কোটামুক্ত মেধাবীরা এগিয়ে নেবে দেশকে – এই প্রত্যাশা

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

কোটা ব্যবস্থার সংস্কার সময়ের দাবি। তাই পূর্ণ সমর্থন ছিল একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ, যৌক্তিক সমাধানের মধ্যে দিয়ে দাবি আদায়ের প্রতি।
মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরাসহ দেশের বেশিরভাগ (সচেতন) মানুষই কোটা সংস্কারের পক্ষে বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়েছে। কিন্তু বিস্মিত হলাম, যখন দেখলাম মুক্তিযোদ্ধা, তাঁদের সন্তান, নাতিপুতি কেউ বাদ যাচ্ছে না আক্রোশের হাত থেকে, রোষানল থেকে!

অসম্মান, অশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা প্রকাশ পায় – এমন অসংখ্য ট্রল চোখে পড়লো। আন্দোলনের ভাষা এবং প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্বন্ধে মনে প্রশ্ন জাগে, যখন দেখি কোটা সংস্কারের আন্দোলনের নামে ” মুক্তিযোদ্ধা কোটা ” নিয়েই সবচেয়ে বেশি গাত্রদাহ।

এখানে কোথাও যেন বড্ড ভুল হয়ে যাচ্ছে হিসেবে। আমরা ভুলে যাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিস্কুট দৌড় প্রতিযোগিতা ছিল না, যার লোভে মুক্তিযোদ্ধারা মরিয়া হয়েছিলেন মরণপণ লড়াইয়ে শামিল হতে।
পরিবার, নিরাপত্তা, সম্পর্কের বন্ধন সর্বোপরি নিজের জীবন তুচ্ছ করে যাঁরা দেশ স্বাধীন করেছিলেন – তাঁদের সামনে সেদিন কোনো কোটা বা সরকারী চাকরীর প্রলোভন ছিল না। প্রবল দেশপ্রেম আর বুকের রক্ত ঢেলে একটি স্বাধীন দেশের পতাকা তুলে দিয়েছিলেন তাঁরা আমাদের হাতে, যে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আজ প্রশ্ন ছোঁড়া হচ্ছে – ” মুক্তিযোদ্ধারা আর কত সুবিধা পাবে? ”
একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ক্ষতবিক্ষত ইতিহাস, প্রতিদিনের জীবন সংগ্রাম, মানবেতর জীবনযাপন সম্বন্ধে কতটুকু জানি আমরা? যুদ্ধবিধ্বস্ত এসব পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়া কতখানি বিপন্নতার মধ্যে থেকে চালিয়ে যেতে হয়েছে, কতটুকু খবর রাখি আমরা?

আর যাঁরা বীরাঙ্গনা বলে পরিবারে, সমাজে স্বীকৃতি পাননি, পরিবার থেকে অধিকার – সম্পত্তি বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁরা? আবার যাঁরা বহু কাঠখড় পুড়িয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন – তাঁদেরকেও তো “এলিট শ্রেণির মুক্তিযোদ্ধা ” বলে উপহাস করতে ছাড়িনি আমরা!

একুশ বছর তো কেটে গেছে ইতিহাস বিকৃতকারীদের চক্করেই। স্পর্ধার সাথে জাতীয় পতাকা উড়েছে যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারদের গাড়িতে। শহীদ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। খোলা আকাশের নীচে রাত কাটিয়েছে দেশের সূর্যসন্তানদের পরিবার।
অথচ গোলাম আযম, মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর মতো কুখ্যাত রাজাকারদের সন্তানেরা টাকার পাহাড় গড়ে, দাপটের সাথে “বিগ শট” হয়ে ঘুরে বেড়ায় এই বাংলাদেশে!

একটি প্রশ্ন রেখে যাই, কবে, কোনদিন, কয়টি মুক্তিযোদ্ধা/শহীদ পরিবার রাস্তায় নেমেছে তাঁদের সুযোগসুবিধা আদায়ের দাবীতে?
নাকি তাঁরা সবাই সর্বোচ্চ সুবিধাপ্রাপ্ত, তাই দরকার হয়নি কিছু চাওয়ার!

আমার বিশ্বাস , সাধারণ ছাত্রদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল অহিংস আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ন্যায্য দাবি আদায় করা। কিন্তু সন্তর্পণে ওঁৎ পেতে ছিল পুরনো শকুন। রাতের অন্ধকারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ভিসির বাসভবনে অগ্নিসংযোগ, লুটপাটের যে তাণ্ডবলীলা চালানো হলো, তা থেকে আন্দোলনে তৃতীয়পক্ষের অনুপ্রবেশ স্পষ্ট হয়। সেই যে, আলুর গুদামে লাগলো আগুন। এই সুযোগে দেদারসে আলুপোড়া খাওয়ার লোকের অভাব হলো না।

এক আন্দোলনে এতো বিচিত্র পক্ষ-বিপক্ষ আগে দেখিনি। কে সাধারণ ছাত্র আর কে যে অসাধারণ (!), গোলমাল হয়ে যাচ্ছিলো!
দেখলাম পুলিশী হামলা, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্য, “জয় বাংলা”র অপব্যবহার, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, রক্তপাত – শেষমেশ আন্দোলন আর যাই হোক অহিংস থাকেনি। সেই সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে ছড়ানো গুজব পাল্টা গুজব বারবার বিভ্রান্ত করেছে, আতঙ্ক ছড়িয়েছে জননে।

তারুণ্য একটি দেশের অহংকার।
এবারে অন্যকে মেধাহীন ভাবা অহংকারী, মেধাবী তারুণ্য দেখলাম। কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবিতে তারুণ্যের বাঁধভাঙা জোয়ারকে স্বাগত জানাই। সেই সাথে প্রজন্মের দাম্ভিকতা আমাকে লজ্জিত করে।
কোটা সংস্কারের আন্দোলনকে কেউ কেউ “ভাষা আন্দোলন” আর “মুক্তিযুদ্ধের” সাথে তুলনা করে বসলেন। দুঃখিত, বলতে বাধ্য হচ্ছি,

পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে গেলেই কেউ ভাষা সৈনিক বা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যায় না। মাতৃভাষা ও স্বাধীন দেশের জন্য যে লড়াই তার সাথে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের তুলনা কীভাবে হয় তা আমার মতো একজন মেধাহীনের বোধগম্য হয় না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সাধুবাদ আপনাকে।
সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে আপনি মুক্তিযোদ্ধাদেরকে “কোটা-ভিক্ষুক” অপবাদ থেকে রক্ষা করলেন।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 360
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    360
    Shares

লেখাটি ৫৫৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.