আমার ঔরসদাতা, গর্ভধারিণী এবং অন্যান্য (পর্ব – ১)

0

তামান্না ঝুমু:

আমার পৈতৃক বাড়ি সন্দ্বীপে। আমার প্রপিতামহ ছিলেন ব্রিটিশ শাসনামলের ছোটখাটো জমিদার। নাম তাঁর টুকু মুন্সী। আমাদের আশপাশের লোকজনেরা সবাই ছিল দরিদ্র ও নিরক্ষর। জমিদার পরিবারের লোকেদের কাছে আশপাশের দরিদ্র জনসাধারণের অবস্থা কী ছিল, কী হতে পারে, তা আমরা ইতিহাস থেকে অনেকখানি জানতে পারি।

আমি জন্মেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার অনেক পরে। তখন জমিদারি প্রথা আর নেই। কিন্তু সেই ভয়াবহ নীলরক্ত তখনও আমার পরিবারের লোকজনের শিরায়-উপশিরায় বেশ দাপটের সাথে প্রবাহিত, এমনকি আজ অবধিও তার প্রবাহ অব্যাহত রেখেছে তাদের অনেকেই অত্যন্ত অহংকার ও গর্বের সাথে।

বলতে ঘৃণাবোধ করছি, এই অন্যায় অহংকার আমার মনে এবং রক্তের প্রবাহেও ছিল অনেক বছর; যা আমি অন্য সবার কাছ থেকে শিখেছিলাম, আমাকে যা সবাই শিখতে বাধ্য করেছিল। আজ বেশ অনেক বছর হলো সে বাজে মনোভাব থেকে আমি বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছি। সেই অসভ্য মনোভাবের ধারক একসময় আমিও ছিলাম– একথা মনে পড়লে আজ আমি নিজের প্রতি নিজেই ধিক্কার জানাই। আমার পরিবারের লোকজনদের কর্মকাণ্ড আমি যা দেখেছি ও যতটুকু ইতিহাস মানুষের মুখে শুনেছি, আমার মনোভাবের পরিবর্তনের পরে তা মানুষের কাছে বর্ণনা করার তাগিদ অনুভব করেছি বারবার। কিন্তু মনস্থির করতে পারিনি, সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি এতোদিন। আমার মনের সেই অবস্থা থেকে আজ আমার উত্তরণ ঘটেছে। সবকিছু বলার জন্য আজ আমি দায়বদ্ধ ও প্রস্তুত।

১৯৭৪ সন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ। দুর্ভিক্ষ চলছে দেশজুড়ে। চরম দুর্ভিক্ষ। না খেয়ে মানুষ মরছে, মরছে কুকুর-বেড়াল। কুকুর-বেড়াল ও মানুষের লাশের স্তূপ একাকার হয়ে পড়ে আছে রাস্তার ধারে ধারে। অভিজাত হোটেল রেস্টুরেন্টগুলির ভেতরে থরে থরে ভালো ভালো খাবার সাজানো, তার বাইরে অভুক্ত হাভাতে কঙ্কালসার মরণাপন্ন মানুষের দল। মরণসাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে ওরা বাইরে থেকে কাঁচের জানালা দিয়ে দেখছে খাবারগুলি, চেয়ে আছে খাবারের দিকে জন্ম-জন্মান্তরের খিদা নিয়ে। কিন্তু দলবেঁধে দরজা জানালা ভেঙে খাবারগুলি খেয়ে নিচ্ছে না। কারণ ওরা জানে, তা করতে গেলেই হোটেলের অভিজাত ক্ষমতাবান মানুষেরা ওদের পথের কুকুরের মতো পিটিয়ে মেরে ফেলবে। যারা চোখের সামনে প্রতিমুহূর্তে দেখছে, ওদের মতো হাভাতে মানুষদের মৃত্যু, এবং ওরা নিজেরাও নিশ্চিতভাবে মরবে যেকোনো মুহূর্তে ওভাবেই, তাদেরও মৃত্যুভয়!

আমার পরিবারে খাদ্যাভাব ছিল না। আমাদের অনেক জমিজমা, গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ফসল, পুকুর ভরা মাছ, গাছ ভরা ফলফলাদি, আরও কতো কী! আমার দাদী অনেক মমতাময়ী মানুষ। সব সময় আত্মীয়-অনাত্মীয় সবাইকে পেটপুরে খাইয়ে, অতি যত্নে আপ্যায়ন করে তৃপ্তি পান। দুর্ভিক্ষের সময় অনাহারি মানুষেরা আসে অবস্থাপন্ন মানুষদের দুয়ারে দুয়ারে, ভিক্ষা চায় দুর্বল কাতর কণ্ঠে, একটু ফেন দাও গো মা। আমার দাদী শুধু ফেন নয়, তাঁর সাধ্যমতো সবাইকে ভাতও খাইয়ে দেন। ওদের জন্য রান্না করে রাখেন। ওরা এলে ভাত ফেন সব দিয়ে দেন। কাউকে খালি হাতে, খালি মুখে ফেরাতে পারেন না। তাঁর বুক ভেঙে যায় কোনো অনাহারি মানুষের মুখ দেখলে। তিনি নিজের খাবারটাও ওদের খাইয়ে দিয়ে ওদের কষ্টে চোখ মোছেন।

আমাদের পানের বরজ ছিল তখন। আমাদের পাড়ার অতিদরিদ্র এক লোক, নাম তাঁর বেচন। বেচন নাকি খিদের জ্বালা আর সইতে না পেরে আমাদের পানের বরজে ঢুকেছিলেন একদিন পান চুরি করার জন্য। আমার পিতার কানে সে খবর আসে। আমার পিতামাতার বিয়ে হয়নি তখনও। তখন সে টগবগে যুবক। এলাকার ত্রাস। কথায় কথায় মানুষের হাত-পা ভেঙে দেয়, মানুষকে ছুরি মেরে দেয়, এক লাথিতে মানুষকে অজ্ঞান করে ফেলে, মানুষের গরু-ছাগল জবাই করে পিকনিক করে খেয়ে ফেলে। ইত্যাকার কাজে তার দিনকাল বেশ আনন্দেই কাটতে থাকে। সে বিএ পাস, জমিদারের নাতি, নাম তার বেলাল মিয়া; এটা ক্ষণে ক্ষণে সবাইকে কথায় ও কাজে প্রমাণ করে দেয়।

বেচনকে সে লোক দিয়ে ধরিয়ে আনায়। তাকে মারতে শুরু করে নিজ হাতে। অনেক মারে, অনেক মারে। অন্ত:হীন বর্ণনাহীন সে মার। আমার দাদী এসে তাঁর ছেলের পায়ে ধরেন আক্ষরিক অর্থেই। এরে বাপ, আর মারিস না, মরে যাবে গরিব মানুষ। আমার পিতা দাদীকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। পেটাতে থাকে বেচনকে অসুরের শক্তি দিয়ে।

আমার দাদা, জমিদারপুত্র ইউসুফ মিয়া দূর থেকে দাঁড়িয়ে বলেন, ছেড়ে দে, ছেড়ে দে, আর মারিস না। অনেক দর্শক জড়ো হয়, মানুষকে মানুষে পিটিয়ে মেরে ফেলার এই লাইভ দৃশ্য দেখার জন্য। কেউ কেউ উপভোগ করে, কেউ কেউ মনে মনে আহা উহু করে। কিন্তু কারুরই সাধ্য বা সাহস নেই, পিতার কাছ থেকে বেচারা বেচনকে রক্ষা করার।

বেচনের কিশোরী স্ত্রী তাঁর দুটি শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে আসেন, পিতার পায়ে পড়ে আহাজারি করেন– ভাই গো, বাপ গো, ছেড়ে দেন। আর চুরি করবে না। ছোট ছোট দুইটা মেয়ে, ও মরে গেলে আমরা কোথায় যাবো? পিতা তাঁকে লাথি মেরে সরিয়ে দিয়ে বেচনকে আবার মারতে থাকে। দূর থেকে কেউ কেউ চাপাস্বরে বলে, মরে গেছে, মরে গেছে। পিতা ক্লান্ত হয়ে ক্ষান্ত দেয়। বেচনের তখনও একটু একটু নিঃশ্বাস ছিল অবশিষ্ট। দুই-তিনদিন পর সেই নিঃশ্বাস বেরিয়ে যায়। তিনি মুক্তি পান যন্ত্রণা থেকে।

তুচ্ছ পান চুরির জন্য আমার পিতা বেচনকে জনসমক্ষে পিটিয়ে মেরে ফেলে। তার কোনো বিচার হয়নি। এটা অন্যায়, এটাও বলার কারও হিম্মত হয়নি আমার পিতার সামনে কোনোদিন। বেচন খুন হয়ে যাবার পর তাঁর কিশোরী বৌটির নাম হয়ে যায়, চোরের বৌ। গৃহবধূ তিনি। কোনোদিন কাজ করেননি কারও বাড়িতে। বেচনই ওদের মজুরি করে খাইয়েছেন। আজ তাঁর কন্যাদের ও তাঁর নিজের অন্নের ব্যবস্থা করতে তাঁকে লোকের দ্বারে দ্বারে কাজ খুঁজতে হয়। সবাই তাঁকে চোরের বৌ চোর বলে ফিরিয়ে দেয়। তিনি কন্যাদের নিয়ে অনাহারে কাটান দিনের পর দিন। একদিন তিনি কাজ পান। তাঁর কন্যারাও ৬/৭ বছরের হয়। ওরাও কাজ করতে শুরু করে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে। ভানু ও জ্যোৎস্না ওদের নাম। আমি যখন ছোট, ওরা আমাদের বাড়িতেও কাজ করেছে তখন। কোনোদিন ওরা বা ওদের মা কেউ বলেনি, বলার সাহস পায়নি যে আমার পিতা ওদের বাবা বা স্বামীর খুনী। আমার পিতা বা মাতা কারুর মধ্যেই আমি এ-নিয়ে কোনো অপরাধবোধ দেখিনি কোনোদিন।

আমি তখন নাইনে পড়ি। আমাদের পরিচিত একজন চিটাগাঙের কোনো প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে একটা মেয়েকে এনে দিয়েছিল আমাদের বাড়িতে কাজ করার জন্য। কতোটা দরিদ্র ও অসহায় হলে একটা মেয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা দুর্গম সুদূর দ্বীপে আসে ততোধিক অপরিচিত কারো বাড়িতে কাজ করতে! মেয়েটি ডিভোর্সি ছিল। নাম ছিল তার সাহারা। আমাদের তখন অনেক চাষাবাদ, হাঁস-মুরগি। গরু-ছাগলও আছে। সব কাজ আমার মা সাহারার হাতে করায়। শুধু এসব তো নয়, ওকে বনে-জঙ্গলে নিয়ে মাটি কাটিয়ে নেয়। এখানকার মাটি কাটিয়ে ওখানে নিয়ে যায়, আবার ওখানকার মাটি কাটিয়ে এখানে আনায়। লাকড়ি কাটায় ওর হাতে। টাটকা গোবর দিয়ে ঘুটে প্রস্তুত করিয়ে নেয় ওর হাতে।

সাহারা বলে, ‘এতো কাজ আমি একজনে কীভাবে করি’? মা খেঁকিয়ে উঠে বলে, ‘কী রে ফকিন্নি, কাজ না করিয়ে তোকে শুইয়ে শুইয়ে খাওয়াবো নাকি’? কথায় কথায় ওকে ডিভোর্সি বলে খোটা দেয়, ফকিন্নি ও কুৎসিত বলে গালাগাল করে আমার মা। সাহারা সময় পায় না কখনও গোসল করার, তার চুলটা আঁচড়ানোর। খাওয়ার সময় তাকে যে পরিমাণ খাবার দেয় আমার মা, তা ওর পাকস্থলির একটা কোণা ভরার জন্যও যথেষ্ট না। ওকে সবসময় উচ্ছিষ্ট খেতে দেয় অতি নিম্নমানের বাসনে করে। ওর বসার জন্য নির্দিষ্ট পিঁড়িটা আমাদের পিঁড়ির থেকে আলাদা, ভাঙাচোরা। ওর পানি খাবার গ্লাসটা নির্দিষ্ট, যা আমাদের গ্লাসের চেয়ে অনেক নিম্নমানের। ভালো রান্না হলে ওকে কখনো দেয় না।

শীতকালে প্রচণ্ড শীত পড়েছে সেবার। পিতা তাই সাহারাকে একটা শাল কিনে দেয়। লাল রঙের শালটা। পায়ে দেবার কোনো জুতো বা স্যান্ডেল ছিল না ওর। মেয়েটি ঠাণ্ডায় কষ্ট পাচ্ছিল। প্রচণ্ড শীতের মাঝে রাতের বেলায় মাটির ঘরে খালি পায়ে হাঁটাচলা করা কষ্ট তো। মায়ের পুরানো ছেঁড়া একজোড়া স্যান্ডেল মাকে অনেক অনুরোধ করে সাহারাকে দেওয়াতে সক্ষম হয় পিতা। শীতকাল চলে যায় একসময়। সাহারাও চলে যেতে চায়। এখানে সে আর থাকবে না একদণ্ড, কাজ করবে না আর। কিন্তু আমার পিতামাতা কেউই ওকে যেতে দেবে না। ও সোনার ডিম-পাড়া হাঁস তো! যেতে দেবে কেন?

সাহারা অস্থির হয়ে পড়ে, ও বেরিয়ে পড়বে যেভাবেই হোক। এক সকালে ও চলে যাচ্ছে একটা কাপড়ের পুটুলিতে ওর ধনসম্পদ সব বেঁধে নিয়ে। ও কোনো মণিমানিক্য চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে না তো আমাদের সোনার সংসার থেকে? আমার মা ওর পুটুলি খুলে দেখে। আসলেই মণিমানিক্য বেঁধে চুরি করে নিয়ে যাচ্ছিল সাহারা আমাদের ঘর থেকে সেদিন। ওর পুটুলির ভেতর পাওয়া যায়, ওকে আমার পিতার কিনে দেওয়া লাল শালটি, সেই ছেঁড়া স্যান্ডেল-জোড়া, আর দুইটা শতছিন্ন পুরানো শাড়ি যা ও সাথে করে এনেছিল।
মা বিশ্ববিজেতার আনন্দ নিয়ে চিৎকার দিয়ে বললো, ‘এই বান্দী, এই চুন্নি, আমার শাল আর স্যান্ডেল বের করে দে। চুরি করে নিয়ে যাবি আমার সব জিনিস? তা হতে দিচ্ছি না’। সাহারা সেই ছেঁড়া স্যান্ডেল-জোড়া ও লাল শালখানা বিনাবাক্যে বের করে দিয়ে বেরিয়ে যায় চোখ মুছতে মুছতে।

আমি মাকে বললাম, সাহারাকে ওর শালটা দিয়ে দাও। ও কাজ করেছে এতোদিন। এটা ওর হাড়ভাঙা শ্রমের বিনিময়ে দেওয়া হয়েছিল ওকে, ফ্রিতে তো দাওনি। এজন্য আমার মা আমাকে অনেক গালিগালাজ ও মারধর করেছিল।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 193
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    193
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.