বাংলাদেশকে লেখা খোলা চিঠি

0

তাবিয়া তাসমিয়া:

প্রিয় বাংলাদেশ,
আজ তোমাকে ছেড়ে আসার তিন মাস পূর্ণ হলো। আমি জানতে চাইবো না তুমি কেমন আছো, কারণ আমি জানতে না চাইলেও আমার চোখের সামনে তোমার সব খবর চলে আসে। যখন দেশে ছিলাম তখন খবর পড়া এবং দেখা ছেড়ে দিয়েছিলাম। বিদেশ আসার পরেও কোনো খবর পড়ি না, বা দেখি না, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের কল্যাণে হোক আর অকল্যাণেই হোক, সব সুসংবাদ আর দুঃসংবাদ চোখে পড়ে যায়।

কী করা যায় বলো তো? ভাবছি এখন থেকে আর সোশ্যাল মিডিয়াও ব্যবহার করবো না।
এবার বলি আমি কেমন আছি। তুমি কি জানো আমি কত রাত ধরে ঘুমাতে পারছি না? কত রাত ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে? আমি ভুলতে পারি না পার্বতীপুরের ঐ পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়েটাকে, যাকে বিকৃত উপায়ে ধর্ষণ করেছিল বিয়াল্লিশ বছরের এক জানোয়ার। ঐ খুনিটা ঐ মেয়েটার গোপনাঙ্গে সিগারেটের অসংখ্য ছ্যাঁকা দিয়েছিল। যৌনাঙ্গ কেটে দিয়েছিল।

ভুলতে পারি না হাওরের ওপর লাল জামা পরা পনের বছরের কিশোরী বিউটির লাশ। ভুলতে পারি না পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ-পড়া, বোরখা-পরা অন্তঃসত্ত্বা ঐ মেয়েটিকে, যার খণ্ড-বিখণ্ড লাশ পড়ে ছিল রেল লাইনের চারপাশে।
তথ্য পেলাম যে গত তিন মাসে ১৮৭ জন নারী ধর্ষিত হয়েছে আর ৪২২ জন শিশুকে নির্যাতন বা হত্যা করা হয়েছে। যাই হোক, এতো খারাপ খবরের মধ্যে একটা ভাল খবর হলো বিউটির ধর্ষক আর হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু এতে করে কি বিউটি ফিরে আসবে? কিংবা বিউটির বাবা-মা কি ন্যায় বিচার পাবে?

আচ্ছা প্রিয় দেশ, তোমার বুকে যে এতো অপরাধ হচ্ছে, তুমি তা সহ্য করে আছো কীভাবে? আমি তো সহ্য করতে পারছি না। এসব দেখার পর কেউ কীভাবে সুস্থ থাকে, বলো? অবশ্য আমি তোমাকে দোষ দেই না। তোমার কী অপরাধ? তোমার এই পবিত্র বুকে যারা অন্যায় করে যাচ্ছে, তারা তো সমাজেরই অংশ। ভিনগ্রহ থেকে নিশ্চয়ই আসেনি। এদের এইরূপ মস্তিষ্ক বিকৃতির কারণ কী? আর হঠাৎ করেই এই বিকৃতি ঘটেছে?

উন্নত দেশে নারীরা অনেক বেশি সুরক্ষিত। এখানে একজন নারীর সম্মতি ছাড়া তার শরীর অন্য কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। পশ্চিমারা নারীদের খুব সম্মান করে, তাই জোরজবরদস্তি করার প্রশ্নই আসে না। বাংলাদেশের যুব সমাজের মাঝে পশ্চিমাদের ফ্রি সেক্স সংস্কৃতি নিয়ে এক ধরনের ফ্যান্টাসি কাজ করে। আরে ওদের কে বোঝাবে যে ফ্রি সেক্স মানে যার-তার সাথে যখন খুশি তখন সেক্স নয়। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষের সম্মতির ব্যাপার আছে। কোনো এক পক্ষের সম্মতি না থাকলে সেটা ধর্ষণ বলে ধরা হয়। তাই বারে মদ খেতে গিয়ে কোনো মেয়ে অচেতন হয়ে গেল আর তাকে বাসায় এনে তার অনুমতি ছাড়া তার সাথে সেক্স হলো ধর্ষণ। আর হ্যাঁ, এখানে ধর্ষণের শাস্তি খুব ভয়াবহ, আর যারা এটা করে তাদের পুরো জীবন নষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া কাউকে মৌখিকভাবে যৌন হয়রানি করলেও কঠোর শাস্তি পেতে হয়।

এই কথাগুলো এজন্য বললাম যে এখানে আসার পর আমার স্বদেশী দু’একজন পুরুষ আমার সাথে খুবই অশালীন এবং কুরুচিপূর্ণ আচরণ করেছে। এখন আমার নিন্দুকেরা বলবে, “বেটি তোর চলাচল আর চরিত্রে সমস্যা।“ঐ যে পশ্চিমা ফ্রি সেক্স নিয়ে বাংলাদেশীদের গৎ বাঁধা ধারণা। এরা মনে করে আমি তাদের দেশের এবং আমার স্বামী এখানে নেই বলে তারা আমার সাথে যাচ্ছেতাই করার সুযোগ পাবে। এরা তো নারীদের শ্রদ্ধার চোখে দেখেই না, আর সব নারীকে নিজেদের সাথে এক বিছানায় কল্পনা করে! কীভাবে কতজনের সাথে কোথায় শুবে এই হলো তাদের ধ্যান-জ্ঞ্যান।
মজার বিষয় হলো বাংলাদেশীদের বাইরে অন্য কোনো দেশের কারও কাছ থেকেই আমি এরকম বিকৃত আচরণ পাইনি। আমি কখনোই বলবো না এখানে আসা সব বাংলাদেশি পুরুষ খারাপ, কিংবা বিকৃত মানসিকতার অধিকারী। তবে কয়েকজন তো আছেই। এদেশে এতো স্বাধীনতা পেয়ে এরা হিতাহিতজ্ঞ্যান হারিয়ে ফেলেছে, ফলে কী করতে কী করবে সেটাই বুঝতে পারছে না।

হয়তো আজকে এটা বিদেশ না হলে আমাকে কবে ধর্ষণ করে মেরে ফেলতো। শুধুমাত্র এখানে যৌন হয়রানি বিরোধী কঠোর আইন আছে বলেই আজ এইসব শকুনদের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেলাম।

প্রিয় স্বদেশ, একবার চিন্তা করো তো বিদেশে পড়তে আসা শিক্ষিত পুরুষগুলোর মানসিকতা এতো বিকৃত হলে অশিক্ষিতদের কী অবস্থা? আমাদের সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে লেখা ছিল, “দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিনোদনের অভাবের ফলে অধিক সন্তান জন্মগ্রহণ করে”। তার মানে এই দরিদ্র অশিক্ষিত জনগণের বিনোদনের উৎস হলো সেক্স!

আমাদের সমাজের কোনো স্তরেই তো সেক্স এডুকেশন নাই, আর বাংলাদেশে সেক্স একটা ট্যাবু, তাই এটা নিয়ে আলোচনা করা নিষিদ্ধ। তাই যারা পর্নোগ্রাফি দেখে এবং সেক্স এডুকেশন পায় নাই , ওদের মানসিকতা কীভাবে ঠিক থাকবে? ওদের কাছে তো ঐ পর্নোগ্রাফিই সেক্সের স্ট্যান্ডার্ড। কেন তারা ধর্ষণ করবে না? এদের সমাজ এবং পরিবার তো এদের শেখায়নি নারীদের শ্রদ্ধা করতে। এর পেছনে আরেকটা কারণ হলো আমাদের অস্তিত্ব-সংকট। আমরা না পুরোপুরি বাঙালি, না পুরোপুরি মুসলমান। যে সম্পূর্ণ ইসলামিক জীবন যাপন করে, সে কখনো ধর্ষণ করতে পারে না। বাংলাদেশে কয়জন মানুষ সম্পূর্ণ ইসলামিক জীবন যাপন করে, আর কয়জন বাঙ্গালিয়ানা ধরে রেখেছে?

আরও এক শ্রেণী আছে যাদের অনেকেই পশ্চিমা জীবন অনুসরণ করতে গিয়ে কোথায় যে হারিয়ে যাচ্ছে! বাবা-মা ভীষণ ধার্মিক, আর তাদের ছেলেমেয়েরা লিভ টুগেদার করছে! কেউ দেখেও দেখে না! আর মহামারী পরকিয়ার কথা না-ই বললাম। আরেকদিন বলবো।

আরে, যদি পশ্চিমা মূল্যবোধ ধারণ করতেই চাও, তবে আগে ওদের মতো নারীকে সম্মান করতে শেখো।
বাংলাদেশে একটা জায়গা ছিল যেখানে আমি নিরাপদ বোধ করতাম। সেটা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, আমার ক্যাম্পাস। আমি পাঁচ বছরের ক্যাম্পাস জীবনে কোনদিন ইভ টিজিং এর শিকার হইনি। ঐ সময়টায় ছেলেরা মেয়েদের অনেক শ্রদ্ধা করতো। মাঝে মাঝে গভীর রাত পর্যন্ত কনসার্ট দেখে ফিরতাম, বন্ধুরা নিরাপদে হল-এ পৌঁছে দিত। এখন কী অবস্থা জানি না। হয়তো আগের মতই আছে।

আর তখন নিজের বাড়িও আমার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ছিল। আজ আমাদের সমাজের মেয়েরা কোথাও নিরাপদ নয়। যখন ছোট থেকে বড় হচ্ছিলাম, তখন তো পরিবেশ এতো খারাপ ছিল না। আজ পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহারকারী মেয়েরা প্রতিনিয়ত কিসের সম্মুখীন হয় তা সবাই জানে, তাই ওসব কথা আজ আর বলবো না।

হঠাৎ মনে পড়লো, সামনে পহেলা বৈশাখ আসছে। দু:শ্চিন্তা করি আবার কোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটবে না তো! দেশে যখন শাড়ি পরতাম, তখন রাস্তায় হাঁটতে বের হলে আমার স্বামী বলতো, গাড়ি ছাড়া বাইরে বের হবে না, রাস্তার প্রতিটা পুরুষ তোমাকে চেক-আউট করে (মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করতেই থাকে)।

সেদিন সোশ্যাল মিডিয়াতে রাজশাহীর একটা মেয়ে লিখেছে, ও খুব শখ করে শাড়ি পরে ঘুরতে বের হয়েছিল, কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে এক বিকৃত মানসিকতার লোক ওর শাড়ির পেছনে পানের পিক ফেলে। সেটা দেখে রাস্তার বাকি লোকজন মজা নিচ্ছিল যেন ওর শাড়িতে পিরিয়ডের রক্ত লেগে আছে! মানুষগুলো এতো খারাপ!

এই দেশে তো মেয়েরা যা খুশি তাই পরে ঘুরে বেড়ায়, কেউ ফিরেও তাকায় না, ইভ টিজিং করে না, ধর্ষণ তো প্রশ্নই আসে না। একজন ফেইসবুকে শেয়ার করেছে, “বিড়ালের সামনে মাছ রেখে বিড়ালকে ওটা খেতে মানা করলে হবে? তেমনি পুরুষের সামনে খোলামেলা চলাফেরা করলে ধর্ষণ হবে না?” এই বিদেশে নারীরা এতো খোলামেলা চলে, ওদের কেউ ধর্ষণ করে না কেন?

ধর্ষণের পর হত্যার তালিকাটা বেড়েই চলেছে। হারিয়ে যাচ্ছে একের পর এক নারী-শিশু। এর যেন কোনো শেষ নেই। এর দায়ভার যতোটা না বেশি রাষ্ট্রের, তার চেয়ে বেশি সমাজের। ধর্ষণের বিচারহীনতা একটা বড় সমস্যা, তবে তার চেয়েও বড় সমস্যা মনস্তাত্ত্বিক। একজন মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষের সাথে যুদ্ধ করা যায়, কিন্তু এই মানসিকভাবে অসুস্থ সমাজের সাথে যুদ্ধ করবে কে? এই অসুস্থ সমাজকে সুস্থ করার দায়ভার কে নেবে?

প্রশ্ন রইলো তোমার কাছে হে স্বদেশ।
বাংলাদেশের সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।

লেখক: প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া এওয়ার্ডস স্কলারশিপ নিয়ে মনাশ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নরত

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 349
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    349
    Shares

লেখাটি ৫৯২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.