লেখিকার স্বামী

0

আমেনা বেগম ছোটন:

ইয়াকুবের সংসারে আর আগের মতো শান্তি নাই। দুশ্চিন্তায় তার প্রেশার স্বাভাবিকের চেয়ে বাড়তি হয়ে যাচ্ছে প্রায়ই।
ইয়াকুবের বর্তমান বয়স ৪৮, সে বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। তার প্রথম স্ত্রী মমতাজ বছর ছয়েক আগে একদিন হঠাৎ করে হার্টফেল করে মারা যায়। দুই ছেলের মধ্যে একজনের বয়স তখন চার, আরেকজনের ছয়। তখন সে ডিভি ভিসাতে আমেরিকাতে। মমতাজের আকস্মিক মৃত্যুতে শোক থেকে বড় সমস্যা দেখা দেয় ঘর গৃহস্থালি সামলানো। তার মায়ের কাছে এ নিয়ে কান্নাকাটি করতেই তার মা একই গ্রামের সাদিয়ার সাথে দ্রুত বিয়ে ঠিক করে ফেলেন।

ইয়াকুব দুই পুত্র সহকারে বিবাহের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ গমন করেন। ইয়াকুবের মা অতি বিচক্ষণতার সাথে পাত্রী বাছাই করেছেন। পাত্রী ডিগ্রী সেকেন্ড ইয়ার, দেখতে শুনতে বেশ। মমতাজের থেকে তার গায়ের রঙ পরিষ্কার। সাদিয়ার বাবা মারা গেছে বলে তারা উপযুক্ত পাত্র পাচ্ছিল না। বিনা পয়সায় মেয়ে গছাতে পেরে মেয়ের পরিবারও বেশ আনন্দিত।

সাদিয়া মেয়ে ভালো। কাজেকর্মে অত পটু না হলেও তার ছেলেদের দেখেশুনে রাখে। ইয়াকুব এতেই খুশি। তবে খুশি সে তেমন প্রকাশ করে না, বরঞ্চ ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দেয় দায়িত্বের সাথে। প্রথম বিয়ের অভিজ্ঞতায় দেখেছে, নতুন বউকে বেশি আদর-সোহাগ দিলে সে স্বামীকে ইয়ার দোস্ত ভাবা শুরু করে। পরে আর শাসনে কাজ হয় না, স্বামী এক ধমক দিলে বউ দেয় তিন ধমক।

আগের বিয়ের অভিজ্ঞতা সে অতি বিচক্ষণতার সাথে কাজে লাগায়। মমতাজ একেবারেই হিসেবি ছিল না। সাজগোজ করবে, বেড়াবে, এই কিনবে, ঘর সাজাবে, একে তাকে উপহার দিতে চাইবে, সংসারে সঞ্চয় বলতে কিছু থাকতো না। মাঝে-মধ্যে মা যদি অতিরিক্ত কিছু চাইতো, দেয়ার মতো টাকা হাতে থাকতো না। গ্রামে জমি কিনবার সুযোগ হয়েছিল দু তিন বার। প্রতিবারই হাত খালি। এমনকি ঘরের পাশের যে শরিকের জমি বেচলো চাচা, সেটাও হাতছাড়া হয়ে গেছে। সবাই তাদের নিয়ে হাসাহাসি, আমেরিকা থাকা পোলা ২ লাখ টাকার জমি কিনার মুরোদ নাই।

সাদিয়াকে তাই সে কোন আলাদা হাতখরচ দেয় না। মাঝেমধ্যে বাজার করতে ২০-৫০ ডলার দেয়। সেটার হিসেবও রাখে। এই প্রবাসী বউগুলির শখের শেষ নাই। তাদের খালি দেশে এটা-সেটা দিতে মন চায়, যেন ডলার গাছে ধরে আর কী!

সাদিয়া একটু সহজ সরল ধরনের। তাকে যা বলা হয় তাই করে। সে সাজগোজ করে এটা ইয়াকুবের পছন্দ না, অল্পবয়সী মেয়ে, চোখে চোখে রাখা দরকার। তাই বলে দিয়েছে, তুমি সাজলে বিশ্রী লাগে। সাদিয়া সাজে না। বোরখা কিনে দিয়েছে, পর্দা ফরজ মুসলিমের জন্য।

বছর ঘুরতে সাদিয়া সন্তান সম্ভবা হলো। ইয়াকুব খুশিই হলো। যাক, এবার নিশ্চিন্ত। মেয়ে হলো, তাতেও খুশি। মমতাজের ছিল দুই ছেলে। সাদিয়া পুরো সংসারে জড়িয়ে গেল।
মেয়ের বয়স যখন ৮ মাস, তখন সাদিয়া যেন কেমন হয়ে যায়। সারাদিন খিটখিট, খাওয়া-দাওয়ায় রুচি নেই, কী হয়েছে কে জানে। ডাক্তারের কাছে নেয়ার পর ডাক্তার টেস্ট করে দেখলো, সাদিয়া দুই মাসের প্রেগন্যান্ট। ইয়াকুবের মাথায় হাত।

আবার বাচ্চা? নাহ, কিছুতেই না। তার দুই ছেলের কী হবে? সাদিয়া নিশ্চয়ই নিজের বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে। চারটা ছেলেমেয়ে পালার খরচও তো কম না। তার বয়স হয়েছে, অতিরিক্ত কাজ বা খাটুনি সে নিতে পারবে না। হাইপ্রেসার ধরেছে কিছুদিন আগে। এই বাচ্চা এবরশন করিয়ে ফেলতে হবে।
একটু ইতস্তত করে সে সাদিয়াকে কথাটা বলেই ফেললো। সাদিয়া হতবাক হয়ে ইয়াকুবের দিকে তাকিয়ে রইলো। মৃদুস্বরে বললো, আমি বাচ্চা নষ্ট করবো না।

— তুমি কীভাবে চারটা বাচ্চা দেখাশোনা করবে?
— পারবো, সাথে তুমিও সাহায্য করবে।
— আমার পক্ষে এতো খরচ টানা সম্ভব না, তুমিও তো চাকরি করো না।

সাদিয়া এবার অসহায় বোধ করে। আসলেই তো, সে তো চাকরি করে না। সে করতে চেয়েছিল, ইয়াকুব হেসে উড়িয়ে দিয়েছে, এক অক্ষর ইংরেজি বের হয় না মুখ দিয়ে, তুমি করবে চাকরি! আর তাছাড়া ঘরের কাজ, বাইরের কাজ দুটো সামলে পারবে? আমি কিন্তু ছেলেমেয়েদের কোনো অযত্ন সহ্য করবো না।

সাদিয়া তবু শেষ চেষ্টা করে, বাচ্চার জন্য ত আমরা ফুড স্টাম্প পাব। তোমার উপর চাপ হবে না।
— আচ্ছা, একগুঁয়ে মানুষ তুমি। আর খরচ নেই? আমি হাইপ্রেশারের রোগী। মরে গেলে এই চার বাচ্চা নিয়ে ভিক্ষা করতে হবে তোমার।

এরপর আর কথা চলে না। রাজি হয়ে যায় সাদিয়া। দুদিন পরই ডেট পেয়ে যায়। অপারেশন এর আগে নার্স বারবার জিজ্ঞ্যেস করে, সাদিয়া সজ্ঞানে এবং স্বেচ্ছায় এবরশন করাচ্ছে কি না! সে চাইলে বাচ্চা রাখতে পারে।
সাদিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে সাইন দেয়, সে কারও প্ররোচনা, হুমকিতে প্রভাবিত না হয়ে সম্পূর্ণ সজ্ঞানে, স্বেচ্ছায় এবরশন করাচ্ছে।

তেমন কষ্টও হলো না, ডাক্তার হাতে স্যালাইন দিল। হাসিমুখে বললো, তোমাকে অজ্ঞান করছি। এরপর আর কিছু মনে নেই তার। শেডিয়া শেডিয়া শুনে জেগে উঠলো, ট্রলিতে ঠেলে এনে রিকভারি রুমে রাখা হলে আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে রইলো ঘন্টাখানেক।। দু ঘন্টা পর ইয়াকুব মেয়ে রুমাইসাকে নিয়ে এলো। রুমাইসা ঝাঁপিয়ে পড়লো সাদিয়ার কোলে। সাদিয়া রুমাইসাকে নিয়ে পাথরের মতো বসে রইলো, কিচ্ছু বললো না।

নার্সের কাছে খবর নিল, সব ঝামেলা ঠিকঠাক মিটেছে কিনা! নার্স হ্যাঁ বলাতে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সাদিয়ার দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললো, চলো, বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নেবে। বোরখা আর হিজাব পরে নেয় সাদিয়া। ইসলাম তার জন্যে প্রযোজ্য, ইয়াকুবের জন্যে না।

বাড়ি ফিরে দেখলো, সব পরিপাটি। ইয়াকুব গুছিয়ে রেখেছে সব। রাজিব-সজীবকেও বলে দিল মাকে বিরক্ত না করতে।
সাদিয়ার কিছুই ভালো লাগে না। ইচ্ছে করে চিৎকার করে সবাইকে বলে তার সন্তানকে হত্যার কথা। ইয়াকুবের এই রেসপন্সিবল ফ্যামিলিম্যান মুখোশটা খুলে দেয়। জানোয়ার কোথাকার। প্রায়ই সে কাঁদে, পেটে হাত বুলায়, দুঃস্বপ্ন দেখে তার বাচ্চা করুণ চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রাজিব সজীব মাঝে-মধ্যে জিজ্ঞ্যেস করে কী হয়েছে তার, ইচ্ছে হয় গল্পের সৎ মায়ের মতো ছেলেগুলির উপর অত্যাচার করে। এরা ইয়াকুবের সন্তান বলে বেঁচে গেছে, তার সন্তানটিকে হত্যা করা হয়েছে।

ইয়াকুবের যে খারাপ লাগে না, তা না। অসুবিধেও হচ্ছে, সাদিয়াকে যখন-তখন কাছে পাওয়া যায় না। একসাথে ঘুমাতে গিয়ে গায়ে হাত দিলে ছিটকে সরে যায় সাদিয়া। আচ্ছা, মুশকিল তো!

একদিন ইয়াকুব অবাক হয়ে দেখলো, সাদিয়া ফেসবুকে গল্প লিখেছে। তার নানীর আমলের বিয়ে-শাদীর গল্প। ইয়াকুব পুরাটা পড়েও দেখেনি। যাকগে, লিখুকগে। ফেসবুকে গল্প লিখতে তো আর পয়সা লাগে না। এমনিতেই বেচারির কোনো শখ আহলাদ নেই।

এরপর সে প্রায়ই লিখে, আমেরিকার গল্প, গ্রামের গল্প, তার বাপের দুই বিয়ের গল্প, শাশুড়ির গল্প। ইয়াকুব পড়ে দেখে না, মেয়েমানুষ আর কী গল্প লিখবে, মেয়েলি সব ব্যাপার নিয়ে প্যানপ্যান। তবে কমেন্টে লক্ষ্য রাখে, কোনো লুইচ্চা আবার কী করে, তার ঠিক নেই। সাদিয়া মেয়ে ভালো, কিন্তু খুব সোজাসরল, নয়তো সে কি আর ইয়াকুবের মুঠিতে থাকে? তবে কিনা কলকাঠি দেবার লোকের তো অভাব নেই।

সাদিয়ার ফ্রেন্ডলিস্টে ছেলে কম, মেয়ে বেশি। সে ভালো। একদিন অবশ্য সাদিয়ার একটা লেখা পড়ে চমকে গেল। একটা মেয়ের স্বামীকে নিয়ে লেখা গল্প। স্বামী সাজগোজ পছন্দ করে না, তাকে সুযোগ পেলেই বকা দেয়, এ জাতীয় গল্প, কী সর্বনাশ।
একদিন সাদিয়াকে ডেকে বললো, এসব কী লিখ? স্ত্রী হিসেবে যদি তোমার যদি কোনো অভিযোগ থাকে, সেটা আমাকে বলবে। ফেসবুকে শুনিয়ে তো লাভ নেই। তোমার স্বামী খারাপ হলে তোমার নিশ্চয় তাতে সম্মান বাড়ে না। লোকে তোমাকেই খারাপ বলবে।
লেখালেখি করতে চাও, ভালো কথা। তা বলে এমন কিছু লিখবে না, যাতে আমার ছোট হতে হয়। ভালো ভালো বিষয় নিয়ে লিখবে, যাতে সমাজ সংসারে শান্তি আসে। আজকাল তো অনেকের বই বের হয়, তোমার লেখা দরকার হয় প্রকাশককে টাকা দিয়ে ছাপিয়ে দিব। স্ত্রীর লিখালিখিতে বাধা দেবো, এত ছোটলোক আমি না।

সাদিয়া মাথা নাড়ে। ইয়াকুবের ভারি রাগ হয়, ভাব দেখায় বেকুবের মতো, এদিকে পেটে জিলাপির প্যাঁচ। যত্তসব।

ইয়াকুব অবশ্য এখন সাদিয়ার লেখার উপর চোখ রাখে, গল্পটল্প পড়তে তার কোনকালেই ভালো লাগে না, তবু নিজের সম্মানের জন্য দেখে রাখতে হয়। সেদিন জুম্মার নামাযে রিপন মিয়া জিজ্ঞ্যেস করেছে, ভাবী যে গল্পগুলি লিখে তার নায়ক আপনি নাকি? ভাবীর মনে দেখি অনেক দু:খ। খেয়াল টেয়াল কইরেন উনার দিকে। আজকালকার মেয়ে, তাও আবার আপনার দ্বিতীয় পক্ষ। রাগে গা জ্বলে গেল ইয়াকুবের, কপাল খারাপ না হলে কারও বউ ফেসবুকে লিখালিখি করে?

তবে সাদিয়া বিপজ্জনক কিছু এখনো লিখছে না। যদিও তার লিখার নিচে কিছু ফাজিল মহিলার কমেন্ট দেখা যায়। দেশে এ এক নতুন ফাইজলামির চল হয়েছে, নারীবাদিতা। নিজের ঘর সংসারের ঠিক নাই, ঘরের কাজকাম রান্নাবাড়ার খবর নাই, গিয়ে অন্যের ঘরের মেয়ে বউদের উস্কানি দাও। পর্দার দরকার নাই, বেলেল্লাপনা কর, স্বামীর সাথে টক্কর দাও।

বে** মা** গুলা। আবার ওইদিন সাদিয়া কী এক লেখা শেয়ার দিয়েছে জরায়ুর স্বাধীনতা, কত বড় বেহায়া আর বেয়াদব। তার সাদাসিধে বউটা বিগড়ে দেবে এরা, সংসার ভাংতে চায় এরা।
অনেক সহ্য করেছে ইয়াকুব, আর না। সাদিয়াকে ডেকে শক্ত করে বলেছে,
শুনো, আমি দ্বিতীয় বিবাহ শখে করি নাই, বাচ্চাদের জন্য করছি। আমি আমেরিকান সিটিজেন। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মডেল কন্যা যাই বিয়া করতে চাইতাম, পারতাম, করি নাই, কারণ আমার দরকার ঘরের বউ। যে রাঁধবে, স্বামী সোহাগ করবে, ঘরসংসার ঠিক রাখবে। মফস্বলের মেয়ে এই জন্যে বিয়া করি নাই, সে ফেসবুকে লিখবে, আর তার নারীবাদী বন্ধুবান্ধবের কথা শুনে সংসারে অশান্তি করবে।

আমি কখনো তোমার গায়ে হাত তুলছি, না খাওয়া-পরার অভাব রাখছি? কীসের অভিযোগ তোমার? তুমি আর ফেসবুকে লিখতে পারবা না, কোনো লেখালিখিই করবা না। আমার অবাধ্য হলে সোজা দেশে পাঠায় দিব। দ্বিতীয় বিয়ে যখন করতে পারছি, তিন নম্বর হবার মেয়েরও আকাল পড়ে নাই।

আড়চোখে তাকিয়ে দেখে সাদিয়ার মধ্যে তেমন ভয় নেই। সাহস ভালোই বাড়ছে তার, ডোজ বাড়াতে হবে। ইয়াকুব নরম গলায় বললো, সাদিয়া, তুমি খুব ভালো মেয়ে। তুমি ভালো রানতে পারো না, ঘর গুছাইতে পারো না, এই নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নাই। আমি সাহায্য করবো। কিন্তু দেখ, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মনোমালিন্য সব সংসারে হয়, সেগুলি নিজেরা মিটাইতে হয়। তোমার আমার মধ্যে কোনো মনোমালিন্যও নাই। হঠাৎ সাদিয়ার হাত চেপে ধরে ইয়াকুব, আমি সত্যিই তোমারে অনেক ভালবাসি। কোনদিন বলি নাই, কিন্তু তোমার মতো লক্ষ্মী বউ আর কারও নাই। বউ, আমাদের ছেলেমেয়েগুলির দিক তাকায়া এই লেখালেখির জিদ ছাড়ো বউ। অন্য কিছু করো, আমি বাধা দিব না। উল্টা সাহায্য করবো। প্লিজ বউ। ইয়াকুব কেঁদেই ফেলে।

সাদিয়া তাকিয়ে থাকে, লেখালেখিটাও ছাড়তে হবে তাহলে। লিখতে গিয়ে সংসারে অশান্তি সে করবে না। তবু এভাবে বাঁচতেও সে পারবে না। কিছু তো করতেই হবে। সে বেকার বলেই তার পেটের সন্তানকে হত্যা করা হয়, কলম, কি-বোর্ড কেড়ে নেয়া হয়। ধর্মের ভয় দেখিয়ে বোরখা মুড়িয়ে বাইরের পৃথিবীর স্বাধীনতার আনন্দ লুকিয়ে ফেলা হয়।

মৃদুস্বরে বললো, আমি পড়াশোনা করতে চাই। ছোটখাটো জব করতে পারবো, এমন পড়াশোনা।
— অবশ্যই করবা। আমি কালকেই জামির ভাইয়ের সাথে কথা বলে তোমার পড়ার ব্যবস্থা করবো। খুশি মনেই করবো। তুমি জব করলে আমারও সাহস। হায়াত মউতের তো ঠিক নাই। ছেলেমেয়েগুলিকে দেখে রাখতে পারবা, রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে না।

সাদিয়ার একটু বুক কেঁপে ওঠে। যত খারাপই হোক, লোকটার দীর্ঘায়ু চায় সে। শান্ত গলায় বলে, ভাত দিব? রাত হয়ে গেছে।

— দাও। একটা ডিম ভাজি কইরো পারলে। ইয়াকুব স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে।

রুমাইসা এখন ধরে ধরে হাঁটতে পারে। সে দেয়াল ধরে হাসিমুখে মা মা করতে করতে সাদিয়ার দিকে এগুতে থাকে। সাদিয়া কোলে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে তাকে। তার মেয়ের নিশ্চয় আরেকটু বেশি স্বাধীনতা থাকবে। অবশ্যই থাকবে, মা হিসেবে সে তা নিশ্চিত করবে।

পরিশিষ্ট:

সাদিয়া আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে। রাতের দূরত্বও কমে আসে। সাদিয়া সতর্ক হতে চায়, ইয়াকুব বলে আরে ধুর কিছু হইবো না। তুমি বেশি ডরাও। বাচ্চা কি কলের পানি নাকি? ট্যাপ খুললেই আইসা পড়বো? নিজের রসিকতায় হাসে ইয়াকুব। ঘেন্না লাগে সাদিয়ার। তবু কিছু বলে না।

তবে কলের পানির মতোই সহজে আবারও প্রেগন্যান্ট সাদিয়া। ইয়াকুব বিরক্ত মুখে ডাক্তারের কাছে যায়, সাদিয়া চুপচাপ কাগজে সাইন দেয়। এবরশনও হয়ে যায়। তার ডাক্তার কিছু উপদেশ দেয়, বিরক্ত মুখে হু হা করে সে।

শেষবার সাদিয়াকে হাসপাতালে রেখে বাড়ি চলে আসে ইয়াকুব, তিন-চার ঘন্টার মামলা, সাদিয়া একাই পারবে। হাসপাতালের সামনে থেকেই বাস ছাড়ে, একটু হাঁটলেই হয় আর কী!
সাদিয়ার শরীরের যন্ত্রপাতি জানি কেমন, এতো বাচ্চা কেমনে আসে পেটে আল্লাহ জানে।

তিনবার এবরশনের মেডিকেল হিস্ট্রি দেখে ডাক্তার এবার সাদিয়াকে পিল ধরিয়ে এর নিয়ম-কানুন সব বুঝিয়ে বলে দেয়।
এবার আর বাচ্চা আসে না। তবে ইয়াকুবের একটু খুঁত খুঁত লাগে। পিল খেয়ে কেমন মুটিয়ে যাচ্ছে সাদিয়া, বিরক্ত গলায় ‘তোমারে দেখতে তো আমাত্তে বুড়া লাগে। ১৮ বছরের ছোট তুমি আমার। ওজন কমাও’।

সাদিয়া রাতে ভাত খাওয়া বন্ধ করেছে। এতো সামান্য বিষয় নিয়ে ভালো মেয়েরা অশান্তি করে না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 727
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    727
    Shares

লেখাটি ৫,৯৮৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.