ধর্ষণ পুরুষের পেশী ও ‘যৌন দণ্ডের’ শক্তি প্রদর্শন!

0

শেখ তাসলিমা মুন:

যৌন আকাঙ্খা কেবল পুরুষের নয়, নারীরও এ আকাঙ্খা তীব্র। কিন্তু কেন পুরুষের ধর্ষণেরই শিকার হয় নারী ও শিশু তার কারণ নির্ণয় এবং কারণগুলোর গোঁড়ায় পৌঁছুতে হবে! বিশ্লেষণ করতে হবে। সমাধানের পথ নইলে সহজ হবে না।

সেক্সুয়াল ডিজায়ার একটি মনোরম আকাঙ্খা। সেক্সুয়াল আকাঙ্খা যখন লালসা এবং সহিংস আগ্রাসনে পরিণত হয়, তখন শিকার হয় নারী ও শিশু (নারী বা পুরুষ উভয় শিশু)! এর পেছনের কারণ পুরুষতন্ত্র। শক্তি ও আগ্রাসন!

পুরুষতন্ত্র এমনভাবে আমাদের সমাজে, রাষ্ট্রে, মোল্লাতন্ত্রের, ধর্মে আসন গেঁড়ে বসে আছে যে পুরুষ, পুরুষাঙ্গ আর পুরুষতন্ত্র সমার্থক। এর গোঁড়ার খবর ‘পাওয়ার’ বা ক্ষমতা। প্রত্যেক আগ্রাসনের গোঁড়ার কারণ এই ‘পাওয়ার’। শক্তির খেলার গোঁড়ায় গেলে আমরা দেখতে পাবো ‘পুরুষ’। ভৌগলিক বা ধর্মীয় ইনভেশনের নেচারে প্রকটভাবে শক্তির খেলা দেখা যায়। একেকটি এলাকা তারা জয় করে সেখানকার নারীদের তারা দখল করেছে। নারী ও ভূমি তাদের জন্য সকল সময়ই দখলের। এ মানসিকতা অনেক পুরনো। মূলত সে মনোভাব থেকে সমাজ, রাষ্ট্র, আইন বা ধর্ম আজও মুক্ত তো নয়ই, বরং আজও এ বিষয়ে পৃথিবী প্রিমিটিভ।

পুরুষ যা কিছু চায় তারা শক্তিবলে পেতে সবচাইতে পছন্দ করে। শক্তি ও পুরুষের ভেতর মূলত কোন পার্থক্য নেই। আমাদের ধর্ম ও সমাজ একজন পুরুষকে তৈরি করে সেভাবে। তারা পুরুষদের শিক্ষাই দেয় এভাবে, ‘ যাও, পৃথিবীতে তোমার পাওনা ‘পুরুষালি’ভাবে জয় করে আনো!’ এই ‘পুরুষালি’ ক্ষমতার বিপরীতে কোনো পুরুষকে পুরুষ হিসেবে গণ্য করা হয়না। সেটা পুরুষ সমাজে তাদেরকে অযোগ্য করে গড়ে তোলে।

একজন পুরুষ তার জীবদ্দশায় কোন অর্থেই ‘না’ শব্দটির কাছে মাথা নোয়ায় না। তারা ‘না’ কে ‘হ্যাঁ’ করার প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত। এটি পুরুষের পৌরুষ গরিমা। এক উগ্র অ্যারোগ্যান্স যা কেবল একজন পুরুষই কেবল পজেজ করে। এ ডিজাইন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে।

নারী পুরুষের কাছে সব সময় শিকার। খেলাটি শিকার ও শিকারির। শিকারি তার শিকারের উপর থাবা ফেলবে। এটা পুরুষের এক আদিম বিকৃত আনন্দ, যা সর্বস্তরে বিদ্যমান।
নারীকেও শিক্ষা দেওয়া হয়, সে পুরুষের কাছে ক্ষমতাহীন। একটি সাধারণ প্রেমের ধরনেও দেখা যাবে একজন পুরুষ ‘প্রেম শিকার’ করে। তার জন্য প্রেম নয়, তার ‘জয়ী’ হবার মানসিকটাই মুখ্য থাকে। একজন পুরুষ ঘটা করে প্রেম নিবেদন করবে। মেয়েটি ‘না’ বললে তাকে ‘হ্যাঁ’ এ পরিণত করার মাঝেই থাকে তার সকল সফলতা। সে একবারও ভাববে না, মেয়েটি আমার প্রেমে পড়েছে কিনা! মেয়েটি তাকে ভালবাসে কিনা!
প্রেমে সে মেয়েটিকে একটি প্রদর্শনীর বিষয় করবে। ঘুরবে সাথে নিয়ে তার সম্পত্তি নিয়ে ঘোরার মতো। রেস্টুরেন্টে ছেলেটি বিল দেবে। দোকানে গেলে ছেলেটি বিল দেবে। এ মালিকানা সে পেয়ে যায় কিশোর বয়স থেকে।
একটি মেয়ে একটি ছেলের সাথে নির্জন হওয়া মাত্র তারা মনে করে সে তার শরীরের উপর অধিকার দিয়ে দিয়েছে। এ মনোভাব সামাজিকভাবেই রোপণ করা হয়। এখানে মেয়েটির ‘না’ একটি অবান্তর প্রসঙ্গ মাত্র।

যেখানে স্বাভাবিক প্রেমাচরণেই এটা, ছেলেটিকে অখুশি না করার সাহস মেয়েটির হয় না, আর অপরাধ জগতে নারীকে কীভাবে দেখা হয়, সেটি ভাবতে তো গা শিউরে ওঠে।
‘নারীর শরীর আকর্ষণীয়’ তাই পুরুষেরা আকৃষ্ট হয়, এ নিয়ে যত কথাই বলা হোক না কেন বিষয়টি সেটি নয়। নারীকে তারা আকর্ষণীয় বলে চড়াও হয় না। নারীকে তারা শক্তিহীন মনে করে বলেই আক্রমণ করে। তার সাথে যুক্ত হয় পৃথিবীর সকল বিষয় তাকে জোর করে দখল করতে হবে, শক্তিবলে এ শিক্ষা। এ কারণেই সে যা চায়, তা সে শক্তি প্রয়োগ করেই পেতে চায়।

নারীর শরীর কোনদিনই নারীর নিজের হয়ে উঠতে পারেনি। নারীর শরীর পুরুষের বারোয়ারী সম্পত্তি বলেই গণ্য হয়ে আসছে। সে নারী ঘরে থাকুক, বারান্দায় থাকুক, রান্না ঘরে থাকুক, টাট্টি খানায় থাকুক, রাস্তায় থাকুক, বাসে থাকুক, ট্রেনে থাকুক, অফিসে থাকুক, সেগুলোতে পুরুষের হাত পড়বে এটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়েছে।

আর যে কারণে শিশুকাল থেকে তার বাবা-মা মেয়ে শিশুটিকে ঢেকে থাকার প্রশিক্ষণ দিলেও, ছেলে শিশুটিকে একটি শব্দও শিক্ষা দেওয়া হয় না যে নারী এবং বালিকার শরীরে হাত বাড়ানো অন্যায়। আইনগতভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নারী শিশুকে যেভাবে গড়ে তোলা হয়, সেখানে পুরুষের এ অপরাধে তাদের অধিকার স্বীকার করে নেওয়া হয় এবং তাকে সিদ্ধ করার মেসেজই সুস্পষ্ট থাকে।

একটি জনপ্রিয় বহুল কথিত কথা, ‘সে পুরুষ ছেলে এক ঘা খাইতে পারে, এক ঘা মারতে পারে, তুমি মেয়ে তুমি তা পারো না।’ নারীর সতীত্ব গেলে পাওয়া যাবে না, কিন্তু পুরুষ ছেলের ‘দশ ঘর মারলে’ও কিছু আসে যায় না। এ সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষা এবং পরে আইন থেকে মওকুফ পাওয়ার সংস্কৃতি পুরুষকে অধিকার দেয় নারীর দেহে আক্রমণ করার।

পুরুষের শক্তি তার পেনিসে যা পুরুষতন্ত্রের পুঁজি। তাকে ঘিরেই তাদের জয়ের আনন্দ। আর এ ডিজাইনেই চলছে প্রেম পীরিতি, বিয়ে, ঘর সংসার, ছেলেমেয়ে ফুটানো! আর পুরুষের অপরাধ জগত? হায়, সে কথা তো এখন এ মুহূর্তে আর বলার কিছু নেই! প্রতিদিনের মহামারী!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 145
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    145
    Shares

লেখাটি ৭০৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.