মেয়েদের যখন “বিবাহিত চেহারা” থাকতেই হয়

সাদিয়া রহমান:

মেয়েদেরকে একটা কথা প্রায়ই শুনতে হয়, “তোমাকে দেখে মনে হয় না তুমি বিবাহিত”। এই ‘দেখতে বিবাহিত’ জিনিসটা আসলে কী? মানুষের কি চেহারা “বিবাহিত” হয়?

একটা মেয়ের জন্য শুধু বিয়েটা যথেষ্ট না, তার বিবাহিত চেহারা থাকাটাও জরুরি এই সমাজে। কোনো ছেলেকে মনে হয় না কখনো বিবাহিত চেহারা রাখার কথা বলা হয়েছে। এমনকি বিধবা নারীকেও অনেকক্ষেত্রে দেখে বোঝা যায়, কিন্তু বিপত্নীক পুরুষকে আপনি চিনবেন কীভাবে?
এমন নিয়ম কেনো? যেসব মেয়েরা “বিবাহিত চেহারা”র অধিকারি, সম্পর্কের ক্ষেত্রে কি শুধু তারাই সৎ হয়? তাহলে কেনো মেয়েদের বিয়ের পর মোহরকৃত হয়ে যাওয়ার মতন “বিবাহিত চেহারা” বানিয়ে ঘুরতে হবে।
এসব প্রশ্নের উত্তর কেউ কখনো দিতে পারেনি।

বিয়ের সময় মেয়েরা সাধারনভাবে লাল পোশাক পরে। মানুষভেদে সেই রঙ গোলাপি ,কমলাও হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বউ এর পোশাক গাড় রঙের হয় যেটা তার বিবাহিত অবস্থা জানান দেয়। উত্তর ভারতের দিকে মেয়েরা এক ধরনের গাঢ় রঙের চুড়ি পরে, যেগুলো কে “চুড়” বলা হয়ে থাকে। এই চুড় তাকে সাধারণত বিয়ের পরেও নির্দিষ্ট সময় নিম্নে প্রায় এগারো দিন পর্যন্ত পরে থাকতে হয়। অনেকে প্রায় একবছর পর্যন্ত হাতে ভারী চুড় পরে থাকেন। একজন বিবাহিত নতুন বউ এর পরনে থাকে কপালের টিকা, কোমরবন্ধ। কানে ভারি দুল, পায়ে ঝলমলে নূপুর, আর হাতে পায়ের বাকি অংশ ভরে থাকে গাড় লাল রঙের মেহেদীতে। বিয়ের পরে বেশ কিছুদিন এই সাজের বহর বহন করা আবশ্যিক। তার নিজস্ব স্বস্তি এইখানে কোনো বিষয় না, বরং সামাজিক কর্তব্যটাই মুখ্য। অথচ একটা ছেলেকে এতোসব খেয়াল করতে হয় না। বিয়ের ঠিক পরের দিনই তিনি আবার আগের হাফপ্যান্ট পরে বিন্দাস ঘুরতে পারেন। আর কোনো পোশাক পরে তাকে বিবাহিত দেখাতে হবে, এমন রীতিও কখনো শোনা যায়নি।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় এসব পোশাক বর্জন করাটা হয়ে উঠে বিশাল এক বিদ্রোহের প্রতীক। সবাই এমনভাবে উপদেশ দিতে থাকে, আর বলতে থাকে “কিছু পরোনি কেনো?” যে এক পর্যায়ে মনে হয় যেনো সে রাস্তায় নগ্ন হয়ে হাঁটছিলো।এমন ছোটো খাটো বিদ্রোহী মেয়েদের প্রতি সবার অভিযোগ থাকে যে তাকে বিবাহিত দেখায় না। এই অভিযোগ এমন পর্যায়ে চলে যায়, এক পর্যায়ে মনে হতে থাকে এই “না দেখানো”টা যেনো বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য প্রণোদিত। অথচ কোনো স্বামীকে কখনো কেউ এই একই উপদেশ দিয়েছে কিনা তা জানা যায়নি। বিবাহিত না দেখালে কি স্বামীর প্রতি ভালোবাসা কমে যায়? নাকি তার সাথে সততা ভালোবাসার আদৌ কোনো সম্পর্ক আছে?

বিয়ের পর যেকোনো আচার অনুষ্ঠানেও আশা করা হয়ে থাকে মেয়েরা ভারী পোশাক ও ভারী গহনা পরবে। এটাই নিয়ম, এটাই যুগে যুগে হয়ে আসছে। কেউ এর ব্যতিক্রম করলে “কুল সমাজ” বাহবা দিতে চলে আসে যে বহু বছরের রেওয়াজ ভেঙে কত “কুল” হওয়া যাচ্ছে তা জানাতে। অথচ কেউ একবারও ভাবে না হয়তো এই কাজটি রেওয়াজ ভাঙ্গার জন্য না, নিতান্তই নিজের স্বস্তির জন্য করা হচ্ছে। পোশাক একটা অত্যন্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, যা জড়িয়ে থাকে নিজের স্বস্তি এবং সুবিধার সাথে। তাই সেটা মাথায় রেখে পোশাক নির্বাচন করা কেবলই একটি মতের প্রকাশ, বিদ্রোহ সেটা হতে পারে না।

মেয়েদের কাছ থেকে সমাজ আশা করে তারা তাদের স্বামীর চলমান, দৃশ্যমান সম্পত্তি হিসেবে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবে, সমাজে চলবে। এমনভাবে পোশাক পরবে যেন মানুষ তার স্বামীকে নিয়ে কোনো কথা বলতে না পারে। কিন্তু মানুষ ভুলে যায় মেয়েদের নিজস্ব পছন্দ, নিজস্ব মতামত বা নিজস্ব স্বস্তির জায়গা থাকতে পারে। বিয়ের পর যেটা বিসর্জন দেয়া জরুরি না এবং স্বাভাবিকও না। সে “অবিবাহিত দেখাতে” চায় না সে কেবল নিজস্ব স্বস্তি চায়। স্বামী মানুষটার যদি কোনো সীমারেখা না থাকে, তার থেকে যদি কোনো আশা না থাকে বিবাহিত দেখাবার, তাহলে বউটির থেকে এই আশা কেনো?

বিবাহিত চেহারা বানানো জরুরি কি শুধু এইজন্য যাতে রাস্তার অন্য ভায়েরা বুঝতে পারেন যে আমি ইতিঃমধ্যেই অন্যের সম্পত্তি, তাই আমার গায়ে হাত দেয়া যাবে না!

শেয়ার করুন:
  • 2.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.8K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.