তাসফিয়া খুন এবং আমাদের লুপ্তপ্রায় মূল্যবোধ

0

সালমা লুনা:

চিটাগাং এ তাসফিয়া নামে বাচ্চা একটি মেয়ে খুন হয়েছে। ধর্ষিত হয়েছে বলতে চাইছি না। কারণ এখন পর্যন্ত পুলিশ এমন কিছু বলেনি। সুরতহালে মুখে এবং দেহে আঁচড়ের দাগ পাওয়া গেছে – এ পর্যন্তই। এরকমটি ধর্ষণ ছাড়াও হতে পারে। খুনের সময় ধস্তাধ্বস্তিতেও এমনটা হতে পারে। জ্বী, এই কথাগুলো আমি খুব নির্বিকারভাবেই লিখছি। কারণ এইসব খুনটুন এখন আমরা বেশ নিতে শিখে গেছি।

হ্যাঁ। এরকম খুন খারাবি তো আকছার হচ্ছেই দেশে। আইনও তার নিজস্ব গতিতেই চলছে। সেসব নিয়ে কিছু বলে আর মহাপাতকী হয়ে কী লাভ!

তবুও এই খুনটি নিয়ে কয়েকটা কথা বলতেই হচ্ছে। শুধু একটি পনেরো বছরের ক্লাশ নাইনে পড়া মেয়ে বলে নয়। পারিপার্শ্বিক কিছু ঘটনা বিশ্লেষণ করেই কথাগুলো বলতে হচ্ছে। বলতে হচ্ছে আমাদের আরো অনেক তাসফিয়াদের জন্য। তাসফিয়াদের অভিভাবকদের জন্য। এমনকি তাসফিয়ার সম্ভাব্য খুনী আদনানের মতো কিশোর এবং তাদের অভিভাবকদের জন্যও। আর মিডিয়ার কিছু বেআক্কেল, বাণিজ্যলোভী এবং অমানুষ সাংবাদিকদের জন্যও।

খবরে জানা যায় তাসফিয়া চিটাগাং এ যে স্কুলে পড়তো সেই স্কুলেরই ক্লাশ টেনের এক ছেলের সাথে তার ভাব হয়। আদনান নামের সেই ছেলেটিকে তার প্যারেন্টস অন্য একটি স্কুলে নিয়ে গেলে দূরত্বই তাদের মধ্যে আরো গভীর সম্পর্ক গড়ে দেয়। অপ্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলেমেয়ে দুটি ভাবতে থাকে এটি প্রেম। তারা ফেসবুকে যোগাযোগ চালিয়ে যায়। ইতিমধ্যে তাসফিয়ার বাবা-মা বিষয়টি টের পেলে তারা মেয়ের ফেসবুক বন্ধ করে দেন। এরপর মেয়ে ইন্সটাগ্রামে যোগাযোগ চালিয়ে যায়। বিষয়টি আবারও তাসফিয়ার মা টের পেয়ে তাসফিয়ার বাবাকে জানালে বাবা আদনানকে ডেকে এনে বকে দেন।

এরপর আবার তাদের সম্পর্কের একমাস পূর্তির দিন গত মঙ্গলবার ১ মে তাসফিয়া বাসা থেকে বেরিয়ে যায় আদনানের সাথে দেখা করার জন্য। এদিকে তাসফিয়ার বাবা-মা বিষয়টি টের পেয়ে খোঁজাখুজি শুরু করেন এবং একপর্যায়ে আদনানকে কৌশলে ডেকেও আনেন বাসায়। আদনান স্বীকারও করে তারা একটা রেস্টুরেন্টে বসে আইসক্রিম খেয়েছে, যা রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা গেছে। এরপর তাসফিয়া কোথায় তা সে জানে না। এদিকে আদনানকে ছাড়িয়ে নিতে প্রভাবশালী সন্ত্রাসীরা আসে এবং ছাড়িয়েও নেয়। তারা আশ্বাস দেয় তাসফিয়া ফিরবে। কিন্তু সে আর ফেরেনি। পরদিন সকালে তাকে পথচারীরা দেখতে পায়। পতেঙ্গার পাথুরে তীরে মুখ থুবড়ে পড়েছিলো বাবা-মায়ের অতি আদরের কন্যা তাসফিয়া।
প্রাণহীন।

আদনানকে ধরা হয়েছে আবার। কিন্তু সেই প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদের ধরা যায়নি এখনো। তারা নিয়ম মেনেই ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এখন দেখি আমাদের মহান মিডিয়া এটিকে কীভাবে বাণিজ্যের উপাদান বানালো।
প্রথমেই লেখা হলো মেয়েটি ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রী। ছেলেটিও। এবং তারা ধনী পরিবার থেকে আসা। এটি মুখ্য বিষয় হলে পাবলিক খাবে ভালো। কারণ ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলেমেয়েরা হেন জঘন্য কাজ নাই করে না, আর ধনী ঘর মানেই পাপ অনাচারের জায়গা, তাদের ছেলেমেয়ে মাত্রই বখাটে বদ – এমনটাই আমাদের পূণ্যভূমি বাংলাদেশের আদর্শ সমাজে বহুল প্রচারিত এবং প্রচলিত।

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় ট্রান্সকমের মালিকের কন্যাটি যখন নিজগৃহে অনুষ্ঠান চলাকালে গৃহকর্মীদের দ্বারা নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়ে নৃশংসভাবে খুন হয়, সেসময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বলা কথাটি। উনার মতো একজন প্রাজ্ঞ, শিক্ষিত এবং ঝানু রাজনীতিবিদ যখন অমনটা বলতে পেরেছেন সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে এই বাঙাল সমাজের সিংহভাগ অনগ্রসর অর্ধশিক্ষিত আর কুশিক্ষিত মানুষগুলির মন পড়তে পারা ‘খবর বেচুবাবু’রা কী লিখতে পারে, বোঝা হয়ে যায়।

এই ইংলিশ মিডিয়াম আর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে আমার, আপনার, আমাদের সন্তানরাই পড়ে। এদেশের নাগরিক তারাও। তারাও দেশে বা বিদেশে থেকে এদেশেরই সেবা করে। সুনাম কুড়ায়। তবে কেন এমন ঘৃণার চাষবাস?

এদেশের ধনীরা তো আর সবাই চোর ছ্যাঁচড় না, ব্যাংক লুটেরা না, ভোট ডাকাত না, বিদেশে যাবার সময় নিজ ক্ষমতাবলে পোটলা করে টাকা পাচারকারী না, রাজনীতির তুঘলকদের তেলমারা পা-চাটা গোলাম না। কেউ কেউ সৎভাবেও রোজগার করে দুপয়সা রোজগার করে সপরিবারে ভালো থাকার চেষ্টা করে যান। স্বল্প হলেও কর্মসংস্থান করেন কিছু মানুষের। তাদের পেটে ভাত যোগানোর দায়িত্ব নেন।

তাহলে ঢালাওভাবে ধনী ঘরের সন্তান, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া বখাটে – এই ধরনের খবর করার আগে নিজেদের দৈন্যতা ঘোচান একবার আপনারাও। আপনারা বরং সেই দুজন বড়ভাইদের গডফাদারদের নিয়ে লিখলে, তাদের কেন খুঁজে পাওয়া যায়না যেকোন ঘটনার পরে – সেসব নিয়ে লিখলে উপকার হবে।

তাসফিয়া ও আদনান ধনী ঘরের ছেলেমেয়ে বুঝলাম। আজকাল ছেলেমেয়ে বিপথগামী হতে হলে ধনসম্পদ খুব একটা ম্যাটার করে বলে মনে হয় না। যে কিশোর কিশোরীটির বাবা-মায়ের নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা, তারও একটি স্মার্টফোন আছে এযুগে। মামা-খালা, চাচা-ফুপু নয়তো বাবা-মাই আহ্লাদ করে জন্মদিনে, নয়তো ভালো রেজাল্ট উপলক্ষে সেটি তাদের উপহার দিয়ে ফেলেন। তারা শহরের পাড়া মহল্লায় আনাচে-কানাচে গজিয়ে উঠা ক্যাফে-রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে চাইলে মানা করতে পারেন না।

আর যাদের টাকাপয়সার ভাড়ার উপচে পড়ে তারা তো এমনিতেই ওইসব দামী ফোন, পোশাক, ঘড়ি, সানগ্লাস ইত্যাদি না চাইতেই সবকিছু দিয়ে থাকেন। ছোট ছোট বাচ্চাদের হাতেও যেসব ফোন, ঘড়ি শোভা পায়, তা দেখলে অনেক সময় চোখ কপালে উঠে যায়। বাচ্চাদের পকেট মানি দিতে গিয়ে বাবা-মা’রা তাদের মানিব্যাগের সুস্বাস্থ্য উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করতে থাকাকেই তাদের পিতামাতা জনমের পরম উদ্দেশ্য বলে ভাবেন। শহরের সবচেয়ে দামী রেস্টুরেন্টে সন্তানকে বন্ধুবান্ধবসহ খেতে পাঠিয়ে আত্মতৃপ্তি পান। কিন্তু এমনটি ঠিক কিছুতেই নয়। অন্তত প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার আগে তো নয়ই। এটিও এই ঘটনার শিক্ষা হিসেবে নিতে হবে।

আর রইলো বাকি আমাদের মূল্যবোধের শিক্ষা। যাকে আমরা গালভরে ভ্যালুজ বলে থাকি। সেই শিক্ষা কী করে দেবেন, আমি নিজেও জানি না। কারণ যুগটা এখন ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ‘যেমন খুশি তেমন চলো’র। এই যেমন খুশি তেমন চলো করতে গিয়ে মানুষ ন্যাংটোই হয়ে গেলো প্রায়। এখন আত্মাভিমানে কেউ আর কাউকে বলতে পারে না, ‘ওহে তোমার গায়ে কাপড় নাই’। কারণ তাহলেই সে সেকেলে। আধুনিক হবার ইঁদুর দৌড়ে সে পিছিয়ে পড়লো।

আমি আমার মোটা এবং সেকেলে বুদ্ধিবলে যা বুঝি তা হলো, আপনিও সেকেলে হোন না, অসুবিধে কী? সেকেলে হয়ে খোঁজ রাখুন ছেলেমেয়ে কার সাথে মিশছে। বাইরে যাচ্ছে ঘনঘন কাদের সাথে। সেখানে যাদের কথা বলে যাচ্ছে বাস্তবিকই তারাই তাদের সঙ্গী-সঙ্গিনী কীনা! স্কুলে কোচিংএ নামিয়ে দিয়ে আসছেন তারা আদৌ সেখানে যাচ্ছে কীনা লজ্জার মুড়োল্যাজা খেয়ে সেসবও খোঁজ রাখুন। তারা রাগ করবে জেদ করবে অভিমানে গাল ফোলাবে সেগুলোকে কব্জা করা শিখুন।

আপনি তো জানেন এই বয়সে আপনি কেমন ছিলেন! কী ভাবতেন! কতটা স্বেচ্ছাচারী ছিলেন, জেদ করতেন – সেসব তাদের সাথে শেয়ার করুন। জীবনের রঙিন দিকটা আপনার সন্তান দেখছে, অন্ধকারও যে আছে সেটিও চেনান সন্তানকে। বন্ধু হোন। লোক দেখানো, অভিনয় করা বন্ধু নয়, সত্যিকারের বন্ধুর মতোই আচরণ করুন। সদা সতর্ক থাকুন। কষ্ট হবে, তবু পারতে হবে।

আমরা বাবা-মা, আমরা না পারলে কে পারবে ওদের ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে? নয় মাস গর্ভে রেখে জন্ম দিই , কষ্ট করে বুকে নিয়ে বড় করি, নিজের মুখের খাবার ওদের খাইয়ে সুখী হই কি এইদিন দেখবার জন্যে ? যে দিনে সন্তান না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে। পরদিন তার প্রাণহীন দেহ মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে কঠিন পাথুরে খাঁজে। স্বজনদের সাথে নিয়ে মর্গে যেতে হবে প্রিয় সন্তানকে শনাক্ত করতে। অথবা সন্তানকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে আরেকজনের ফুটফুটে সন্তানকে খুন করার দায়ে। এবং সন্তানের দশদিনের রিমান্ডের খবরে বুক বেদনায় বিদীর্ণ হবে।

পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে নুব্জ হয়ে চোখের পানিতে ঝাপসা পথে চলতে হবে। আজীবন বুকের মধ্যে পাথরের মতো বেদনার বোঝা বইবার চেয়ে একটু সেকেলেই হোন না হয়। খোঁজ রাখুন সন্তানের সকল প্রকার গতিবিধির।

নিজের সন্তানকে বেনিয়াদের খবর হওয়া থেকে বাঁচান। কারণ সন্তানটি শুধুই আপনার কলিজার টুকরা, বহু আদরের ধন। এটি আপনি ছাড়া আর কেউ কোনদিন কোনোভাবেই বুঝবে না। কেউ না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 984
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    984
    Shares

লেখাটি ৪,৯৫৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.