সড়কে-মহাসড়কে হত্যা, খুন আর কতদিন?

সুপ্রীতি ধর:

আজ সকালে ফেসবুকে চোখ মেলতেই খবরটা পেলাম। সাংবাদিক বড় ভাই সৈয়দ ইশতিয়াক রেজার বাসার গৃহকর্মি রোজিনা আক্তার নামের মিষ্টি, হাসিখুশি মেয়েটা মাঝপথে লড়াইটা থামিয়ে চলে গেছে। সড়কে বাসের চাপায় ওর পা কাটা পড়েছিল। তারপর থেকে চিকিৎসকরা কোনো ত্রুটি করেননি চেষ্টার, কারণ মেয়েটি আমাদের কাছের ছিল। আর দশটা সাধারণ নাগরিকের চেয়ে ওর জন্য আরও অনেকগুলো মানুষ প্রতিনিয়ত লড়াই করেছে, চেষ্টা করেছে ওকে বাঁচিয়ে তুলতে। প্রতিদিন ওর আপডেট পাচ্ছিলাম রেজা ভাইয়ের কাছ থেকে। ইনফেকশন ছড়িয়ে গেছিল। মেডিকেল বোর্ড বসেছিল, একটা ভিডিওতে দেখলাম, ওর কষ্ট হচ্ছে, ব্যথার কথা বলছে।

আমি যখন ভাবছিলাম, এইদেশে চারটা হাত-পা নিয়েই মানুষ কাজ করে খাওয়ার সুযোগ পায় না, সেখানে এই অল্প বয়সেই মেয়েটি একটি পা হারিয়ে কীভাবে বাঁচবে? ওকে তো কাজ করেই খেতে হবে, সেটা কীভাবে সম্ভব হবে? তার ওপর যখন ইনফেকশনের কথা শুনলাম, মনটা অস্থির হলো। দূর থেকে হলেও ওকে অনুভব করলাম আমরা অনেকেই। সেই থেকে রোজিনা নামের মেয়েটি আমাদের সবার মেয়ে হয়ে উঠেছিল। আজ চলে গেল সে পৃথিবীর সব কষ্ট ঘুচিয়ে দিয়ে, একটা ব্যর্থ রাষ্ট্রকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে।

কিছুদিন আগেই আমরা হারিয়েছি রাজীব নামের আরেকটি তরুণ তাজা প্রাণকে। দুই বাসের প্রতিযোগিতায় ও হারিয়েছিল ওর হাত। সেখানেও ইনফেকশন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে দুটো নাবালক ভাইকে পৃথিবীর জঞ্জালে ভাসিয়ে দিয়ে সেও বিদায় নিয়েছে। আমরা তখনও স্তব্ধ হয়েছিলাম। তবে সেটা মুহূর্তের জন্য।

রাজীবের পর এবার রোজিনা নামের মেয়েটিও খুন হলো বাসচালক নামের খুনিদের হাতে। প্রতিদিন যাচ্ছে মানুষ এভাবেই। কেউ একজন ওই নৌ পরিবহন মন্ত্রী ওরফে শ্রমিক নেতা ওরফে গুণ্ডা সর্দার শাহজাহান খানের নামে একটা মামলা করেন না, সেই তো প্রধানতম শত্রু। তার জন্যই সড়ক আজ ঘাতকদের কারখানা হয়ে উঠেছে। ওর বাণিজ্য বন্ধ করেন। বন্ধ না হয় থাকুক কিছুদিন রাস্তাঘাট, তবুও যদি ভবিষ্যত প্রাণগুলো রক্ষা পায়, অসুবিধা তো দেখি না।

একটু পিছনে ফিরি। ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট এই বাসচালকদের হাতেই খুন হয়েছিলেন আমাদের দুই বরেণ্য, বিখ্যাত ভাই তারেক মাসুদ আর মিশুক মুনীর। এখনও দিনটির কথা মনে হলে নিজেরই শরীরের মাংস চিবিয়ে খেতে ইচ্ছা করে। তখন আগুন জ্বলেছিল আমাদের অনেকের শরীরে। সেই আগুনে জন্ম হয়েছিল একটি আন্দোলনের। স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চেয়ে সেই আন্দোলন তখন ছড়িয়ে পড়েছিল দেশ-দেশান্তরে। তখনও কিছু মানুষ সেই আন্দোলনটাকে নিজেদের আত্মস্থ করে নিতে চেয়েছিল, ফলে সেটিও একসময় মুখ থুবড়ে পড়েছিল। কিন্তু যে গণজাগরণ তখন হয়েছিল, আশা ছিল যে লেগে থাকতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কিছুটা হলেও সাফল্য আসতো। কিন্তু হায়! নৌ পরিবহন মন্ত্রী ওরফে গুণ্ডা সর্দার তখনও বিশাল শোডাউন করেছিল রাজধানীতে পাঁচ লাখ শ্রমিকের সমাবেশ ঘটিয়ে। খুনি বাসচালককে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে তারা তখন দেশে দক্ষিণাঞ্চলের ৩০টি জেলা অকেজো করে দিয়েছিল। শক্তি আছে বটে তার!

এমনকি আমাদের খোদ প্রধানমন্ত্রীও তখন সোমবারের মন্ত্রিসভা বৈঠকে পাক্কা তিরিশ মিনিট এই আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছিলেন, তাদেরকে তিনি প্রায় দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে ফেলেছিলেন এই বলে যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচালের জন্যই এই আন্দোলনটা হচ্ছে!

তো, এই হচ্ছে একটা দেশে স্বাভাবিক জনজীবনের দাবিতে করা আন্দোলনের ইতিহাস। তখন সেই আন্দোলনটি করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়েছিল, তা দিয়েই আজ বলতে পারি যে, একটা সাধারণ, স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবিকেও যখন আশপাশের মানুষজনই কটাক্ষ করে, সেখানে রাজনীতির রং লাগায়, তখন সেই দেশে রোজিনা বা রাজীবদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়বে বৈ কমবে না।

আজ সকাল থেকেই বার বার রোজিনার নিষ্পাপ, অপলক চোখে তাকিয়ে থাকা একটা ছবি ভাসছে। পা হারিয়েও তার আশপাশে সত্যিকার মানুষদের উপস্থিতি দেখে তার ঠোঁটের কোণে এক চিমটি হাসি লেগেছিল। হয়তো সে আশায় ছিল, সে সুস্থ হয়ে উঠবে। আবার দেখবে পৃথিবীর আলো, তা সে যতোই কদর্য হোক না কেন, মানুষ তো বাঁচতেই চায় শেষ মুহূর্তেও, রোজিনাও হয়তো বাঁচতে চেয়েছিল, যেমনটি চেয়েছিল রাজীব। এক হাত হারিয়েও সে অপলক চোখে চেয়েছিল হাসপাতালের বিছানায়। কে জানতো, ইনফেকশন তাকে শেষ করে দেবে!

ডাক্তারি শাস্ত্র আমার পড়া নেই। কিন্তু রাজীব এবং রোজিনা, দুজনের ক্ষেত্রেই দেখলাম হাত এবং পা কেটে ফেলার পর ইনফেকশন ছড়িয়ে যেতে। এটাকে রোধ করা যেতো কীনা, কে জানে! তবে আমাদের বার্ন ইউনিট আর ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকদের ওপর আমার বরাবরই আস্থা ছিল, এখনও আছে। কাজেই আশা করি, তারা কোথাও কোনো ত্রুটি রাখেননি।

ত্রুটিটা কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রেই। উন্নয়নের পরাকাষ্ঠায় আমার জানই যদি না থাকে, তবে সেই উন্নয়ন দিয়ে আমি কী করবো? কুইনাইন জ্বর সারায়, কিন্তু কুইনাইন সারাবে কে? ছোটবেলায় পড়া সেই বাক্যটি আজ এমন করুণ হয়ে উঠবে আমাদের অনেকের জীবনে, কে জানতো! সময় থাকতে এখনও এই খুনগুলো এড়ানোর উপায় বের করুন, প্রয়োজনে প্রতিবাদ করুন, আন্দোলন করুন। আজ যারা গাড়িতে চড়া মানুষজন ভাবছেন, আমরা তো রাস্তা পার হই না, বা বাসে চড়ি না। হাজার হাজার উদাহরণ কিন্তু আছে, নিজের গাড়িতেই এমনিভাবে বাস বা ট্রাক চালকদের হাতে খুন হওয়ার।

নি:শ্বাস নেবার আগে ভাবুন, আবার ভাবুন। সমবেদনা রাজীব এবং রোজিনাসহ হাজার হাজার হারিয়ে যাওয়া ভাইবোন, সন্তানদের পরিবারের প্রতি।

শেয়ার করুন:
  • 48
  •  
  •  
  •  
  •  
    48
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.