সন্তানের ভালো করতে গিয়ে অমঙ্গল করছি না তো!

0

নাসরিন শাপলা:

বাসটা বেশ খালি খালি, সামনের দিকে মাত্র পাঁচজন বসে আছি আমরা, পিছনটা পুরো ফাঁকা। অফ পিক আওয়ারে এমনই থাকে। এই ভীড়ভাট্টা কমের সময়টা আবার বয়স্ক নারীপুরুষদের খুব পছন্দের। প্রায়ই দেখি দল বেঁধে কিশোরকিশোরীদের মতো খলবল করতে করতে কোথাও চলছে। আজ তেমন কোন দলকেও চোখে পড়ছে না। তবে বাস ভরা থাকুক আর খালি থাকুক সময় মেনে তাকে ছাড়তেই হবে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাত্রী বোঝাই করার সুযোগ নাই।

জানালার পাশের সিঙ্গেল সীটটায় বসে বাইরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে অন্য কিছু চিন্তা করছিলাম। আমার গন্তব্য আসতে এখনো অনেক দেরী। বারবার মনোসংযোগ ছুটে যাচ্ছিলো পাশের ডাবল সীটে বসা তরুন-তরুনীর হাসির শব্দে। বোঝাই যাচ্ছে কাপল, বয়স ২৩/২৪ এর এদিক সেদিক হবে।পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে কোন কার্পন্য নেই। আমাদের দুই পাশের সীটের মাঝখানের জায়গাটি খুব বেশী প্রশস্তও নয়। অনেকটা জোর করে ওদের থেকে চোখ সরিয়ে রাখতে হচ্ছিলো-এটাই এখানকার ভদ্রতা।

প্রতিটি স্টপেজেই যাত্রী উঠছে। আমার সীট থেকে বাসের দরজাটা খুব ভালোভাবে দেখা যায়। যাত্রীরা উঠে আমার পাশ দিয়েই বাসের পিছনের দিকে এগুচ্ছে। পিছন দিকটা আস্তে আস্তে ভরে উঠছে। প্রতিটা যাত্রীর ওঠানামা খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছি। তবে আবার সাবধানও থাকতে হচ্ছে যেন আগ্রহটা দৃষ্টকটূ না দেখায়। আমার পাশের কপোত কপোতি আবার একেবারেই আমার উল্টো। কোথায় কি হচ্ছে কোন ভ্রূক্ষেপ নেই, পরস্পরের সাথে হাসি, ঠাট্টায় বুদ হয়ে আছে।

এবারের স্টপেজে বাস থামতেই হাত ধরাধরি করে উঠলেন দুই শ্বেতাঙ্গ বুড়ো-বুড়ি। তাদের পিছন পিছনে উঠলো আরেক ২৩/২৪ বছরের যুবক। ছেলেটিকে আমার কাছে দক্ষিন এশীয় বলেই মনে হচ্ছে। বুড়ো ধীরে সুস্থ্যে সময় নিয়ে দু’জনের টিকিট বের করছেন। ছেলেটি ধৈর্য্য নিয়ে তাদের পিছনে অপেক্ষা করছে। মনে মনে ছেলেটির সহবতের প্রসংশা করছিলাম। অবশেষে বুড়োবুড়ির বাক্সে টিকিট ফেলা শেষ হলে, চটজলদি বাসের পাস ড্রাইভারকে দেখিয়ে ছেলেটি সামনের দিকে আগাতেই তার চোখ আমার পাশের কাপলের দিকে পরলো, আবার চট জলদি চোখ সরিয়েও নিলো। ওর ঐ এক মুহুর্তের আচরণে কেন যেন মনে হলো কাপলটি ছেলেটির পরিচিত, কিন্তু ছেলেটি ওদের কোন কারনে এড়িয়ে গেলো। হয়তো ওদের গল্পের মাঝে বিরক্ত করতে চায়নি।

ছেলেটা আমার ঠিক সামনের খালি সীটটাতে এসে বসলো। ওর মুখের একপাশটা আমি স্পষ্ট দেখতি পারছি। ঊঠেই কানে ইয়ার প্লাগ গুজে সেলফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। বাস আবার চলতে শুরু করেছে। স্টপেজগুলো একটা আরেকটা বেশ কাছাকাছি। পরবর্তী স্টপেজের ঘোষনা আসতেই আমার পাশের যুগল উঠে দাঁড়ালো। তক্ষুনী আমার সামনে বসা ছেলেটি ওদের চোখে পড়লো। আমার পাশে দাঁড়িয়েই ‘হাই’ ‘হ্যালো’ শুরু হলো। সামনের ছেলেটি এমন ভাব করলো যেন ওদের আগে দেখতেই পায়নি (কিন্তু আমি জানি ও দেখেও এড়িয়ে গেছে)। ওদের কথায় বুঝলাম, সামনে বসা ছেলেটির নাম ‘রাজ’ এরা একসাথে ইউনিভার্সিটিতে পড়তো। অন্য ছেলেটি জনাথন, মেয়েটির নামটি বুঝতে পারলাম না।

একে অন্যের কুশলাদী জানতে ব্যস্ত। আমারও না শুনে কোন উপায় নেই- পুরো ঘটনাটি ঘটছে আমার কয়েক ফিটের মধ্যে।মেয়েটি সগৌরবে তার রিং ফিঙ্গারে আংটি পরা হাতটি রাজের দিকে এগিয়ে দিয়ে ওদের এনগেজমেন্টের খবর জানালো। রাজের কন্ঠ শুনলাম ‘কংগ্র্যাচুলেশন! সো হ্যাপী ফর ইউ”। মেয়েটি জানালো সে গতমাসে জনাথনের সাথে মুভ ইন করেছে, দুজন’ই আগের অফিসেই কাজ করছে, শীঘ্রই বিয়ে করবে। জনাথন জানতে চাইলো, রাজ কি আগের চাকরীতেই আছে কি না? রাজের অস্ফুট ‘না’সূচক উত্তর কানে এলো, নতুন জব খুঁজছে সে। ভেসে আসলো জনাথনের গলা ‘গুড লাক’। আগের ঠিকানায় আছে কি না জানতে চাইলে রাজ জানালো এখন আপাতত বাবা-মায়ের সাথে আছে। অনেকটা ব্যাখ্যা দেবার ভঙ্গীতে বলতে শুনলাম,” আই অ্যাম সেভিং সাম মানি ফর ডাউন পেমেন্টস। সুন আই উইল বাই মাই ওন কন্ডো”। “গুড ফর ইউ ম্যান! এনি লাক উইথ গার্লস?” রাজের উত্তরের আগেই মেয়েটির ঝরঝরে হাসির শব্দ শুনলাম, ‘হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট জনাথন? রিমেম্বার, রাজ ইজ নট অ্যালাউড টু হ্যাভ গার্লফ্রেন্ড? হিজ প্যারেন্টস উইল নট অ্যাপ্রুভ” আবার এক পশলা হাসি।

বাস থেমে গেলো। ‘গুড লাক ম্যান” বলে রাজের কাঁধে হাল্কা চাপর দিয়ে জনাথন তার ফিয়ান্সে নিয়ে বাস থেকে নেমে গেলো। আমার খুব রাজের মুখটি দেখতে ইচ্ছে করছিলো। ওদের কথাগুলো আমার কানে যেমন এসেছে, আমি নিশ্চিত বাসের আরো অনেকের কানেই গেছে। চোখের ভুল কি না জানিনা, ছেলেটার মুখটা এপাশ থেকে খানিকটা লাল লাগছে মনে হলো। মাথাটা কি একটু বেশীই সেলফোনের দিকে ঝুঁকে আছে? এদেশে অ্যাডাল্ট ছেলেমেয়ে বাবা-মায়ের সাথে থাকবে এটা খুব অস্বস্তিকর বিষয়। আর বাবা-মায়ের ইচ্ছেয় বিয়ে করার আমাদের দেশীয়রীতি এখানে অচিন্তনীয়। আমি নিশ্চিত রাজের এই গার্লফ্রেন্ড না থাকার বিষয়টি এর আগেও হাসাহাসির কারন হয়েছে।

অচেনা এই ছেলেটির জন্য কেন যেন খুব মায়া লাগছিলো। কি জানি? সব বাবা-মাই সন্তানের ভালো চান, তবে সেই ভালোটা তারা তাদের নিজের মতো করে চান। সন্তান কি চায়, সেটা আমরা খুব কমই বুঝতে চেষ্টা করি। বাচ্চাগুলো তখন বড় দোটানার মাঝে বড় হয়। আমরা বাচ্চাকে পানিতে নামিয়ে আশা করি অন্য সবাই সাঁতার কাটলেও, সে বাবা-মায়ের আশা আনুযায়ী সাঁতারকাটার পরিবর্তে হাটবে। বাই সাইকেলে তুলে দিয়ে আশা করি মায়ের আশা পুরন করতে আকাশে উড়বে। ভালোবাসা আর অধিকারবোধের কি নির্মম আর কদর্য্য ব্যবহার!

সারাজীবন শুনেছি সুসন্তানের কথা। জীবনের এই মুহুর্তে এসে মনে হয়, সু-পিতামাতা হওয়াটাও খুব কঠিন এবং জরুরী। তাই, মা হিসেবে নিজেই নিজেকে প্রতিটি মুহুর্তে কাঠগড়ায় দাঁড় করাই। যেটা করছি, ঠিক করছি তো? উত্তরের জন্য সময়ের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তো আর কোন উপায় নেই। শুধু প্রার্থনা করি সৃষ্টিকর্তার কাছে “তোমার এ পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শক্তি”।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares

লেখাটি ৫,১৭৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.