রাজীবের খুনিদের বিচার চাই

0

সালমা লুনা:

আজকাল কিছু লিখতে ইচ্ছা করে না। লিখে কী হয় এই ভাবনাটা নিজের তো ছিলোই। পরিবারের লোকজনও বলে, কী কী সব লিখছো। ভয়ডর নাই?

পরিচিতরা বলেন, সাবধানে লিখ। কী দরকার লেখার। শুভাকাঙ্খিরা বলেন, গদ্য পদ্য লিখ। ওইটা তাও একটা কাজ। হাবিজাবি লিখে কী হবে? তোমার কথা কেউ শুনবে?

আমি হতাশায় তো ছিলামই, আরো কুঁকড়ে যাই।

ছিঃ! তাইতো, আমি কে? কত জ্ঞানীগুণীজন আছেন, কত বিখ্যাত মানুষজন। কবি সাহিত্যিক পত্রপত্রিকা মিডিয়া রাজনীতি করা মানুষজন, তারা লিখলে তবু মানুষ জানবে, পড়বে, মনে নেবে । কোথাও একটু হলেও ঢেউ উঠবে।

আমার সেই ক্ষমতা কোথায়?

তবু লিখছি।

সকালে রাজীবের মৃত্যু সংবাদটা জেনে মন খারাপ হলো। লিখলাম।
একটু পরেই মেসেঞ্জারে দুটা ছবি পেলাম। এক ছোটভাই দিয়েছেন। তারও নাম রাজিব।
হতভাগ্য রাজীব ছিলো উনার সহকর্মী। তারা একটি হসপিটালে কাজ করতেন। রাজীব ছিলেন কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে।
ভাই রাজিব দুটি ছবি দিয়ে লিখলেন , ‘আপা কিছু লিখুন। এমন পরিশ্রমী হাসিখুশি ছেলেটিকে এভাবে মেরে ফেললো সহ্য করতে পারছি না।’
হায়! আমি যে একজন পরিশ্রমী কর্মক্ষম রাজীবের গোটা জীবনের সংগ্রামী পথচলার গল্পটা লিখবো, আমার সে ক্ষমতা কোথায়!

রাজীব বাবামাহারা খুব কষ্ট করে জীবনের পথে চলতে থাকা একটি ছেলে ছিলো। সদা হাস্যমুখ। তার দুটি ভাইও আছে। তাদের নাকি খুব আশা ছিলো রাজীব একদিন বড় চাকরি করবে তারপর তাদের নিয়ে একসাথে থাকবে।

রাজীব দুর্ঘটনায় মারা যায়নি।

কেননা রাজীব বেপরোয়া রাস্তা পার হতে গিয়ে বা দৌড়ে চলন্ত বাসে উঠতে গিয়ে প্রাণ হারায়নি। সে ফুটপাথ ছেড়ে মধ্য রাস্তা দিয়ে মোবাইল ফোন কানে নিয়ে বা ইয়ারফোন গুঁজে গান শুনতে শুনতে হাঁটতে গিয়ে নিরুপায় বাসচালকের স্টিয়ারিংএর চক্করে পড়েনি। অথবা নিয়তির পরিহাসে চলন্ত বাসগুলি নিয়ন্ত্রণহারা হয়ে কোন পথের পাশের চা দোকানে ঢুকে পড়ে চা পানরত রাজীবকে অনিচ্ছাকৃত মেরে ফেলেনি।

রাজীবকে খুন করা হয়েছে।

রাজীব দুটা ঠাণ্ডা মাথার খুনীর নৃশংস আনন্দের শিকার হয়েছে। সে আমাদেরই কারো ছেলে বা ভাই হতে পারতো।

এবং এই খুনিদের মদদদাতা ও পৃষ্ঠপোষক আর কেউ না, স্বয়ং রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশ, যারা তাদের দ্বায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেনি। ফলে একটি অরাজক অবস্থা তৈরি হয়েছে।

দেশে অরাজক অবস্থা চলছে বলেই রাজপথে দুটা বাসের ড্রাইভার এমন নৃশংস আচরণ করতে পারে। তারমধ্যে একটি আবার সরকারি পরিবহণ সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত।

সেই কবে মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘ছাগল চিনলেই ড্রাইভার’ সেসব আমরা ভুলে গেছি। সড়কে যেসব গাড়ি চলে তাদের ড্রাইভাররা কতটুকু দক্ষ তা উনারা দেখেন না, আমরাও জানার প্রয়োজন বোধ করি না।
রাজীবরা তাদের কর্মক্ষম হাত হারিয়ে বেঁচে থাকতে আদৌ চায় কীনা তা নিয়ে আমাদের ভাববার দরকার থাক বা না থাক।

আমরা কি এই রাষ্ট্রের কাছে অন্তত খুনের বিচারটা চাইতে পারি? এইসব মস্তিষ্ক বিকৃত ঠাণ্ডামাথার খুনিদের বিচার চাওয়ার অধিকারটুকুই না হয় আমরা চাইলাম হে মাননীয়রা।

আমাদের সেই ভিক্ষে চাওয়া অধিকার থেকেই আমরা রাজীবের খুনিদের বিচার চাই।

আমরা দুই বাসের কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে রাজীবের দুটি ভাইয়ের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাই।

ততক্ষণ আপনারা না হয় হাসিখুশি রাজীব আর আপনাদেরই পরোক্ষ কৃতকর্মে সৃষ্ট রাজীবের পরিস্থিতির চিত্র দুটি দেখতে থাকুন।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 101
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    101
    Shares

লেখাটি ২০৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.