লাল-সবুজের জমিনে শুয়ে আছে আমার মেয়ে

সুপ্রীতি ধর:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কাবেরী গায়েন তার ফেসবুক টাইমলাইনে একটি ছবি শেয়ার করে লিখেছেন, “প্রথমে ধর্ষিত এবং তারপরে লাশ হয়ে যাওয়া একটি মেয়ের ছবি ফেসবুকে ঘুরছে। আমি সত্যিই প্রথমে দেখতে চাইনি। ঠিক বাংলাদেশের পতাকা যেনো। সবুজ জমিনে লাল বৃত্ত। এই ছবির পাশে যে বর্ণ্না পাওয়া যাচ্ছে, তাহলো:

‘বিউটি আক্তারকে ধর্ষণের পর খুন করে হাওরের পাশে ফেলে রাখা হয়। এর মাস দুয়েক আগেও তাকে ধর্ষণ করা হয়। বিউটির বাবা সায়েদ আলী হবিগঞ্জ আদালতে মেয়ের ধর্ষণের বিচার চেয়ে মামলাও করেন ব্রাহ্মণডোরা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান সংরক্ষিত মহিলা আসনের মেম্বার কমল চান ও তার পুত্র কবিরসহ তিনজনকে আসামী করে। কিন্তু গ্রাম্য মাতব্বর ও ক্ষমতাসীনদের প্রভাবে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি সেই সময়ে। কয়েকদিন পরে বিউটি আবার নিখোঁজ হয়। বিউটিকে ফের ধর্ষণ করা হয়, তবে এবারে তাকে আর বাঁচিয়ে রাখা হয়নি। ধর্ষণের পরে খুন করে তাকে হাওরের পাশে ফেলে রেখে যাওয়া হয়। পুলিশ এবারও কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।

মাত্র ১৬ বছরের এই কিশোরী মেয়েটি শুয়ে আছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের সবুজ জমিনে লাল বিউটি শুয়ে আছে।’
আজ ৪৭তম স্বাধীনতা দিবস পালন করা হলো।
বাংলাদেশ কি শুনতে পাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছে?
দু’বছর আগে লিখেছিলাম ‘ধর্ষণ কি অপ্রতিরোধ্য?’ প্রশ্নটি ফের করছি দেশের মানুষের কাছে।”

ওদিকে স্বপ্না রেজা লিখেছেন, “সবুজের ভেতর একটুকরো লাল!
আজ সারাদিন লালসবুজের পতাকা দেখেছি। সকলের পরনে ছিল লাল-সবুজ। নিজেও পরেছিলাম লালসবুজ। শুধু পোশাক নয়, সকলের কন্ঠও ছিল লালসবুজে আপ্লুত। খুবই স্বাভাবিক।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরাঘুরি করা এই ছবিটাও লাল সবুজ। এই লালসবুজ থেকে চোখ সরাতে পারলাম না। কী সাংঘাতিক ! কী সস্তা নারীর জীবন! লালের ব্যবহার এখানে কী পাশবিক! নির্মম! এই ছবি যদি সত্যি হয়, তাহলে যে লালের রঙ ধূসর হবে! মলিন হবে! সবুজের ভেতর লাল খুঁজে পাব কি করে আমরা?
মেয়েটিকে দ্বিতীয়বার ধর্ষণের পর হত্যা করে এভাবে সবুজের বুকে ফেলে দিয়েছে”!

সতীর্থ বিলকিস ওয়াজি ঝিনুক লিখেছেন, “এমন একটা পরিস্থিতি দিয়ে যাচ্ছি, কেউ মুখ ফুটে কিছু বলতে ভয় পায়। কেমন একটা ভ্যাপসা অবস্থা। কার কাছে বলবে, কাকে বলবে, কাকে বলে কোন বিপদে পড়বে, আর কেনোই বা বলবে !!! এতো কেনো কেনো করতে করতে মূল বিষয়টা পত্রিকার হেডলাইন থেকে আস্তে আস্তে শেষপাতা, শেষপাতা থেকে একসময় গায়েব।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে এই পরিমাণ খারাপ, কেউ জেনেও জানে না, জানলেওবা কী? একটা শ্রেণির চাটুকারিতায় সমস্ত কিছু ডুবে আছে। দেশের সুজন বলেন, আর সৃজন বলেন, সব শীল মানুষদের চোখে এখন টিনের চশমা।
আজকে একটা স্বাধীনতা দিবস, সবাই একে ওকে শুভেচ্ছা দিয়ে বেড়াচ্ছে। আমার শুভেচ্ছা নেয়ারও রুচি নাই, দেয়ারও নাই। নিচের মেয়েটার পড়ে থাকা ছবি অনেক কিছু বলে দেয়। স্বাধীনতা বলেন আর শালীনতা বলেন সব এখন পোশাকী….
কোনো কিছুতে টেষ্ট পাই না…..”।

ঝিনুকের এই কথাগুলোই মনে মনে আওড়াচ্ছিলাম। সারাদিন ধরে নিউজফিডে ঘুরে বেড়ানো এই ছবিটা শান্তি দিচ্ছিল না। ও তো আমারই মেয়ে, আমাদের মেয়ে। লাল-সবুজ পতাকার দেশের মেয়ে। ও কেন এভাবে পড়ে থাকবে? ও তো স্বাধীন দেশেরই মেয়ে ছিল, ছিল না? তাহলে??

কী লিখবো, কী লিখবো করে ঘরময় পায়চারি করছি, আর ভাবছি মেয়েটির কথা। এখন সে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এখন সে স্বাধীন। আজকের দিনে মেয়েটিই আমাদের চরম উপহার। আরও বিউটি লাশ হবে প্রতিদিন, ওরাও এভাবে শুয়ে থাকবে সবুজ জমিনে, আমাদের লাল-সবুজ পতাকা হয়ে, এর তো কোনো শেষ নেই।

আর আমরাও স্বাধীনতা এনেছি, স্বাধীনতা রাখবো বলে চেঁচাতে থাকবো, উন্নয়নশীল দেশের তকমা জুটেছে দেশের কপালে, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছি আমরা, মোল্লারা সব দুয়ারের চাবিকাঠি নিয়ে আমাদের ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে।
স্বপ্ন তো আমরাই দেখবো, তাই না? যেমন একশ্রেণির মানুষ পুরো দেশটা লুটেপুটে খেয়ে এখন তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে, আরেক শ্রেণি তাদের ধর্মোন্মদনার আফিম খাওয়াচ্ছে দেশের সবাইকে, অনিয়ম আর অবিচার যখন নৈমিত্তিক, তখন সাধারণরা, যাদের সুযোগ আছে, তারা পালাচ্ছে দেশ ছেড়ে, আর শূন্যস্থান পূরণ করে নিচ্ছে পুরনো শকুনেরা।

যে দেশে সাধারণের ভাগ্য শিকেয় উঠে, নারীর নিরাপত্তা বলে কোনো শব্দ অভিধানে থাকে না, শিশু-কিশোরী-তরুণীরা এভাবে পড়ে থাকে লাশ হয়ে, উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ উড়াল সেতুতে ঝুলে থাকে ভাগ্যবিড়ম্বিত শিক্ষকের লাশ, সেই দেশ কি সত্যিই উন্নয়নশীল?

কী বলেন তনু, আফসানা, রিশা, রূপা, পূজা এবং এই বিউটিসহ শত শত মেয়ের মা-বাবারা? তারা কি চেয়েছিলেন এমন উন্নয়ন?

শেয়ার করুন:
  • 287
  •  
  •  
  •  
  •  
    287
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.