শিশুশিক্ষা ও শিশু পালনের পূর্ব-পশ্চিম

0

সন্ন্যাসী রতন:

কিছুদিন আগে মেসেঞ্জারে বাংলাদেশের এক দিদির সাথে কথা হচ্ছিলো। তিনি আমার বাচ্চাদের পড়াশুনার ব্যাপারে জানতে চাইছিলেন। তাকে আমাদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলিং নিয়ে বলতে গিয়ে নরওয়েজিয়ান শিশুশিক্ষা ও শিশুপালন বিষয়গুলোও চলে আসলো।

তাকে জানালাম এখানকার শিশুরা তাদের শৈশবটা কাটায় আনন্দে বিনোদনে; বাংলাদেশের শিশুদের তুলনায় তাদের ওপর পড়াশোনার চাপ নেই বললেই চলে। দিনি জানালেন, তাঁর ছেলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। কোন এক নামী স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য বেশ চাপ দিয়ে পড়াশুনা করাচ্ছেন ইদানিং। কিন্তু এতে ঠিক ফল হচ্ছে কিনা তিনি নিশ্চিত নন। ছেলেটি কেমন খিটমিটে হয়ে উঠেছে। যখন তখন রেগে যায়; আর কোন কথা শুনতে চায় না। আমার কথা শুনে তাঁর এমন উপলব্ধি হলো যে, তিনি আসলে তাঁর ছেলেকে নির্যাতন করছেন।

বছর দেড়েক আগে নরওয়েজিয়ান শিশু-শিক্ষা নিয়ে ফেসবুকে বিচ্ছিন্ন কয়েকটা পোস্ট দিয়েছিলাম। পশ্চিমবঙ্গে বাস করেন এমন এক স্কুল শিক্ষিকা সেগুলো পড়ে বেশ উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, তিনি তাঁর স্কুলের এক বক্তৃতায় আমার স্ট্যাটাস থেকে পাঠ করেছিলেন। তিনি আরো বলেছিলেন যে, তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন, কিন্তু আসলে তা সম্ভব না। কারণ অন্য শিক্ষকরা আগ্রহী হওয়া তো দূরের কথা, এসব বিষয় সম্পর্কে ওয়াকিবহালই নন।

এই দুই দিদির সাথে কথা বলে মনে হয়েছিলো, নরওয়েজিয়ান শিশু-শিক্ষা বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ লেখা তৈরি করা উচিত। সে ভাবনার বাস্তবায়নেই আজকের এই লেখাটা প্রস্তুত করা। আমি এটা আশা করি না যে, বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থায় শীঘ্রই বড় ধরনের কোন পরিবর্তন আসবে। তবে এই লেখাটি পড়ে যদি দুই বাংলার বাবা-মায়েদের মধ্যে একজনেরও শিশুদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির কিছু পরিবর্তন ঘটে, তাতেই লেখাটিকে স্বার্থক মনে করবো।

[এখানে আরেকটা কথা বলা উচিত মনে করছি। যারা অনেক বছর ধরে বিদেশে আছেন, তারা কেউ কেউ মনে করতে পারেন, ব্যাটা দুই দিন হইছে বিদেশে আইসাই শিক্ষা বিষয়ক লেকচার দিচ্ছে। সত্যিকারার্থে আমার লেকচার দেবার ইচ্ছে একটুও নেই। আমি কেবল কিছু সত্য তুলে ধরেছি। আরো কথা, আমি কোন শিশু-শিক্ষা বিশেষজ্ঞ নই, এমনকি শিক্ষকও নই। তাই আমার এই লেখা কোনভাবেই কোন বিশেষজ্ঞতা দাবি করে না। যারা দীর্ঘদিন ধরে নরওয়েতে বা স্ক্যান্ডিনেভিয়াতে আছেন এবং যাদের সন্তান এখানকার কিন্ডারগার্টেন ও স্কুলে পড়েছে, তারা আমার দেয়া তথ্যে কোন ভুল পেলে জানাবেন। আমার সন্তানরা এখানে কিন্ডারগার্টেনে যায়নি। এ সম্পর্কিত তথ্য আমি অন্যের কাছ থেকে জেনে লিখেছি।]

১. শিশুদের সাথে পিতামাতার আচরণ:
প্রথমেই আমি এই দিকটাতে আলোকপাত করতে চাই, কারণ শিশুরা তাদের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে থাকে পরিবার তথা কাছের লোকজনের কাছ থেকে। তারা বেড়ে ওঠে বাবা-মা-ভাই-বোন সংস্পর্শে। শিশুদের প্রতি পরিবারের লোকজনের, বিশেষভাবে বাবা-মায়ের আচরণ তাদের মানসিক বিকাশে প্রভাব রাখে। নরওয়েতে বাবা-মায়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হল গৃহাভ্যন্তরে একটি সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখা যাতে শিশুদের সুস্থ্য ও স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ লাভ ঘটতে পারে। শিশুদের সাথে কোনভাবেই এমন আচরণ করা যাবে না, যা তাদের মানসিক বৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। তাদের গায়ে হাত তোলা দূরের কথা, তাদের সাথে চেচিয়ে কোন নির্দেশনাও দেয়া যাবে না। এর পাশাপাশি বাবা-মায়ের আরেকটি দায়িত্ব শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের ব্যবস্থা করা ও অবসরে খেলাধুলা-বিনোদনের ব্যবস্থা করা। শিক্ষার ব্যাপারে এদেশী বাবা-মাকে বাংলাদেশী মায়েদের মতো অতোটা দায়িত্ব পালন করতে হয় না।

বাংলাদেশী তথা বাঙালি মায়েরা যেমন তাদের সন্তানদের নিয়ে নিজেদের মধ্যে এক অসুস্থ প্রতিযোগীতায় নামেন, এখানে সেসব নেই। স্বভাবতই এখানে নেই শিশুকে জোর করে পড়া কিংবা দুধ গিলানো। ওরকম কিছু থাকলে তা শিশু নির্যাতন বলে বিবেচিত হতো। মায়েদের মধ্যে যেমন প্রতিযোগীতা নেই, তেমনি কোন প্রতিযোগীতা নেই শিশুদের নিজেদের মধ্যেও। এটা না-থাকার কারণ নিয়ে পরে আসছি।

Family eating dinner

ডাইনিং টেবিল কনভার্সেশন: পাশ্চাত্যের দেশগুলোর পিতামাতারা ছেলে-মেয়ের সাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেন খাবার টেবিলে। যেহেতু বেশিরভাগ বাবা-মা ও সন্তান তাদের লাঞ্চ যথাক্রমে কর্মস্থলে ও স্কুলে করে থাকে এবং সকালে সবারই বাসা থেকে বের হবার তাড়া থাকে, বাচ্চাদের সাথে বাবা-মায়ের কথা বলার কাজটা সাধারণত ডিনার টেবিলেই সারা হয়। সন্তানের স্কুলে বা বন্ধুদের সাথে কোথাও কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা, স্কুলের কোন চিঠির বিষয়ে সন্তানকে অবহিত করা, পারিবারিক কোন বিষয় সম্পর্কে সন্তানকে অবগত করা, সন্তানের কোন আচরণ বাবা-মার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হলে সে বিষয়ে আলাপ করা, ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়ে কথা বলার জন্য ডাইনিং টেবিল বেশ উপযুক্ত স্থান। তবে এখানে এমন কোন বিষয় তোলা উচিত না বা এমনভাবে কিছু উপস্থাপন করা উচিত না যা সন্তানকে বিব্রত করবে। সেরকম কিছু থাকলে তার রুমে গিয়ে কথা বলাটাই যুক্তিসংগত এবং এটা করা উচিত একাকী, যাতে অন্য ভাই-বোনরা তা শুনতে এবং দেখতে না পারে। ভাই-বোনরা একে অপরকে টিজ করে থাকে, এরা ইউনিভার্সাল। বিব্রতকর কিছু নিয়ে টিজ করলে তা শিশুটির মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ হতে পারে।

ডাইনিং টেবিল কনভার্সেশন বাবা-মার সাথে সন্তানের বন্ধুসূলভ সম্পর্ক তৈরি করে। নরওয়ে তথা পাশ্চাত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কালচার পরিবারের সবাই একসাথে ডিনার করা। এসময়ে টিভি দেখা, রেডিও বা গান চালানো, ফোন ব্যবহার করা, ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা হয়। এটা করা হয় যাতে কারো মনোযোগ অন্যদিকে না চলে যায়। কোন বিশেষ কথা না থাকলে সন্তানদের সাথে হালকা রসিকতা করা যেতে পারে। মোটামুটিভাবে বলা যায়, খাবার সময়টাতে যেহেতু সবাই একত্রিত হচ্ছে, এ সময়টার উপযুক্ত ব্যবহার করে সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালনা করার দায়িত্ব বাবা-মায়ের।

কিছু ঘরোয়া নিয়মকানুন: কিছু ব্যতিক্রম দিবস ছাড়া নরওয়ের শিশুদেরকে সপ্তাহে কেবল একদিনই চকোলেট, আইসক্রিম, চিপস, কোকাকোলা ইত্যাদি খাবার খাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। বাংলাদেশের বাবা-মায়েদের মতো অতিরিক্ত আদর কিংবা বায়না ধরলেই তা পূরণ করে না এখানকার পিতামাতারা। শিশুরাও এতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কোনকিছুর জন্য বায়না নয়, বরং বাবা-মাকে অনুরোধ করতে শেখে। আর বাবা-মা ‘না’ বললে ওটাই সই। আর্গু করার মতো যথার্থ কারণ থাকলে একবার হয় তো আর্গু করে শিশুরা। তবে তা ঐ পর্যন্তই।

এখানকার শিশুদের ঘুমাতে যাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া হয়। বয়সভেদে এটা রাত ৮-৯টা হয়ে থাকে। আসলে তাদেরকে এভাবেই শৈশব থেকে অভ্যাস করানো হয়। কেবল শুক্র ও শনিবার রাতে, অথবা যদি পরদিন স্কুল বন্ধ থাকে, তবে নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত আধঘণ্টা বা এক ঘণ্টা রাত জাগতে দেয়া হয়। উল্লেখ্য, এখানে গ্রীষ্মকালে সূর্য ডুবতে ১১টারও বেশি বাজে। তবে তাতে শিশুদের ঘুমানোর সময়ের পরিবর্তন হয় না। আবার শীতকালে সূর্য উঠতে ১০টা পার হয়ে গেলেও শিশুদের স্কুল সাড়ে আটটায়ই শুরু হয়। এখানকার স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত সবকিছু চলে ঘড়ির কাটার নিয়মানুসারে, প্রকৃতির নিয়মানুসারে নয়।

বাংলাদেশে আমাদের শিশুদের (আমাদের নিজের সন্তানদেরও) দেখেছি রাত ১১-১২টা অবধি জেগে থাকে। বাবা-মায়েরা এর আগে তাদেরকে ঘুম পাড়াতে পারে না। তারপর সকালে যখন তাদেরকে স্কুলে পাঠানোর জন্য জাগানো হয়, তখন ঘুম ভাঙাতে লাগে দশ মিনিট; এরপরে যখন জাগে তখন কিছু খেতে চায় না; আর স্কুলে যায় চোখ কচলাতে কচলাতে। এরকমটা হওয়া খুবই স্বাভাবিক। একটা শিশুর ঘুম দরকার ৯-১০ ঘণ্টা। সেখানে যদি তারা সাত-আট ঘণ্টা ঘুমায় তবে তাদের তো এমনটা হওয়ারই কথা। আমার নিজ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, পিতামাতা চাইলেই শিশুদেরকে নিয়মের মধ্যে আনতে পারে। আমরা এখানে আসার পরে আমাদের ছেলে-মেয়েরা ঠিকই এখানকার নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।

শিশুদের শাস্তি: হ্যাঁ, পশ্চিমা দেশগুলোতেও শিশুরা একটু বড় হলে তাদের খারাপ আচরণের জন্য শাস্তি দেয়া হয়। তবে সেটা বাংলাদেশের শিশুদের যেভাবে বকাবকি করে আর চর-থাপ্পর দিয়ে শাস্তি দেয়া হয়, সেভাবে নয়। এখানকার শাস্তিগুলো একটু ভিন্ন প্রকৃতির। যেমন, এক সপ্তাহ তাকে আইসক্রিম, কোক, চিপস, ইত্যাদি শনিবাসরীয় খাদ্য থেকে বঞ্চিত করা হয়; কিংবা তাকে তার প্রিয় গেমিং ডিভাইস ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। এই শাস্তিগুলো বেশ কার্যকর। শিশুরা তাদের সাপ্তাহিক মিষ্টি-চিপস জাতীয় খাবারের জন্য সারা সপ্তাহ ধরে অপেক্ষায় থাকে। যখন দেখে যে তার আচরণের জন্য সে কোন এক সপ্তাহে সেটি থেকে বঞ্চিত হয়েছে, তখন তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা থাকে যাতে এমন শাস্তি তাকে আর না পেতে হয়। গেমিং ডিভাইস কেড়ে নেয়া শিশুদের জন্য আরো বড় শাস্তি। এটা তারা কোনভাবেই হারাতে চায় না।

মোট কথা, এখানকার শিশুদের ওপর বাবা-মায়ের বেশ একটা নিয়ন্ত্রণ থাকে। বাবা-মা যা বলে শিশুরা শৈশব থেকেই তা মানতে শেখে। আমাদের দেশের মায়েদের বলতে শোনা যায়, “আর বইলেন না ভাবি! আামার ছেলেটা না খুব বেপরোয়া। কোন কথা শুনতে চায় না।“ এটা আসলে হবার কথা নয়। পিতা-মাতার কথা সন্তানরা শুনবে না কেন? শৈশব থেকেই আমরা যদি শিশুদের একটা নিয়মতান্ত্রিকতার মধ্যে আনার চেষ্টা করি, তবে কোন মাকে এমন আক্ষেপসূচক কথা বলতে হয় না। আমাদের দেশে হয় অতিরিক্ত আদর দিয়ে শিশুদের মাথায় তোলা হয়, অথবা অনাদর ও অবহেলা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়। ফলাফল, শিশু বেপরোয়া।

২. কিন্ডারগার্টেন শিক্ষাব্যবস্থা:
নরওয়েতে শিশুর এক বছর বয়স হলেই কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করিয়ে দেয়া হয়। কোন কোন বাবা-মা আরেকটু দেরিও করেন অবশ্য। আবার কোথাও কোথাও কিন্ডারগার্টেনে আসনের অভাবে বাবা-মাকে অপেক্ষাও করতে হয়। শিশুদের জন্য কিন্ডারগার্টেন সময়কাল ১-৫ বছর। যেহেতু স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য পাঁচ বছর পূর্ণ হতে হয় এবং স্কুল শুরু হয় আগস্টে, কিছু শিশু পাঁচ পূর্ণ হওয়ার পরেও কয়েকমাস কিন্ডারগার্টেনে কাটায়।

নরওয়ের এবং বাংলাদেশের কিন্ডারগার্টেন সিস্টেমে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এখানকার কিন্ডারগার্টেনে শিশুদের কোন পাঠ প্রদান করা হয় না। ইংরেজিতে এটাকে প্রি-স্কুল ডে-কেয়ার সেন্টার বলা যেতে পারে। বাবা-মা শিশুকে কিন্ডারগার্টেনে রেখে কর্মস্থলে যান এবং ফেরার পথে তুলে নিয়ে আসেন। কিন্ডারগার্টেন সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত খোলা থাকে।

কিন্ডারগার্টেনে শিশুদেরকে বয়স ও সংখ্যাধিক্যতা বিবেচনায় ২-৪টি ভাগে ভাগ করে নেয়া হয় এবং সে অনুযায়ী বিবিধ খেলাধুলা, ছবি আঁকাসহ নানাবিধ কার্যক্রমে যুক্ত রাখা হয়। শিশুদের যত বয়স বাড়ে তাদেরকে ততই একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসা হয়। যেমন, শিশুর বয়স যা-ই হোক, তাকে খাইয়ে দেয়া হয় না। তাকে খাবার দিয়ে বসিয়ে দেয়া হয়। সে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নিজের হাত দিয়ে যা খাবে ওটুকুই। আরেকটু বয়স বাড়লে তাদেরকে শেখানো হয় কিভাবে খাবার শেষে প্লেট-বাটি ইত্যাদি (টিস্যু দিয়ে) পরিস্কার করে ও নির্দিষ্ট স্থানে রাখতে হয়। এছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে বাইরে খেলতে নিয়ে যাওয়া, সপ্তাহে/দুই সপ্তাহে একদিন ক্যাম্পাসের বাইরে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, অন্য কিন্ডারগার্টেনে নিয়ে যাওয়া, ইত্যাদি বেশ নিয়ম বেঁধে করানো হয়। স্কুল ক্যাম্পাসের বাইরে বের হলেও তাদেরকে সুনির্দিষ্ট নিয়মে চলতে শেখানো হয়। রাস্তায় হাঁটার সময়ে কেউ কাউকে ওভারটেক করে না। কোন কোন কিন্ডারগার্টেনে দেখা যায় দুজন দুজন করে একে অপরের হাত ধরে হাঁটছে। এছাড়া রাস্তা পার হতে জেব্রা ক্রসিংয়ের ও ট্রাফিক লাইটের ব্যাবহার শেখানো হয়।

নরওয়ে পাহাড়-পর্বত-বনে ঘেরা দেশ। কিন্ডারগার্টেনগুলো শৈশব থেকেই শিশুদেরকে পাহাড়ে-বনে নিয়ে যাওয়া হয়। এখানে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রাকৃতিক অবস্থা খুব বেশি প্রতিকূল না হলে কিন্ডারগার্টেনগুলো কখনোই রুটিনের বরখেলাপ করে না। নরওয়েজিয়ানরা তুষার, বৃষ্টি, বাতাস, ইত্যাদিকে খারাপ আবহাওয়া বলে মনে করে না। আবহাওয়া বিষয়ে একটা নরওয়েজিয়ান প্রবাদ এরকম- খারাপ আবহাওয়া বলে আসলে কিছু নেই, যদি কিছু থেকে থাকে তবে সে খারাপ পোশাক-পরিধান (bad clothing)।“ কিন্ডারগার্টেনগুলো শৈশব থেকেই শিশুদেরকে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় অভ্যস্ত করে তোলে।

আগেই বলেছি, বাংলাদেশের কিন্ডারগার্টেনের মতো এখানকার কিন্ডারগার্টেনগুলোতে শিশুদের কোন শিক্ষা দেয়া হয় না। তবে খেলাচ্ছলে বর্ণমালা শেখানো হয়, ফুল-ফল-পাখি ইত্যাদির নাম শেখানো হয়। এতে স্কুলে যাবার পূর্বে শিশুদের শব্দভাণ্ডার (vocabulary) কিছুটা সমৃদ্ধ হয়। এছাড়া বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করে সামাজিক দক্ষতা (social skill) বাড়ে। এর ফলে শিশুরা যখন কিন্ডারপার্টেন পার হয়ে স্কুলে ভর্তি হয়, তখন স্কুলের পাঠ ধরতে সহজ হয় ও অন্য শিশুদের সাথে সহজে মিশতে পারে।

নরওয়ের কিন্ডারগার্টেনের সাথে বাংলাদেশের কিন্ডারগার্টেনের তুলনাই চলে না। বাংলাদেশে আরো একটু বড় হলেই তবে কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করানো হয়, কিন্তু ভর্তির পরপরই শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় এক অসামঞ্জস্য শিক্ষার বোঝা। যে সময়টাতে শিশুদের বেড়ে ওঠার কথা আনন্দে খেলাধুলায়, সে সময়টাতে তারা শেখে গরু ইংরেজি কাউ, ছাগল ইংরেজি গোট, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি ভুল কিনা জানি না, বাংলাদেশে কিন্ডারগার্টেনে ভর্তির জন্যও বোধ হয় ইংরেজি-টিংরেজি টেস্ট করা হয়। এদেশী শিশুরা কিন্ডারগার্টেনে নরওয়েজিয়ান ছাড়া অন্য কোন ভাষা শেখে না।

বাংলাদেশের শিশুরা কিন্ডারগার্টেন থেকে বয়সের সাথে সামঞ্জস্যহীন কিছু ইংরেজি শব্দ শিখে, যা শুনে বাবা-মায়েরা খুব উৎফুল্ল হয় এবং অন্যের কাছে গল্প করে শিশুর প্রতিভার প্রশংসা করে। এগুলো কি আদৌ প্রয়োজনীয় কিছু? শিশুটি বড় হবার সাথে সাথে এসব মামুলি শব্দ সে এমনিতেই শিখবে। অথচ কিন্ডারগার্টেনে যেটা শিশুদের সবচেয়ে বেশি শেখা প্রয়োজন—খাবার খাওয়াসহ কিছু ব্যাপারে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা ও নিয়মে-কানুনে অভ্যস্ত হওয়া—সেগুলো বোধ হয় শেখানোই হয়ে ওঠে না।

৩. প্রাথমিক শিক্ষা:
নরওয়েতে শিশুদের স্কুল শুরু হয় পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার পরে এবং শুরু হয় প্রথম শ্রেণী থেকে। প্রাথমিক শিক্ষাকে দুই ভাগে ভাগ করা হয় এখানে। প্রথম সাত ক্লাস (৬-১২ বছর বয়স) পর্যন্ত শিশুস্কুলে এবং পরবর্তী তিন বছর কিশোর স্কুলে শিক্ষাদান করা হয়। আমি আমার এই প্রবন্ধে মূলতঃ শিশুস্কুলের শিক্ষার ওপরে আলোকপাত করবো এবং কখনও কখনও বাংলাদেশের শিক্ষার সাথে তার তুলনা করবো। স্কুলে শিশুদেরকে কী বিষয়ে পড়ানো হয়, তা নয়, বরং কিভাবে পড়ানো হয়, সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

পরীক্ষা ও মার্কিং: নরওয়েজিয়ান তথা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান শিশুশিক্ষার সবচেয়ে মজার দিক হলো এখানে কোন পরীক্ষা নেই। বাংলাদেশের একটা শিশু যেখানে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত পার করতে গিয়ে দু’দুটো (পঞ্চম ও অষ্টম) পাবলিক পরীক্ষা দিয়ে ফেলে, সেখানে এখানকার শিশুরা অর্ধবার্ষিক বা বার্ষিক পরীক্ষাও দেয় না। একটু ওপরের দিকের ক্লাসে কিছু পরীক্ষা হয় বটে, তবে তা অনেকটা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ক্লাস টেস্ট বা টিউটোরিয়াল পরীক্ষা নেয়া হয়, সেরকম। আর সে পরীক্ষায় কোন মার্কিং নেই। শিক্ষার্থীর দক্ষতা যাই থাকুক না কেন দশম শ্রেণী পর্যন্ত সবাইকে অটো-প্রমোশন দেয়া হয়। বাইরের দেশ থেকে আসা ইমিগ্র্যান্ট শিশুদের ক্ষেত্রে প্রথম এক বছর introductory ক্লাসে নরওয়েজিয়ান ভাষা ও সামান্য করে অন্যসব বিষয় শেখানো হয় এবং পরবর্তী বছরে শিশুর বয়সানুযায়ী তার যে ক্লাসে থাকা উচিত সে ক্লাসে ভর্তি করানো হয়। এক্ষেত্রে শিশুটি তার নিজে দেশে কোন ক্লাসে পড়ে এসেছে, এটা বিবেচনায় নেয়া হয় না।

পরীক্ষা ও মার্কিং সিস্টেমের অনুপস্থিতি এখানকার মায়েদের প্রতিযোগিতা থেকে বঞ্চিত করেছে। তারা জানতেই পারে না তার মেয়ের চেয়ে কোন ভাবির মেয়ে পরীক্ষায় বেশি ভাল করছে।

হোমওয়ার্ক: কিন্ডারগার্টেন পেরিয়ে নরওয়েজিয়ান শিশুরা প্রথম পাঠে অন্তর্ভুক্ত হয় প্রথম শ্রেণী থেকে। তবে এসময়ও তাদের ওপর পড়াশুনার তেমন চাপ থাকে না। স্কুলে কোন্ ক্লাস থেকে প্রথম হোম টাস্ক শুরু হয়, তা আমার জানা নেই। তবে সেগুলো যে খুবই সাধারণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের কন্যা তনুশ্রী তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত কোন হোমটাস্ক পায়নি। এর কারণ সম্ভবত ঐ সময়ে সে introductory ক্লাসে ছিল। চতুর্থ শ্রেণি থেকে তাকে সপ্তাহভিত্তিক হোমটাস্ক দেয়া হয়—সোমবারে পায় এবং তা জমা দিতে হয় শুক্রবার। বর্তমানে সে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে। তাকে এক সপ্তাহে যে হোমওয়ার্ক দেয়া হয়, বাংলাদেশের শিশুরা একদিনেও তার চেয়ে বেশি পেয়ে থাকে।

গত কয়েক বছর ধরে নরওয়েতে ডিবেট চলছে শিশুদের আদৌ হোমওয়ার্ক দেয়া উচিত কিনা। অনেকে এটাকে একেবারেই তুলে দেয়ার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন—তাদের যুক্তি হলো কিছু পরিবারে, বিশেষ করে ইমিগ্র্যান্ট ব্যাকগ্রাউন্ডের ক্ষেত্রে, শিশুকে বাসায় সাহায্য করার মতো শিক্ষিত লোক নেই। এই যুক্তিদাতাদের সংখ্যাটা এখনও ভারী নন। ভারী হলে তুলেও দেয়া হতে পারে। তবে যেহেতু তাদের উত্থাপিত সমস্যাকে সমাধানের লক্ষ্যে সপ্তাহে দুই দিন স্কুলেই শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্কে সাহায্য করা হয়। এটাতে অংশগ্রহণ ঐচ্ছিক এবং ফ্রি।

বাংলাদেশে থাকাকালীন আমার মেয়ে যখন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ে তখন তাকে একটি বেসরকারি স্কুলে (কিন্ডারাগার্টেন) ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলাম। একদিন রাত সাড়ে দশটার দিকে তাকে ঘুমাতে বললে সে জানালো এখনই সে ঘুমাতে পারবে না, কারণ তার হোমওয়ার্ক বাকি আছে। আমি ঐ রাতেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে তাকে আর ঐ স্কুলে পাঠাবো না। পরে কাছাকাছি একটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলাম এবং স্কুলে বলে দিয়েছিলাম যেন ওর ওপর পড়াশোনার চাপ দেয়া না হয়।

শৈশবে আমাদের কন্যার কিছু সমস্যা ছিলো। যারা আমির খানের ‘তারে জামিন পার’ মুভিটা দেখেছেন, তারা ওর সমস্যাটা বুঝবেন। মুভির ইশান যেমন গতানুগতিক পড়াশুনায় খুব স্লো ছিল এবং 6-9, b-d, ইত্যাদি গুলিয়ে ফেলতো, আমাদের তনুশ্রীও তাই করতো। এটাকে dyslexia বলে। চিকিৎসা বিজ্ঞান এ রোগের কারণ এখনও আবিস্কার করতে পারেনি। তবে স্থানভেদে ৫-১৭% শিশু এই রোগে ভুগে থাকে। এসব শিশুদের আলাদা কেয়ার প্রয়োজন হয়। ইশানের মতোই আমাদের মেয়ে ভিজুয়াল প্রেজেন্টেশনে খুব ভাল ছিল। যা সে নিজে বলতে পারতো না, তা আর্ট দিয়ে প্রকাশ করতো এবং সেগুলো আবার কারো কাছে প্রকাশ করতো না। আমি ঐ মুভিটা দেখেই এ রোগটা সম্পর্কে জেনেছিলাম। আর এটা জানতাম বলেই কন্যাকে ঐ স্কুল থেকে বের করে এনেছিলাম। এছাড়া বাসায়ও ওর মাকে বলে দিয়েছিলাম যেন ওকে কখনোই পড়াশুনায় চাপ না দেয়া হয়। ছেলের প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও শুধু পড়াশোনার চাপ বেশি বলে আমি বেসরকারি স্কুল এড়িয়ে চলেছি।

আগেই বলেছি নরওয়েতে ক্লাস টেন পর্যন্ত শিশুদের অটো প্রমোশন দেয়া হয়। কিন্তু সব ছাত্র নিশ্চয়ই সমানতালে আগাতে পারে না। যারা পিছিয়ে থাকে এবং যে বিষয়ে পিছিয়ে থাকে তাদের সে বিষয়ে আলাদাভাবে শিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। হোমওয়ার্কের ক্ষেত্রেও যদি কোন ছাত্র এবং তার অভিভাবক মনে করে যে, তার সন্তানের জন্য এই হোমটাস্ক খুব ভারী হয়ে যাচ্ছে, তবে শিক্ষকরা তার জন্য আলাদা করে আরেকটু সহজ হোমওয়ার্ক দেন। আর সেসব হোমওয়ার্কের অনেক বিষয়ই থাকে খুব মজার। শিশুরা সেগুলো করতে আনন্দই পায়। আর যেসব শিশুর dyslexia-এর মতো সমস্যা থাকে, তাদেরকে স্পেশাল কেয়ার দেয়া হয়।

 (স্কুল ব্যাগের কার্টুনটা নেয়া হয়েছে ভারতের ডেইলি পোস্ট পত্রিকা থেকে। স্কুল ব্যাগ বহন সম্পর্কিত সংবাদটা পড়ে নিবেন। https://dailypost.in/news/editor-s-picks/carrying-heavy-school-bags-may-result-poor-health/ )

স্কুল ব্যাগ: বাংলাদেশে আরেকটি বিষয় খুব পীড়া দেয় আমাকে। শিশুর স্কুল ব্যাগ। নিজে স্পন্ডিলাইটিসের রোগী তাই কিনা জানি না, ছেলে-মেয়েকে যখন ভারী একটা ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যেতে দেখতাম, মনে হতো ব্যাগের ভারে ওদের মেরুদণ্ড বুঝি শৈশবেই আমার মতো বেঁকে যায়। এটাকে আমার একপ্রকার শিশু নির্যাতন বলে মনে হয়। আমার মেয়ে এখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়লেও তাকে বাসা ও স্কুলে কোন বই টানাটানি করতে হয় না। বাসায় তার একটা মাত্র বই- ইংরেজি। ওটা থেকে তার হোমটাস্ক দেয়া হয় বলে বাসায় নিয়ে আসে। নরওয়েজিয়ান ও গণিত হোমটাস্ক দেয়া হয় আলাদা শিটে অথবা ইন্টারনেটে। তাই বাকিসব বই থাকে স্কুলে। যেসব খাতা-পেন্সিল ব্যবহার করে, তাও থাকে স্কুলে। সেসব অবশ্য স্কুল থেকেই প্রদান করা হয়।

বিরতি, লাঞ্চ ও অন্যান্য: স্কুলে ক্লাস চলার মাঝখানে দুবার বিরতি দেয়া হয়। নরওয়েজিয়ান ভাষায় একটা ছোট বিরতি, আরেকটা বড় বিরতি। বড় বিরতিটা ৩০ মিনিটের। এ সময়ে সব শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলক বাইরে বের হতে হয় ও খেলাধুলা করতে হয়। এছাড়াও স্কুল থেকে মাঝে মাঝেই ক্যাম্পাসের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এজন্য আবহাওয়ার পূর্বাভাসানুযায়ী শিশুদেরকে রেইন কোট ও অন্যান্য শীতের পোশাকাদি পরে স্কুলে যেতে হয়। নিজেদের সন্তানদের দিয়ে যা দেখেছি, এসবে তারা খুব সহজেই অভ্যস্ত হয়ে যায়। নিজেরাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস চেক করে এবং সে অনুযায়ী পোশাক পরে।

বাইরে থেকে কেউ নরওয়েতে এলে যে জিনিসটি সবার নজর কাড়ে তা লাঞ্চবক্স। নরওয়েজিয়ানরা অফিসেও যেমন সবাই লাঞ্চবক্স নিয়ে যায়, স্কুলগুলোতেও প্রত্যেক শিশুকে লাঞ্চ বক্স নিয়ে যেতে হয়। তবে শিশুদের স্কুলে দেয়া লাঞ্চে কেক বা চিপস জাতীয় কোন খাবার এবং কোলা জাতীয় পানীয় থাকতে পারবে না। সবাইকে একসাথে বসে লাঞ্চ করতে হয় এবং এর তদারকি করেন একজন শিক্ষক।

স্কুলে সপ্তাহে একদিন শারীরিক শিক্ষা ক্লাস থাকে। স্কুল থেকে শিশুদেরকে সুইমিং পুলে নিয়ে যাওয়া হয় যাতে তারা সাঁতার শিখতে পারে। আমাদের ছেলে ও মেয়েকে অবলোকন করে যা দেখেছি, স্কুল থেকে তারা সমসাময়িক ইংরেজি গান, টিভি শো, ইত্যাদি বিষয়ে আইডিয়া নিয়ে আসে এবং বাসায় সেগুলো শোনে ও দেখে; কখনও স্কুল থেকে রান্না শিখে এসে বাসায় নিজেরাই তার প্রয়োগ ঘটায়। এছাড়া স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের মানবিক কাজে উৎসাহী করা হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ ছাত্র-ছাত্রীদেরকে ফান্ড সংগ্রহ করতে বলে, যা তৃতীয় বিশ্বের গরীব দেশগুলোর শিশুদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য পাঠানো হয়। ফান্ড সংগ্রহের জন্য শিক্ষার্থীরা বাবা-মায়ের কাছে হাত পাতে না, নিজেদের তৈরি খাবার বিক্রি করে। তাদের এই উৎসাহ পরবর্তী জীবনে তাদেরকে মানবিক হতে সাহায্য করে।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

নরওয়েজিয়ান কিন্ডারগার্টেন এবং স্কুলের শিক্ষকরা শিক্ষার পাশাপাশি এটাও দেখেন শিশুটি পরিবারে কোন শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কিনা। কোন শিশুর শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখলে কিংবা কোন অস্বাভাবিকতা নজরে এলে তারা শিশুটির সাথে কথা বলেন। যদি এমন কিছু প্রমাণ হয় যে, শিশুটি সত্যিই শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তবে তারা নরওয়েজিয়ান চাইল্ড ওয়েলফেয়ার সার্ভিসকে (বার্নাভার্ন) জানিয়ে দেন।

বার্নাভার্ন এমন অভিযোগ পেলে প্রথমেই ঐ পরিবারে থাকা সব বাচ্চা তুলে নিয়ে যায়। এরপর বাবা-মাকে তাদের বাচ্চা ফেরত আনতে হলে আইনের আশ্রয় নিতে হয়। কেউ কেউ ফেরত পান, তবে অনেকেই পান না। সেক্ষেত্রে বাচ্চা বেড়ে ওঠে অন্য কোন পরিবারে (ফস্টার ফ্যামিলি)। বাবা-মা বাচ্চাকে দেখার অনুমতি পান, কিন্তু বাচ্চাকে লালন-পালনের অধিকার পান না। আমাদের বাসার কাছেই এক ইরিত্রিয়ান পরিবার বাস করে, যাদের পাঁচটা বাচ্চার মধ্যে চারটা বাচ্চাই বার্নাভার্ন নিয়ে গিয়েছে। একটা নেয়নি, কারণ সেটা তখনও স্তন্যপান করছিলো। বার্নাভার্ন মানে নরওয়েজিয়ান চাইল্ড ওয়েলফেয়ার সার্ভিস, তাদের কঠোরতার জন্য সারা পৃথিবীতেই বেশ সমালোচিত, তবে নরওয়েজিয়ান সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি। এটা যে বাবা-মাকে সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত যত্নশীল হতে বাধ্য করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

নরওয়েতে কোন স্কুল ইউনিফর্ম নেই। দু’একটা বিশেষ চাকুরি ছাড়া এখান ড্রেসকোডের বালাই নেই। এক জাতীয় দিবস (১৭মে) ছাড়া টাই পরতে দেখা যায় কেবল বাস ড্রাইভারদের। যেহেতু এখানে ধনী বাচ্চাদের শো-অফ করার তেমন সুযোগ নেই, তাই স্কুল ইউনিফর্মের প্রয়োজন হয় না।

৪. যৌনশিক্ষা:
নরওয়েজিয়ান বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের কেবল পাঠদানই করা হয় না। পঞ্চম শ্রেণী থেকেই শিশুদেরকে যৌনতার ধারণা দেয়া হয়। মেয়েদেরকে এ সময়ে মাসিক ঋতুচক্র সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়। এছাড়া স্পর্শের সীমা, sexual assault, ইত্যাদি বিষয়গুলো ব্যাখ্যার জন্য ভিডিও ব্যবহার করা হয়। এতে শিশুরা একদিকে যেমন তাদের শরীর সম্পর্কে জানতে পারে, তেমনি বুঝতে পারে তাদের সাথে ঘটা কোন সন্দেহজনক আচরণ। এছাড়া নরওয়েতে সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছেলে-মেয়ে একইসাথে পড়াশুনা করে। ক্লাসে কেউ ইচ্ছে মতো বসতে পারে না, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট আসন রয়েছে। সেটা ছেলে-মেয়ে যে কারো পাশে হতে পারে।

পরিশেষ:

নরওয়েজিয়ান শিক্ষাব্যবস্থা শিশুদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে না, বরং শিক্ষাকে করে তোলে আনন্দদায়ক। এর ফলে যা হয়, শিশুরা স্কুল পালানোর কথা চিন্তা করে না, উল্টো স্কুলে যাবার জন্যেই উৎসাহী থাকে। একইসাথে এই শিক্ষা পদ্ধতি শিশুদের নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলা শিখায়। করে তোলে সাবলম্বীও। এর প্রভাব পড়ে পরিবারেও। শিশুরা ঘরে তাদের বাবা-মাকে ছোটখাট কাজে সাহায্য করে। যেমন, থালা-বাসন ধোয়া, পিয়াজ তরকারী কোটা, নিজের নাস্তা কিংবা লাঞ্চবক্স প্রস্তুত করা, ইত্যাদি।

স্ক্যান্ডিনেভিয়ান শিশু-শিক্ষা মডেল পৃথিবীর অন্য উন্নত দেশগুলোকেও আকৃষ্ট করেছে। অনেক দেশ তাদের শিশু-শিক্ষা মডেলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান মডেলের ব্লেন্ডিং করছে। বাস্তবতার নিরিখে বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থার প্রণয়ন এখনই সম্ভব নয়, হয়তো ভবিষ্যতেও সম্ভব হবে না, কিন্তু বর্তমানে যে শিশু-পীড়নমূলক শিক্ষা চালু রয়েছে, তার থেকে আশু মুক্তি প্রয়োজন। সেইসাথে প্রয়োজন শিশুদের প্রতি বাবা-মায়ের আচরণের পরিবর্তন, যাতে শিশুদের সুস্থ ও স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ ঘটে, ও তারা স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে।

(লেখক: ব্লগার, লেখক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট)

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 296
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    296
    Shares

লেখাটি ৬৫১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.