রুনি-সাগর ও নাদিয়ার পাশে কেউ নেই

sagar-runi-nadia
ছবিতে বাঁ থেকে যথাক্রমে সাগর, রুনি ও নাদিয়া

সুমন্দভাষিণী: সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনির সাংবাদিক পেটানো, তারপর সাংবাদিকদের বিক্ষোভ এবং পরে রনিকে গ্রেপ্তার, এসবই আরও দুটি ঘটনাকে আমরা যারা সাংবাদিকতা করি, তাদের সামনে নিয়ে এসেছে। তাহলো রুনি-সাগর হত্যাকাণ্ড এবং নাদিয়া শারমিনকে হেফাজতিদের ধাওয়া এবং মারধর। বার বার মনে হচ্ছে, নিজের বাসায় খুন হয়ে গেল জলজ্যান্ত দুটি মানুষ, অথচ খুনির কোন হদিসই আমরা পেলাম না।

তত্কালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়ার ৪৮ ঘন্টার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি কতকিছুই তো হলো, কিন্তু কোন কুলকিনারা কেউই করতে পারলো না, না র‍্যাব, না পুলিশ, না গোয়েন্দা সংস্থা। খুনিরা একেবারেই লাপাত্তা। মাঝে মাঝে মনে হয়, ওরা মনে হয় ভিনগ্রহের বাসিন্দা, খুন করে আবার নিজ গ্রহে পাড়ি জমিয়েছে। আমার তো মনে হয়, রুনি-সাগরের হত্যাকাণ্ডে শুধুমাত্র সাংবাদিক সমাজই নয়, সারাদেশের মানুষ অবাক হয়েছিল। সবাই বিক্ষুব্ধ ছিল ছোট্ট মেঘকে দেখে। ওর জন্য চোখের জল ফেলেনি এমন মানুষ পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। আর আমরা যারা ওদের কাছের মানুষ ছিলাম, সহকর্মী-বন্ধু ছিলাম, রাতের পর রাত আমরা নির্ঘুম কাটিয়েছি। এখনও অনেকে বিশ্বাস করতে পারি না যে ওরা নেই।

আজ ৩০ জুলাই, মাছরাঙা টেলিভিশনের বর্ষপুর্তি। আমি নিশ্চিত, আজ অনেকেই গোপনে চোখের জল মুছবে সাগর সরওয়ারের কথা ভেবে, ওর চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে অনেকেই দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। আর রুনিও আমাদের সবার স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বলে। ও এমনই একজন, যাকে ভুলে থাকা যায় না। কালও আমি ওর ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে ছবিগুলো দেখছিলাম, আর বুকের ভেতরটা চিন চিন করে উঠছিল।

দ্বিতীয় যে ঘটনাটি সামনে এসেছে তা নাদিয়া শারমিনের। সাতদিনের মধ্যে সাংসদ রনিকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রায় চার মাসেও কোনো বিচার না পেয়ে সাংবাদিক নাদিয়া শারমিন ডয়চে ভেলেকে এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, “সামনে সাংবাদিকদের আরও বেশি দুর্দিন আসছে৷” গত ৬ এপ্রিল হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সবার চোখের সামনে হামলার শিকার হতে হয়েছিল নাদিয়া শারমিনকে৷ গোলাম মাওলা রনির সাংবাদিককে লাথি মারার দৃশ্যের মতো নাদিয়াকে হেফাজত কর্মীদের ধাওয়া করে মারার দৃশ্যও দেখানো হয়েছিল দেশের প্রায় সব টিভি চ্যানেলে৷ তাৎক্ষণিকভাবে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছিলেন অনেকেই৷ শারমিন আহত হওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে করা মামলার মতো রনির বিরুদ্ধে মামলাটিও হয়েছিল শাহবাগ থানায়৷ কিন্তু দুটি মামলার অবস্থা দুরকম৷ শুধু নারী হওয়ার ‘অপরাধে` হামলার শিকার হওয়া নাদিয়া শারমিন ডয়চে ভেলেকে দেয়া এ সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এতদিনে আসামীদের ধরার কোনো উদ্যোগই নেয়নি শাহবাগ থানা৷ (তথ্যসূত্র: নতুনদেশ)

নাদিয়া শারমিনের বেলায় কেবল সাংবাদিক মহলই নয়, পুলিশ নীরব৷ অথচ ক`দিন আগেও আরেকটা অস্ত্রোপচার হয়েছে পায়ে, লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ায় এই অপারেশন। সেইথেকে বাসাতেই আছেন নাদিয়া, এখনও ভালভাবে হাঁটতে পারেন না। কথা বলতে চাইলে একরাশ হতাশা ঝরে পড়ে। যতদূর জানি, একুশে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষও তার প্রতি সদয় থাকেনি। এপ্রিল থেকে জুলাই মাসের বেতন তিনি পাননি, চিকিত্সা খরচ দেওয়া দূরে থাক। উপরন্তু তাকে হেফাজতের সমাবেশ কভার করতে যাওয়ায় টিভি কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শাও নোটিশ দিয়েছে। ভাবখানা এমন যেন সে নিজে নিজেই অ্যাসাইনমেন্ট কভার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল!

আমরা যারা সাংবাদিকতায় আছি, খুব ভাল করে জানি এবং এটা নিয়মও যে, চিফ রিপোর্টার প্রতিদিনের অ্যাসাইনমেন্ট দেন। আমাদের চয়েজ থাকতেই পারে, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত ওই কর্তাব্যক্তিরই। নাদিয়া জানিয়েছে, এটা শুধু তার অ্যাসাইনমেন্টই ছিল না, এটা ছিল বদলি অ্যাসাইনমেন্ট। অন্য একজনের অ্যাসাইনমেন্ট তাকে করতে দেওয়া হয়েছিল। এই যদি হয় তাহলে তো কারণ দর্শানোরই কোন কারণ দেখছি না। নাদিয়াকে মানসিক নিপীড়ন করাই যদি হয় এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য, তাহলে প্রশ্ন, কেন? কাকে খুশি করতে একুশে টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ এই জঘণ্য কাজটি করছে?

সম্প্রতি (২৮ জুলাই) হাইকোর্ট নাদিয়া শারমিনের ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছে। সেইসাথে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি আহত নাদিয়াকে কোন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি এবং সরকারি খরচে কেবিনে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেও বলা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। সাংবাদিক নাদিয়া শারমিনের ওপর হামলাকারীদের দ্রুত খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না- তা জানতে চেয়ে একটি রুলও জারি করেছে হাইকোর্ট। খুবই ভাল উদ্যোগ হাইকোর্টের তরফ থেকে। এখন সেই আদেশ-নির্দেশ কতখানি পালন হবে, সেটা সময়ই বলে দেবে।

গত ৯ এপ্রিল হামলার শিকার হওয়ার পর চিকিৎসারত অবস্থায় দেয়া সাক্ষাৎকারে ডয়চে ভেলেকে খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে নাদিয়া জানিয়েছিলেন, সেরে ওঠার পর হেফাজতে ইসলাম কোনো সমাবেশ করলে আবার তিনি সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে সেখানে যাবেন, ভয়ে দূরে থাকবেন না৷ কতটা সাহস ছিল সেদিনকার নাদিয়ার। কিন্তু আজ? গত তিন মাসে সে সরকার, প্রতিষ্ঠান এবং সহকর্মীদের যে কুৎসিত পরিচয়টা পেয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সেই সাহসের পরিচয় কবে দেবে, সেটাও সময় বলে দেবে। এদেশের পুরুষতান্ত্রিক মিডিয়া হাউসগুলোও যে নাদিয়াকে খুব ভালো চোখে গ্রহণ করবে না তা বলা বাহুল্য। হেফাজতে ইসলামীর দুটি কর্মসূচিতে সারা দেশে ৫০ জনের মতো সাংবাদিককে মারধর করা হয়েছিল, এ তথ্য জানিয়ে নাদিয়া ডয়চে ভেলে বললেন, ‘‘সামনে সাংবাদিকদের আরো বেশি দুর্দিন আসছে৷ (হেফাজতের) সামনের কর্মসূচিগুলোতে আরো অনেক সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হবে৷“ তাই সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ থেকে শুরু করে দেশের প্রধান দুই দলের নেত্রীকেও দেশের স্বার্থেই হামলার শিকার সব সংবাদকর্মীর পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি৷

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.