‘মা’ রোলকে অতিরঞ্জিত মহীয়ান করবেন না!

0

শেখ তাসলিমা মুন:

‘মায়ের এক ধার দুধের দাম, কাটিয়া গায়ের চাম’ – এ ধরনের অনেক অনেক কথা দিয়ে মায়ের রোলকে অতিরঞ্জন করা হয়। অতিরঞ্জিত ‘মা’ রোল সামাজিক এবং আরোপিত। এ আরোপিত মাহাত্ম্যপূর্ণ ‘রোল’ এ সাজেশন নিহিত। এ রোল তাদের জন্য এভাবে তৈরি করা হয়।

মা হওয়া জৈবিক প্রক্রিয়ার অংশ। নারীর শরীরের এ ফাংশনের কারণেই সে সন্তান ধারণ করে। শুক্রাণু আর ডিম্বানুর যৌথ প্রযোজনায়ই প্রাণের সঞ্চার হয় নারীর ওম্বে। নয় মাস সেখানে সন্তান বড় হয়। প্রসব ঘটে। স্তন্যদানও এ প্রসেসের অংশ। সন্তানের জন্মের ২৪ ঘণ্টার ভেতর শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করতে শেখে। এর কোনটাই মা এড়াতে পারে না। মায়ের শারীরিক উপস্থিতি বা সন্তানের উপস্থিতি মায়ের শরীরে এ প্রসেসে একটি দৃশ্যমান ভূমিকা রাখে। গর্ভধারণের সার্বিক প্রসেসটি মায়ের শরীরে এবং তার শরীরে সেভাবে তৈরি। তার স্তন থেকে ন্যাচারালভাবেই দুধ ঝরতে থাকে। শিশুর পানের মাধ্যমে সে নিঃস্বরণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এটি একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। এ প্রসেসের ভেতর মা এবং সন্তান দুজনের একটি নিবিড় সম্পর্ক স্থাপিত হতে থাকে এবং দুজনই তাদের নৈকট্য উপভোগ করে।

এ প্রসেসে আর একজন মানুষ থাকে, তিনি সন্তানের বাবা। মনে রাখা দরকার, সন্তানের জন্য বাবা এবং মা দুজনই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শুনে অবাক হবার কারণ নেই যে, গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুর জন্মের মাত্র দু সপ্তাহের ভেতর সে বাবাকে ‘বাবা’ বলেই চিনে ফেলে। বাবা কাজে গেলে সে বাবাকে খুঁজতে পারে, এবং মিস করে। পশ্চিমের অনেক দেশে জন্মের সময় বাবাকে লেবার রুমে পুরোটা সময় রাখা হয়। লেবার পেইন এবং শিশুর জন্মের পুরো প্রসেসে বাবা অংশগ্রহণ করে। অনেক বাবাই সন্তানের নাভি থেকে নাড়িটি কাটেন। জন্মের সাথে সাথে মিডওয়াইফ বাচ্চাটিকে মায়ের বুকে শুইয়ে দেয়। এর মাধ্যমে মায়ের গর্ভের গরম থেকে পৃথিবীতে প্রবেশের পর যে ট্রমা ও একাকিত্ব সে অনুভব করে, সেটাকে দূরীভুত করার চেষ্টা করা হয়। সে মায়ের বুকে মায়ের গন্ধ বুঝতে সক্ষম হয়। এরপর বাচ্চাকে তার বাবার বুকের উপর শুইয়ে দেওয়া হয়। সে বাবার গায়ের গন্ধ চিনতে শেখে এভাবে।

গবেষণা বলে, একটি শিশু জন্মের পর থেকেই সমানভাবে বাবা এবং মায়ের প্রয়োজন বোধ করে, মিস করে। শিশু তার বাবাকে খোঁজে।
এরপর যেটা ঘটে বাবা এবং মায়ের রোলকে সামাজিকীকরণ করা হয়। তাকে স্ট্রাকচার করা হয় সামাজিকভাবে। সেটি জৈবিক নয়। সামাজিক।

ধরে নেওয়া হয় মাকেই সন্তানের বেশি দরকার। বাবার দরকার সেভাবে নেই। বিষয়টি সেটি নয়। জন্মের পর কিছু কারণে হয়তো মায়ের ভূমিকা বেশি থাকে। যেমন স্তন্যদান। কিন্তু পশ্চিমে অনেক বাবা এবং মা জন্মের পর একসাথে ছুটিতে থাকতে পারেন। এমন ছুটির সময়কাল সুইডেনে ৪০ দিন। এরপর বাবা এবং মা প্যাটারনাল লিভ ভাগ করে নেন। একটি তিন মাসের শিশুকে বাবা দিব্যি চমৎকারভাবে মানুষ করছে। সে বাচ্চা মায়ের অভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রুফ এরা খুঁজে পায়নি। এমন কোন ঘটনাও ঘটেনি।

আমাদের সমাজ বাবার রোল দূরত্ব দিয়ে তৈরি করে। বাবাদের সন্তানের প্রতি অভিব্যক্তিতেও পার্থক্য দেখা যায়। বাবারা মায়েদের মতো আবেগ প্রদর্শন করে না, যা তাদের পুরুষ রোলকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সন্তান পরিচর্যার ক্ষেত্রেও দেখা যায়, সন্তানের পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে সবকিছু মা বা ঘরের অন্য নারীরা করবে। তারা বাচ্চাকে সুন্দর করে তৈরি করে দেবে। বাবা তাকে কোলে নেবে, বা সামান্য বড় হলে হাত ধরে বাইরে যাবে। দোকানে গিয়ে মিষ্টি কিনে দেবে। বাবাকে এমন রোলে দেখেই সন্তান বড় হয়। এভাবে সে নিজেও সে রোল নিজের ভেতর রচনা করে ফেলে।

বাস্তব হলো, সন্তানের জীবনে বাবা এবং মা উভয়ের রোল দরকারি। একজনের ভূমিকা আর একজন পূরণ করতে পারে না। বাবা এবং মা উভয়ের ইমোশনাল টাচ সন্তানের জন্য জরুরি।

আমাদের আধুনিক জীবনে দাম্পত্য সম্পর্ক চিরস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নয়। এখানে বিচ্ছেদ অনেক বেশি এক বাস্তবতা। ‘সুখী বিবাহ বিচ্ছেদ’ বলে কিছু নেই হয়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, তবে যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদকে অনেক বেশি সহজ করে তোলা যায়। বিশেষ করে যদি সন্তান থাকে। সন্তানকে নিজেদের কনফ্লিক্টের পার্ট না করে সন্তানের কাছে বিচ্ছেদকে সম্মানিত এবং ক্লেশ্মুক্ত রাখতে পারেন বাবা মা-ই শুধু, আর সেটা পারেন তাদের সন্তানের অধিকারকে অগ্রগণ্য হিসেবে দেখতে পারার ক্ষমতা দিয়ে। সন্তান ভিন্ন রূপরেখায় বাবা-মাকে ভালবাসতে পারে। সম্মান রাখতে সক্ষম হয়। বিচ্ছেদকেও অনেক পেইনফ্রিভাবে দেখতে পারে। আর তার জন্য বাবা ও মায়ের রোল বিষয়ে ধারণাকে শার্প করতে হবে। স্বীকার করতে হবে সন্তানের জীবনে বাবা এবং মা উভয়ের রোল সমান। একজনের রোল অন্যজনের থেকে কম নয়।

মায়ের প্রয়োজনকে বেশিমাত্রায় ভূমিকায়িত করার পেছনে থাকে সামাজিক ষড়যন্ত্র। নারীকে তার স্বকীয় সত্ত্বা থেকে সম্পর্কায়িত করে তাকে সীমাবদ্ধ করা হয়। তার সকল দোষে গুণে গড়া সত্ত্বাকে গৌণ করা হয়। একজন নারীর নিজের ইন্ডিভিজ্যুয়াল আইডেন্টিটির থেকে তাকে ভূষিত করা হয় বিভিন্ন রোলে। মা, স্ত্রী, ভগ্নি ইত্যাদি আদর্শায়িত রোলে তাকে এমনভাবে মহিমান্বিত করে তোলা হয় যে, এ ‘রোলে’র বাইরে তার আর কোনো সত্ত্বা বা পরিচয় আছে কীনা, তিনি আর নিজেও মনে করতে পারেন না।। এ রোলগুলোতে তাকে কীভাবে অ্যাক্ট করতে হবে, সেটিও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। আর এগুলো নির্ধারণ করা হয় রোলগুলো ডিফাইন করার মাধ্যমে।

মা সারাজীবন চোখের জল ফেলা কোনো করুণ প্রাণী নয়। এ রোল তার জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। তিনি কেবল সে রোলটি প্লে করে যান। এ ডিজাইন সামাজিকভাবে তার মস্তিষ্কে এবং তার সারা যাপিত জীবনে রোপণ করা। আরোপ করা হয়। এর বাইরে কিছু ভাবা বা করা অর্থ ‘খারাপ’ মা। মা মানেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে একটি রূপ, যিনি কেবল দিয়েই যান। নিজের জন্য ভাবেন না। দিতে দিতে তিনি নিঃস্ব হয়ে যাবেন, কিন্তু আজীবন থাকবেন মা।

এটি কোনভাবেই একটি আদর্শ রোল হতে পারে না। মাকে একজন ইন্ডিভিজ্যুয়াল হয়ে উঠতে হবে। তার জীবনের দেনা-পাওনা বুঝে নিতে হবে। তাকে ভালো-মন্দ মিলিয়ে একজন মানুষ হিসেবে দেখতে শিখতে হবে। মা-ও ভিন্ন। এক মা আরেক মা থেকে আলাদা। তার ব্যক্তিত্ব এবং ইন্ডিভিজ্যুয়াল সত্ত্বা হিসেবে আলাদা হবার অধিকার রয়েছে, এবং সেজন্য তিনি ‘খারাপ’ মা, এমন ভাবনা থেকে মাকে মুক্ত করতে হবে।

তিনি একজন মানুষ। ভালো এবং মন্দের সমষ্টি। অতিরিক্ত মহানুভতা মা চরিত্রে আরোপ করে তাকে ভারাক্রান্ত করবেননা। মা কোনো রোল নয়। মা একটি প্যারেন্টাল সত্ত্বা। ঠিক যেমন বাবাও একটি প্যারেন্টাল সত্ত্বা। কেউ কমও নয়। কেউ বেশি নয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 864
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    864
    Shares

লেখাটি ২,৭৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.