানা হয়নি। তাকে জানতে পারিনি বলেই হয়তো একটা ঘোরের ভেতর তার হাত ধরেই অনেকগুলো দিন কেটে গেছে।

তখন রবীন্দ্রনাথ হড়হড় করে পড়ে ফেলে বাবার সামনে গড়গড় করে উগরে দিয়ে ‘কী হনুরে’ ভাব নিয়ে বাবার প্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা হতো। এখন সেই দিনগুলোর দিকে তাকালে নিজেকে বোকার সর্দার, আর রবী ঠাকুরকে ভারী অসহায় লাগে। কেবল চেনার সুবাদে কী অপরিসীম অনাচার করেছি তাঁর উপর!

সেই ছেলেবেলাটা কেটে গেলে আবার যখন তাঁকে পড়তে শুরু করি, তখনই বোধ করি প্রথমবার আবিষ্কার করলাম অনেকদিনের মনের মানুষ নিজের দ্বারের কাছে এসে দাঁড়ালে কী গভীর অনুরণন হয়। তাঁকে জানবার এই গভীর অনুরণনের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে কেবল তাকেই পেলাম, তা না, আমার সব সময়ের সহচর বলে যে সম্পর্কগুলোকে এতোদিন ধরে জেনে এসেছি, তাঁদেরও যেন নতুন করে নতুন আদলে দেখতে পেলাম।

নতুন আদলে যাদের দেখতে পেলাম তাঁদের মধ্যে আমার বাবাকেই সবার আগে মনে পড়ে। এর কারণ মূলত আমাদের বয়সি আর দশটা বাচ্চা থেকে আলাদা একেবারে নতুন ধরনে বেড়ে ওঠার স্বাধীনতা। যেসব ভোরবেলায় আমার সঙ্গী-সাথীরা অ-তে অজগর আর ইংরেজি এ-তে আপেল শিখছে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে, সেইসব ভোরে ডায়াবেটিক রোগী বাবার সাথে হাঁটতে হাঁটতে আমরা শিখছি গাছ-পাখি-ফুলেদের নাম পরিচয়।
বাজার থেকে ফিরে মাছটা বড় থালায় রেখে বাবা মাছের জাতপাত গোত্রের ইতিহাস পড়াতো আমাদের। চেনা একাডেমির বাইরে যে শিখবার ও জানবার সবচাইতে বড় জগৎ দাঁড়িয়ে আছে, দরজা-জানালা খুলে সেই জগতের পাঠশালায় আমার বাবা আমাদের পড়তে দিতেন। চেনা সমাজের আঁটোসাঁটো পরিধেয়র বদলে রংধনু আঁকা জামার ভেতর ভিন্ন স্বাদের যে জীবন, বাবা আর সকলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমাদের দিতে চেয়েছে সে জীবনটার ছবি, বাবা দেখেছিলেন রবী ঠাকুরের ভাবনার ভেতর দিয়ে।

জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, তাঁদের পরিবার ব্রাহ্ম হবার সুবাদে সে সময়ের সমাজে তাদের স্থান ছিলো না, অনেকটা একঘরেই ছিলেন তাঁরা। সেকারণে সমাজের অনেক দায়-দায়িত্ব থেকে তাঁরা মুক্ত ছিলেন। এই মুক্তি তাঁদের মনের স্বাধীনতার সহায়ক হয়েছিল। একথা বাবার জানা ছিল নিশ্চয়ই, তাই হয়তো সমাজের অনেক বাঁধা ধরার হাত থেকে বাঁচিয়ে একটা স্মরণীয় শৈশব দেবার চেষ্টা ছিল। ক্যারিয়ার গড়বার ইঁদুর দৌড় থেকে কচ্ছপের গতিতে এগুতে দিলেন, তার কেবল ইচ্ছে ছিল আমরা জগৎ-সংসার দেখতে দেখতে জানতে জানতে এগুবো। এসব কারণে বাবাকে সবসময় আমি অগ্রগামীদের সারিতে দেখি। আর এই যে দেখতে পাওয়া, সেটাকে আলাদা করে অনুভব করতে রবীন্দ্রনাথের কাছেই যেতে হয়েছে আমাকে।

আসি আমার মায়ের কথায়। মা, আমাদের সংসারের প্রধানতম কাণ্ডারি, আমাদের মা, বড় সংসারের নানান সম্পর্কের ভেতর জড়িয়ে থাকা নানা ডাকের ভেতর সাড়া দেয়া একটা মানুষ। যে কিনা সর্বক্ষণ সংসারের চারপাশটা শক্ত গেরো দিয়ে আগলে রাখছে। সেই মানুষটা লোডশেডিংয়ের সন্ধ্যায় অন্যমনে গাইছে, ‘তুমি কি কেবলই ছবি’। সেই সন্ধ্যায় সেই অন্যমনের যে ছাপ আমার মায়ের মুখের উপর আলো ছড়াচ্ছিলো, সেই আলোতে যাকে দেখতে পেলাম সে কেবল আমার মা নয়, কিংবা কেবল একটা সংসারী মানুষ নয়। সে অন্য কেউ, একেবারে আলাদা। তাকে কেবল আমাদের দাবি করে যে ছোট গণ্ডিতে তাকে জানতাম আমরা, তার জগৎ সেই সেই গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত। এই যে এমন করে মাকে অন্য আদলে পেলাম, এই পাওয়াটা রবীন্দ্রনাথের দান। রোজকার চিরচেনা সম্পর্কগুলোকে অন্য আলোয় দেখবার, অন্য রকম করে জানবার মন আমায় রবী ঠাকুর দিয়েছেন।

ফলে রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে সবসময় আমার প্রাণের মানুষ। কিন্তু তবুও এই প্রাণের মানুষকে নিবিড় করে পেতে কেবল তাঁর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে তাঁকে জানাটাই যথেষ্ট মনে হয় না এখন আর। তাই আমার মতো যাদের রবী ঠাকুর প্রাণের মানুষ, সেইসব মানুষের রবীন্দ্রনাথকে জানতে হয়েছে, হচ্ছে এখনও।

ঋতুপর্ণ ঘোষের ফার্স্ট পারসন পড়তে গিয়ে এক জায়গায় দেখলাম ঋতুপর্ণ লিখছেন, তাঁর একলা রাতের অন্ধকারে একাকিত্বের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে মাথার কাছে রাখা বইয়ের তাকে হাত রাখলেই তিনি তাঁর পরম প্রিয়কে পেতেন। যে কিনা তাকে কখনই ছেড়ে যান না। সেই পরমপ্রিয় আর কেউ নন, স্বয়ং রবী ঠাকুর। ছেলেবেলায় আমাদের সকাল শুরু হতো পাশের বাড়ির রেকর্ডে সাগর সেনের গলায় আকাশ ভরা সূর্যতারা শুনতে শুনতে। ছেলেবেলায় সেই শোনাটা দিনের শুরুটাকে সুরে ভরে দিতো। এখন যখন কোনো কোনো সকাল সেই একই গানের ভেতর দিয়ে শুরু হয়, তখন কেবল সুর নয়, মনের ভেতর একটা অদ্ভুত প্রশান্তি হয়।

সেই সব ভোরে আমার মৈত্রেয়ী দেবীকে খুব মনে পড়ে। ‘স্বর্গের কাছাকছি’ বইটার ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ নিজেকে দান করতে পারতেন অজস্রধারায়। তাঁর জীবন থেকে স্বত:উৎসারিত আনন্দধারা ঝরে পড়তো অবিরল অবিশ্রান্ত- যার যেমন অঞ্জলি, সে তেমন করে পূর্ণ করে নিয়েছে’।

এই কথাগুলো ধ্রুব সত্যি হয়ে ফেরে সেইসব মানুষের মনে, যাদের জীবনে তাঁর আলো এসে পড়েছে। কিন্তু যে বা যারা তার বিশাল সৃষ্টির সম্ভার থেকে কিছুমাত্র নিতে পারেনি, কেবল তাদের নেবার মতো অঞ্জলি না থাকার জন্যে, তাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ মিডিওকারই বটে।

আগে হলে বাকবিতণ্ডা করতাম, দু’চারটা মন্দ শব্দ স্বপ্রণোদিত হয়ে বেড়িয়েও যেতো, কিন্তু এখন ওদের জন্যে করুণা হয়, মনে হয় আহা কয়টা লাইক-কমেন্টের ভেতর দিয়ে নিজেকে আলোচনায় আনতেও এদের প্রধানতম পুঁজি এখন রবীন্দ্রনাথ।

আশার কথা এই যে, রবীন্দ্রনাথ যাদের জীবনে থাকেন, তাদের জীবনে এইসব বালখিল্য আপনা থেকেই ব্রাত্য।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 56
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    56
    Shares

লেখাটি ১৯১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.