নিজের মেয়ের জন্য হলেও কণ্ঠে আওয়াজ তুলুন

0

সুদীপ্তা ভট্টাচার্য্য রুমকি:

আমার শুধু ঘৃণা লাগে, দম বন্ধ লাগে, গা গুলিয়ে বমি আসে। মনে হয় বীভৎস একটা সমাজে বাস করি। যেখানে এখনও সভ্যতার ছোঁয়া বোধ হয় লাগেনি। মানুষ সেই আদিম, বর্বরতাকে বুকে ধারণ করে আছে। স্বাভাবিক ভাবছে অস্বাভাবিক বিষয়গুলোকে। তবে আমি কেন পারি না? আমার কেন সদ্যোজাত কোনো কন্যা শিশুকে কোলে নিলেও বুক কেঁপে উঠে? আমি কেন অনেক বড় হও এই আশীর্বাদ করেই ক্ষ্যান্ত দিতে পারি না? আমার কেন মনে হয় মেয়েটি যেন নিরাপদ মৃত্যুর অধিকারী হয়! তার সুস্থ-সবল জীবন যেন যে কারো কারণে বাধাগ্রস্ত না হয়! তার অস্তিত্ব যেন মানুষের মর্যাদা পায়! অমানবিকতার রাজসাক্ষী যেন তাকে হতে না হয়!

আমার ক্লান্ত লাগে হিংস্রতার নিরব দর্শক হিসাবে আপনাদের দেখে। সবকিছুর প্রতি আপনারা কেন এতোটাই নির্বিকার, এতোই নির্লিপ্ত, যেন কোনকিছুই আপনাদের স্পর্শ করে না। কোনকিছুই আপনাদের মনকে নাড়া দেয় না। জড়বুদ্ধিসম্পন্ন যেন সবাই হয়ে গেছে। নিজের মেয়েকে জন্মের দিন থেকে আজ পর্যন্ত হয়তো আবেগতাড়িত হয়ে বহুবার বলেছেন, অনেক বড় হও, অনেক দিন বেঁচে থাকো, এই আশীর্বাদ করি।

কিন্তু এই আশীর্বাদটা শুধু নিজের মেয়ের জন্যই বরাদ্দ থাকে, তাই না? একটাবারও সেই মন নিয়ে অন্যের মেয়ের জন্য আপনারা আশীর্বাদ করেন না, বা করতে পারেন না। অথচ একবারও নিজের মেয়ের মাথায় হাত রাখার সময় অন্যের মেয়ের সাথে ঘটে যাওয়া ভয়ংকরের চেয়েও ভয়ংকর ঘটনা আপনাদের মনোজগতে একবিন্দুও প্রভাব বিস্তার কেন করে না?
হয়তো ভাবেন, আরে পরের মেয়ের জন্য এতো আদিখ্যেতা করে কী লাভ, আমার মেয়ে তো সুরক্ষিত! তাহলে জেনে রাখুন একটা চরম সত্য, আপনার মেয়েও সুরক্ষিত নয়। না ঘরে, না বাইরে, না হাটে, না ঘাটে। নিজের মেয়ে চরম লাঞ্ছিত, অপমানিত, অসম্মানিত হয়ে আধ মরা হওয়া বা মরার আগে কোনদিনও আপনারা উপলব্ধি করতে পারবেন না অন্যের কষ্ট, দুঃখ, যন্ত্রণাটা।

জ্যান্ত লাশ সমতুল্য কন্যা বা কন্যার লাশ বহনের অনুভূতি ঠিক কেমন আপনারা তখন বুঝবেন, যখন নিজের কন্যাও সেই কাতারে সামিল হবে। শুধু আশীর্বাদ দিয়ে কোনো লাভ হবে না। কারণ আপনার কন্যা আজীবন আপনার কোলে থাকবে না। তাকে আপনার গণ্ডির বাইরে পা রাখতেই হবে। হাজার মূল্যবোধ দিয়ে বড় করে তোলা মেয়েটিও অকারণে কোনো বীভৎসতার মুখোমুখি হয়ে যেতে পারে মূল্যবোধহীনভাবে বেড়ে উঠা কিছু অমানুষের বিকৃত চিন্তার রসদ যোগাতে।

তখন আপনি কী করবেন? বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন- চোখের সামনে কোনো মেয়েকে যেকোনোভাবে লাঞ্ছিত হতে দেখলে তার প্রতিবাদ আপনারা করেন? কোনো মেয়ে সাহায্য প্রার্থনা করলে তাকে ন্যূনতম সহায়তা আপনারা করেন? আশেপাশে কোনো মেয়ের নির্যাতনকে আপনারা যার যার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যাপার বলে এড়িয়ে যান না?যদি এড়িয়ে যেয়েই থাকেন, তাহলে নারী নির্যাতনের এই ক্রমবর্ধমান হার দেখে দয়া করে অবাক হবেন না।

আপনি, আমি, আমরা মিলেই সমাজ। সমাজ পরিবর্তনের জন্য সবার আগে নিজের মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি।তথাকথিত সুশীলতা থেকে বেরিয়ে এসে কিছু করা জরুরি। বেশি দূরে না যাই, আপনার অমুক আত্মীয়ের পুত্রবধূ চরম পারিবারিক নির্যাতনের শিকার, আপনার পরিচিত তমুক সাহেবের বখাটে পুত্র কর্তৃক কিশোরী মেয়েটি লাঞ্ছনার শিকার, আপনার পাশের ফ্ল্যাটের নির্যাতনকারী পারভারটেড লোকটির স্ত্রী ও সন্তান চরম বিপর্যয়ের শিকার, ইত্যাদি ইত্যাদি জেনেও কি আপনি রুখে দাঁড়ান?
নিদেনপক্ষে সঙ্গ ত্যাগ করেন? উত্তর- না।
বরং আপনার বাসায়ই হয়তো আজ রাতের বার্থডে পার্টিতে বা আপনার মেয়ের বিয়েতে এরা সবাই একযোগে আমন্ত্রিত।এইসমস্ত সামাজিক ক্রিমিনালের অনুপস্থিতিতে আপনার সামাজিকতার আয়োজন অসম্পূর্ণ থেকে যেত! তাই এদের জন্যেও বরাদ্দ আপনার আপ্যায়নের আয়োজন। এছাড়া এরা তো আপনার সাথে কোনো অন্যায় করেনি, তো তাদের ব্যক্তিগত বিষয় বাদ দিলে তাদের সাথে সামাজিকতার সম্পর্ক, আত্মীয়তার সম্পর্ক জায়েজ হয়ে যায়, তাই না? বিষয়টা সে খুনি, কিন্তু আমাকে তো আর খুন করেনি এরকম হয়ে গেল না?

যেকোনো ধরনের অপরাধ সংগঠনের পরেও যদি অপরাধীরা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা হারায় না, তখন তারা চক্ষুলজ্জাটাও হারিয়ে ফেলে। আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে যায়। এদের দেখে অপরাধমনস্ক আরও কিছু মানুষও উদ্বুদ্ধ হয় অনৈতিক কাজে।

ছোট বালুকার কণা, আর বিন্দু বিন্দু জল দ্বারা যেমন মহাদেশ, সাগরের সৃষ্টি হয় তেমনি ছোট ছোট অপরাধ সম্পাদনকারীও কোন ক্ষেত্রেই বাধা না পেতে পেতে একদিন বড় ধরনের অপরাধী হয়। যে আজ লুকিয়ে চুরি করেছে, বাধা না পেলে কাল সে ছিনতাই, আর পরশু সগর্বে ডাকাতি করবে, ঠিক তেমনি আজ যে একটা মেয়ের সাথে যেকোনো ধরনের অন্যায় করে পার পেয়ে যাচ্ছে, কাল সে এর চেয়ে বড় কিছু করবে এবং পরশু তার চেয়েও বেশি কিছু। বেশিরভাগ অপরাধই সংঘটিত হয় পারিবারিক ও সামাজিক সহযোগিতায়। কারণ সবাই দেখেও না দেখার ভান করে থাকবেন, কেউ আবার এক কাঠি সরেস হয়ে চোরের সাক্ষী মাতাল হতে যাবেন। তাহলে অপরাধটা কমবে কিভাবে?

যেই মুহূর্ত থেকে আপনি কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন সেই অন্যায়ের ভাগীদার কিন্তু আপনি নিজেও হচ্ছেন। আজ আপনি দর্শক, কাল আপনার ক্ষেত্রেও আরেকজন দর্শক হবে। আজ আপনি সহায়ক, কাল আরেকজন সহায়ক হবে। আর সহায়তা বেশি পেয়ে যেকোনো অপরাধীর এমন অবস্থা হয়েছে যে, যার সাথেই অন্যায় করুক না কেন, যেই নির্যাতনের শিকার হোক না কেন, নির্যাতিতার সেই ঘটনার প্রতিবাদ করতে চাওয়াকেও তারা অন্যায় মনে করছে।

অপরাধ তারা করবে, বুক ফুলিয়ে তারা ঘুরবে, কিন্তু যে ঘটনার শিকার হয়েছে সে যদি টুঁ শব্দ করে, তার কন্ঠ তারা যেকোনx উপায়ে রূদ্ধ করছে বা করতে চাইছে। তারা ধরেই নিচ্ছে জোর যার মুল্লুক তার। তাদের জোর বাড়াতে নয়, কমাতে অবদান রাখুন। অপরাধী আপনার আপন কেউ হলেও তার সঙ্গ পরিত্যাগ করে নির্যাতিতার পাশে দাঁড়ান। নিজের মনুষ্যত্বের পরিচয় দিন।

Raise your voice to stop violence against women. এটিই হবে আপনার কন্যার নিরাপদে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে আপনার সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ।

শেয়ার করুন:
  • 3.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.5K
    Shares

লেখাটি ২,৬৭২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.