ধর্ষণ, পোশাক ও ভিকটিম ব্লেমিং প্রসঙ্গ

মারুফুর রহমান অপু:

ধরুন আপনাকে কেউ গালি দিলো কিংবা আপনার প্রতি কোনো অন্যায় আচরণ করলো, আপনি হয়তো রেগে মেগে বলেই বসলেন, তোকে আমি খুন করে ফেলবো, কিংবা বন্ধু-বান্ধবকে বললেন, আমাকে ছেড়ে দে, ওকে আমি খুন করে ফেলবো!
এমন হয় না? অনেকের ক্ষেত্রেই হয়।

এবার চিন্তা করুন, আসলেই যদি আপনি সুযোগ পান খুব করার তাহলে কি আপনি খুন করতেন? আপনার বন্ধুরা যদি আপনাকে ছেড়ে দিতো, আপনি খুন করতেন?
অধিকাংশেই সেটা করতো না। কিন্তু তারপরেও সমাজে খুন হয়, ঠাণ্ডা মাথায় কিংবা গরম মাথায়। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, একটা অপরাধ করা আর অপরাধের কথা চিন্তা করার মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। দুটোর ক্ষেত্রেই প্রায় কখনওই পরিবেশ পরিস্থিতি একরকম না।

রাস্তায় আকর্ষণীয় সাজ পোষাকে কোনো নারীকে দেখলে অনেক পুরুষই আকৃষ্ট হোন, কারো কারো মনে কাম ভাব জেগে ওঠে, কেউ কেউ শিস দিয়ে উঠতে পারে কিংবা পাশের বন্ধুকে খুঁচিয়ে বলতে পারে, দেখ, দেখ…….এখান থেকে হয়তো সিদ্ধান্ত টানা যেতে পারে পোশাক বা সাজ আসলে অনেককে আকৃষ্ট করতে পারে, তাদের কেউ কেউ হয়তো অযাচিত আচরণ করে ফেলতে পারে, সেটা ইভটিজিং এর পর্যায়েও যেতে পারে, কিন্তু আসলে রেইপ হয় কতটি? যারা রেইপ হয় তাদের সবাই বা বড় অংশই কি এরকম আকর্ষণীয় সাজ পোশাকে থাকে?

এ বছরই বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে একটি প্রদর্শণীর আয়োজন করা হয়েছিলো রেইপ ভিকটিমদের পোশাক নিয়ে। দেখা গেছে সেখানে ৬ বছর বয়সী বাচ্চার ফ্রক থেকে শুরু করে পুলিশের ইউনিফর্ম পর্যন্ত আছে। হরেক রকম পোশাক যা শরীরকে পুরোপুরি ঢাকে কিংবা অধিকাংশই অনাবৃত রাখে।

একই ধরনের একটি প্রজেক্ট হাতে নিয়েছিলেন কলকাতার জেসমিন পাথিজা, নাম I never asked for it, ফেসবুক পেইজ লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/INeverAskForIt/photos/?ref=page_internal
১০ হাজার রেইপ ভিকটিমের পোশাকের ছবি সংগ্রহের প্রচেষ্টা এটি। পেইজটিতে গেলে দেখবেন “উত্তেজক” পোশাক থেকে শুরু করে বোরখা পর্যন্ত বাদ যায়নি। সুতরাং ‘রেইপ এর জন্য পোশাক দায়ী’ এই দাবি আসলে কতটুকু যৌক্তিক?

পোশাকের সাথে রেইপের আসলেই সম্পর্ক আছে কিনা এ নিয়ে গবেষণাও কম হয়নি। গুগলে সার্চ করলেই বহু আর্টিকেল পাবেন। তবে এখানে একটা টুইস্ট আছে। পোশাকের সাথে টিজিং, এট্রাকশন, প্রপোজ, সেক্সুয়াল ইনটেনশন প্রকাশ এগুলোর সম্পর্ক আছে, এমন অনেক আর্টিকেলই পাবেন কিন্তু সরাসরি সেক্সুয়াল অফেন্স বা রেইপ এর সাথে রিলেশন খুজতে গেলেই হিসাব পালটে যায়। দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পোশাকের কোনো ভূমিকা নেই, বরং অপরাধীর মনস্তাত্তিক অবস্থা, পরিবেশ ইত্যাদির অনেক সম্পর্ক আছে।

রেইপ এর কারণ কী কী, এ নিয়েও অনেক গবেষণা আছে, ক্রিমিনালদের বিভিন্ন ইন্টারভিউ নেয়া হয়েছে। এমনকি এমন গবেষণা মানুষ ব্যতিত অন্য প্রাণীতেও করা হয়েছে। দেখা গেছে জোরপূর্বক সেক্স করা এটা বন্য প্রাণীর মাঝেও বিদ্যমান, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর উদ্দেশ্য থাকে সন্তান সৃষ্টি, অতিরিক্ত পুরুষালী বৈশিষ্ট্যের প্রাণীরা একাজে বেশি লিপ্ত হয় সেটিই দেখা যায়।

মানুষের ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন, দেখা যায় যেসব ক্ষেত্রে নারী অবমূল্যায়িত, অর্থাৎ নারীর মাঝে অসহায় ভাব প্রবল, “রেইপ কস্ট” কম অর্থাৎ রেইপ করা হলে ঝামেলা কম হবে, কেউ টের পাবে না, ঘটনাটি সহজে গোপন করা যাবে, পরবর্তী ধরা পড়ার সম্ভাবনা একেবারে কম, মেয়ে নিজেই ভয়ে বলবে না, সেসব ক্ষেত্রেই রেইপ সংগঠিত হচ্ছে। রেপিস্ট এর চারিত্রিক বিশ্লেষণেও দেখা যায়, সাধারণ মানুষের তুলনায় এদের আচরণ ভিন্ন, তাদের মাঝে অপরাধপ্রবণতা বেশি, যদিও তারা সেক্সুয়ালি ডিপ্রাইভড না (অনেকের হয়তো বিবাহিত), তবু তারা কাজটি করে নতুন নতুন সেক্সুয়াল পার্টনার এর খোঁজে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় কাজটি তারা আগেও করেছে। সুতরাং এখানে ভিকটিম নয়, বরং অফেন্ডার এর বৈশিষ্ট্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
এর সপক্ষে বহু আর্টিকেল পাবেন, আদালতের গবেষণা থেকে শুরু করে মনস্তাত্বিকদের গবেষণা পর্যন্ত, কোনটাই পোশাক এর সাথে রেইপ সংগঠনের সরাসরি সম্পর্ক বের করতে পারেনি।

তাহলে ভিকটিম ব্লেমিং আসছে কোথা থেকে? এটি আসলে আমাদের সমাজেই না, সারা বিশ্বেই প্রচলিত। ইউরোপ, আমেরিকা থেকে শুরু করে সৌদি পর্যন্ত। এর পক্ষে অনেকে বলে থাকেন যে রেইপ স্ট্যাটিসটিকসে পশ্চিমা বিশ্ব এগিয়ে, কনজারভেটিভ সমাজের তুলনায় ওদিকে রেইপ এর হার বেশি। আসলে ঘটনা পশ্চিমা সমাজে রিপোর্টিং এর হারও বেশি। অর্থাৎ সেখানে রেইপ হলে ভিকটিম বা প্রতক্ষ্যদর্শী কেউ ব্যাপারটি চাপা রাখেনি, কিন্তু আমাদের মতো কনজারভেটিভ সমাজে এটা কেউ সহজে বলতে চায় না সামাজিক কারণেই। ফলে প্রকৃত সংখ্যাটি কত, সেটি কনজারভেটিভ সমাজে জানাটা কঠিন।

ভিকটিম ব্লেমিং যারা করে এরা আসলে এক ধরনের হীনমন্যতায় ভোগে। আত্মবিশ্বাসী, স্বাবলম্বী আকর্ষণীয় নারীকে নিজের কাছে না পাবার হীনমন্যতা। এমন কাউকে দেখলে সে দূর থেকেই বা মনে মনে আজেবাজে চিন্তা করবে, বড়জোর শিস দেবে দূর থেকে, কিন্তু কাছে যেয়ে তার সাথে কথা বলা কিংবা প্রপোজ করার মতো মানসিক শক্তি এদের কারো নেই। এরা বরং কুঁকড়ে থাকা, নিজেকে অসহায় মনে করা চুপচাপ একা মেয়েদের উপরেই ঝাঁপিয়ে পড়বে সুযোগ পেলে, কারণ তার জানা আছে এতে কোন রিস্ক নেই।

পোশাকের সাথে যে রেইপ এর সম্পর্ক নেই এটা বোঝার জন্য এতো গবেষণাও দরকার নেই, পত্র পত্রিকা খুলেই দেখবেন ১ বছরের শিশুও বাদ যায়নি, এমনকি বাদ যায়নি মাদ্রাসার কিশোর পর্যন্ত!

কিছুদিন আগেই আমার খুব কাছের এক বন্ধু দম্পতি রাস্তায় হাঁটছিলো। মেয়েটি সাধারণ বাঙালি পোশাক পরা, উপরে কামিজ নিচে “পালাজ্জো” যেটি আসলে একটি ঢোলা পাজামা। ছেলেটি একটু এগিয়ে রিকশা ঠিক করতে গেলে পাশ থেকে একজন “ভদ্রলোক” সাজপোশাক দেখে যাদের আমরা হুজুর বলি তিনি মেয়েটিকে শোনালেন, আপা এইসব জামা পরা ঠিক না। বলেই দ্রুত পায়ে সে হেঁটে চলে গেল। এখানেও কি বলবেন পোশাকের দোষ?

ভিকটিম ব্লেমিং একটি জঘন্য অপরাধ আমি মনে করি, এটি রেইপ এর চেয়ে কম নয়। ভিকটিম ব্লেমিং করার অর্থ অপরাধীকে প্রশ্রয় দেয়া, অপরাধী তখন তার অপরাধকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করে। এভাবে যদি আমরা ভিকটিম ব্লেমিং এর মাধ্যমে অপরাধকে জাস্টিফাই করে তাহলে বলতে হয় ৭১ ও তার পূর্ববর্তী সকল যুদ্ধ ও বৈষম্যের জন্য বাংলাদেশই দায়ী ছিলো, বাংলাদেশই তার সম্পদ দিয়ে পাকিস্তানকে প্রলুব্ধ করেছে অপরাধ সংগঠনের, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খলনায়ক হিটালারের কোনো দোষ নাই, কারণ সারা পৃথিবী তাকে প্রলুব্ধ করেছিলো শাসন করার জন্য, ব্রিটিশদের কোন দোষ নাই, ইন্ডিয়া তাকে প্রলুব্ধ করেছিলো ২০০ বছর শাসন করার জন্য, পৃথিবীর কোন খুনির দোষ নাই কেননা ভিকটিম এর কোন না কোন দোষ ছিলো যা খুনিকে প্রলুব্ধ করেছে খুন করায়!

তথ্যসূত্রঃ
১) https://www.huffingtonpost.ca/2018/01/15/what-were-you-wearing-exhibit-brussels_a_23333795/
২) https://www.rand.org/content/dam/rand/pubs/research_reports/RR1000/RR1082/RAND_RR1082.pdf
৩) http://gregdeclue.myakkatech.com/Causes%20of%20Rape.pdf
৪) http://vc.bridgew.edu/cgi/viewcontent.cgi?article=1202&context=jiws
৫) http://journals.sagepub.com/doi/abs/10.1177/1077801207302699
৬) https://link.springer.com/article/10.1186/s40691-017-0101-5#CR53

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.