কী নির্লিপ্ত আমরা!

0

প্রমা ইসরাত:

“আরমানীটোলার এক বাড়িতে দশ-এগারো বছরের স্বাস্থ্যবতী একটি ফুটফুটে মেয়ে— টকটকে ফর্সা গায়ের রঙ। মেয়েটির আগাগোড়া ক্ষত-বিক্ষত হয়ে আছে, সারা গায়ে জমাট বাঁধা রক্ত। কয়েক স্থানে মাংস খুবলে তুলে নেয়া হয়েছে। নরপশুরা মেয়েটিকে ধর্ষণ শেষে দু’দিক থেকে পা ধরে টেনে নাভী পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলেছে………”। (তথ্যসূত্র: একাত্তরের গণহত্যা ও নারী নির্যাতন, আসাদুজ্জামান আসাদ, সময় প্রকাশন)

পাকিস্তানী বর্বর সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ রাতে যে জঘন্য ও হিংস্র গণহত্যা চালিয়েছিল, সেই গণহত্যা ১৯৪২ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর নিধনযজ্ঞের চেয়েও নির্মম আর পাশবিক। বিশ্ব ইতিহাসে নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষের ওপর এমন পাশবিক আক্রমণ চালিয়েও আজও পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে ক্ষমা চায়নি বাংলাদেশের কাছে।

পাকিস্তান বিশ্বাস করে, তারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে কোন ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটায়নি, তারা যা করেছে ঠিক করেছে। তারা এটাই বিশ্বাস করে, এমনকি তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে তারা জানতেও দেয়নি যে তাদের পূর্বজদের হাত লক্ষ লক্ষ নিরস্ত্র, ঘুমন্ত, নিরপরাধ মানুষের রক্তে রাঙানো। উল্টো ভুল তথ্য এবং ভুল ইতিহাসে তারা গড়ে তুলেছে তাদের। অবশ্য পাকিস্তান থেকে আমরা এর চেয়ে বেশি কীইবা আশা করতে পারি!

হ্যাঁ আমরা আশা করতে পারতাম বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকেই। কিন্তু কী করে তা সম্ভব? যে জাতির জিন কোডে মিশে গেছে মীরজাফরের ডিএনএ, সেই জাতির কাছ থেকেও আমরা কিছুই আশা করতে পারি না। নইলে এখনও তাদের মাঝে পাকিস্তানের প্রতি মহব্বত, ‘পেয়ারা পাকিস্তানের’ গেলমান বা হোর হওয়ার বাসনা আমরা দেখতে পেতাম না। হ্যাঁ আর এটাই সবচেয়ে বেশি আমরা দেখতে পাই ক্রিকেটে।

স্বাধীনতা ঘোষণা হওয়ার ৪৭ বছর পরও এই দেশে এখনও এই সত্যটি সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি যে— মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে কোনো রাজনীতি স্বাধীন বাংলাদেশে চলবে না। এখনও জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়নি। এখনও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণার সংখ্যা একেবারেই হাতে গোনা। তাই বিভিন্ন ব্লগে, ওয়েবসাইটে এমনকি প্রকাশিত বইপত্র বা বিভিন্ন ডকুমেন্টারি, সিনেমাতেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানান বিভ্রান্তিকর তথ্য আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসায়িরা গলা পর্যন্ত ব্যবসার টাকায় নিমজ্জিত হয়ে হাঁসফাঁস করছে; আর এদিকে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থী ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী ঢেলে সাজাচ্ছে কী করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে আরও বিকৃত, আরও বিভ্রান্তিকর করা যায়। চক্রান্ত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সত্য ইতিহাসকে একটি মিথে পরিণত করার।

শহরকেন্দ্রিক সভা, সেমিনার, আলোচনা কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে লাল-সবুজ কাপড়ের ফ্যাশন প্রদর্শিত হলেও, দেশের গ্রামগঞ্জের যত আনাচে-কানাচে ওয়াজ মাহফিল পৌঁছে গেছে, ততটা পৌঁছাতে পারেনি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। তাহলে শেষ পর্যন্ত আমরা কি পরিণত হবো একটা শেকড়বিহীন জাতিতে, যার অতীত ইতিহাস কেবলই একটি মিথ?

আমরা কি মাথানত করবো সেইসব অশুভ শক্তির কাছে, যারা দেশের গণতন্ত্রকে হারাম ঘোষণা করে, যারা নারীর অধিকার, সাম্য ও মানবিক মর্যাদার বিপক্ষে, যারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে অস্বীকার করে, পদে পদে অবমাননা করে জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকাকে?
আমরা কি এখনও বিচ্ছিন্ন থাকবো?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 122
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    122
    Shares

লেখাটি ৫৪৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.