মা যখন ‘ব্ল্যাকমেইলার’

0

শারমিন জাহান:

আপনি মা হয়ে সন্তানকে প্রতিনিয়ত ব্ল্যাকমেইল করেই যাচ্ছেন, এটা কি জানেন? হ্যাঁ, অপ্রিয় হলেও সত্য যে আপনি মা এবং আপনিই আপনার সন্তানের বড় শত্রু। সময় থাকতে আপনার ভুলগুলো শুধরে নিন। সন্তানের জন্য সুন্দর জীবন নিশ্চিত করুন।

এবার একটু বিস্তারিত আলোচনা করি। আমাদের আশেপাশে এমন অনেক দম্পতি দেখা যায়, যাদের মধ্যে কলহ বেঁধেই থাকে। এমন সময় আত্মীয়-স্বজন পরামর্শ দিয়ে থাকেন, “সন্তান নাও, সম্পর্ক ঠিক হয়ে যাবে”। যে মুহূুর্তে আপনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন, সেই মুহুর্তেই আপনার অনাগত সন্তানের প্রতি অন্যায় করলেন।
কেননা, একটি অসুস্থ পরিবেশে কীভাবে আপনি সুস্থ জীবন নিশ্চিত করবেন?

এখন আসি একটু ভিন্ন দিকে। আপনি খুব সুখী। আপনার দাম্পত্য জীবন অসাধারণ। সুখের সাগরে ভাসছেন। আপনি মা হতে চলেছেন। অনাগত সন্তানের জন্য প্রতিদিন ডায়রী লিখছেন। খুব সুন্দর উদ্যোগ! কিন্তু সমস্যা একটাই, আপনার উদ্দেশ্য। আপনি যদি ভাবেন যে প্রেগনেন্সি পিরিয়ডের কষ্টের কথা কোন এক সময়ে সন্তানকে বলবেন যে, “দেখো, আমি কতো কষ্ট করেছি তোমার জন্য”, তাহলে প্লিজ আজই বন্ধ করুন এই ভাবনা। কে বলেছে আপনাকে কষ্ট করতে? বাদ দিন না। আপনি কিন্তু পুরো কষ্টটাই করছেন নিজের জন্য। সন্তানের জন্য নয়। আপনি মা হচ্ছেন সম্পূর্ণ নিজের জন্যে। একদিকে প্রকৃতি আপনাকে মাতৃত্বের সাধ গ্রহণ করার সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে। অন্যদিকে সমাজ অপেক্ষা করছে আপনি ব্যর্থ হলে আপনাকে কথা শোনাবে। প্রাকৃতিক কিংবা সামাজিক, কারণ যাই হোক না কেন আপনি একটি সন্তানের দায়িত্ব নিতে চলেছেন। তার সুস্থ-সুন্দর জীবন নিশ্চিত করা আপনার একমাত্র কর্তব্য।

অনেক কাল আগে থেকেই এই অঞ্চলে সন্তানকে সম্পত্তি ভাবার একটি প্রবণতা চলছে। আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, ছেলে সন্তান বুড়ো বয়সের লাঠি। অনেককেই বলতে শোনা যায়, আপনার ছেলে নেই? বুড়ো বয়সে কে দেখবে? আপনার মেয়ে নেই, আপনাকে শুনতে হচ্ছে “বুড়ো বয়সে কে সেবা করবে”। সন্তান আপনার ছেলে হোক বা মেয়ে, সে ইন্সুরেন্স পলিসি নয়। নিজেকে স্বাবলম্বি করুন। সন্তানকে সুশিক্ষা দিন। যৌবনে স্বামীর মুখাপেক্ষী, আর বার্ধক্যে সন্তানের বোঝা না হয়ে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করুন। তাহলে আর বৌ-শাশুড়ির যুদ্ধ কিংবা বৃদ্ধাশ্রম কিছুই থাকবে না।

এবার আসি সন্তান জন্মের পর আপনি কী কী ভুল করছেন সেসব দিকে। একটি শিশুর প্রথম ভাষা প্রকাশের মাধ্যম হচ্ছে কান্না। কিছুদিন পর সে আপনাকে দেখে হাসতে শিখে। তারপর আরও বিভিন্ন সংকেত শিখে। অনেক মায়েদের দেখা যায়, বাচ্চা কান্না করলে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কান্নাকে নেগেটিভ ভাবে না দেখে কান্না ও হাসি জীবনের অংশ ভেবে নিন। জীবনের সব কিছুর জন্য প্রস্তুত হতে শিশুকে সহায়তা করবে যদি আপনি সহজ হোন। আপনার শিশু খেলতে গিয়ে ব্যথা পেল, আপনি ব্যস্ত না হয়ে তার সাথে স্বাভাবিক আচরণ করুন। যদি আবেগপ্রবণ হয়ে যান তাহলে আপনার শিশু আত্মবিশ্বাসী হবে না।

আজকাল সব শিশুই মোবাইলের প্রতি নির্ভরশীল। আপনার বাচ্চা মোবাইল ছাড়া খায় না, ঘুমায় না, খেলে না। আপনি যখন শিশু ছিলেন আপনি তো মোবাইল ছাড়া খেতেন, ঘুমাতেন, খেলতেন, সেটা কী করে সম্ভব ছিল? সমস্যা আপনার মাঝে। আগে নিজেকে পরিবর্তন করুন। আপনি নিজে দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন। বাচ্চার হাতে মোবাইল তুলে দিচ্ছেন। তাতে অল্প কিছু সময়ের জন্য হয়তো রিল্যাক্স আছেন। কিন্তু এই অল্প কিছুদিনের অভ্যাসই সুদূরপ্রসারী হয়ে যায়।
আজই এই অভ্যাস বাদ দিন। আপনার এক বছর অথবা একুশ বছর বয়সী সন্তানকে নিয়ে একসাথে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসুন। খাওয়ার সময় শুধুই খাওয়া, মোবাইল নয়। দেখবেন আস্তে আস্তে ছোট্ট শিশু নিজ হাতে খাওয়া শিখে যাবে। আর যদি আপনার সন্তান একুশ বছর বয়সী হয়, তার সাথে আপনার দূরত্ব কমে যাবে। বন্ধুর মতো আচরণ করবে সে। আপনার সন্তানের সাথে হাসিমুখে কথা বলুন। তাকে অনুভব করান, যতো যাই হোক আপনি তার পাশে আছেন। দেখবেন আপনার সন্তান সারা জীবন আপনার পাশে থাকবে।

সন্তানকে প্রয়োজনে শাসন করুন। সেটা অবশ্যই জরুরি। শুধু মিষ্টি খেলে যেমন ডায়বেটিসের সম্ভাবনা থাকে, তেমনি শুধু আদর দিয়ে সন্তানকে বাঁদর বানাচ্ছেন না তো? আপনার ছোট্ট শিশুটিকে চাওয়া মাত্রই কোন খেলনা দিবেন না। তাহলে তার উপর একটা নেগেটিভ ইমপ্যাক্ট পড়বে। আপনি আপনার সিদ্ধান্তে অটল থাকুন। শিশুর কান্না দেখে কোন সিদ্ধান্তই পরিবর্তন করবেন না। তাহলে আপনার শিশুর কাছে “কান্না” একটি অস্ত্র হয়ে যাবে। এবং সে এটি বার বার প্রয়োগ করবে। এভাবেই সে জেদি আর একরোখা হয়ে উঠবে। আপনার মেন্টাল ফিলিংস শিশুর উপর প্রভাব ফেলে। আপনি একাগ্র হোন, তাহলে আপনার সন্তান সঠিক ভাবে বেড়ে উঠবে।

সন্তান নিয়ে শো-অফ করবেন না। এটা শিশুর উপর বিরুপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। আত্বীয়-স্বজনের সামনে ছড়া বলা, গান গাওয়া কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য সন্তানের ছবি তোলা ইত্যাদি কাজে জোর করবেন না। আপনার সন্তান আপনার সম্পত্তি নয়। তাকে স্বাধীনতা দিন। তাকে মত প্রকাশ করার সুযোগ দিন। সন্তানকে শিশু বয়সে নিজের সম্পত্তি এবং বুড়ো বয়সে নিজের সম্পদ ভাববেন না। সন্তান জন্ম দিয়েই মা হয়ে গেলেন, এটা ভাববেন না। আগে মায়ের দায়িত্ব বুঝতে শিখুন। মাতৃত্বকে উপভোগ করুন। সকল মায়েদের জন্য শুভ কামনা। Happy Mother’s Day.

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ৬,১৫০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.