ছবি কথা বলে

0

মুসকান ইউহানা:

বিপুদের বাড়িটার কথা মনে পড়ে গেল।
এইরকম একটা পুরনো বাড়িতে ওরা থাকতো।
তখন আমি টেইনে পড়ি।
আমাদের স্কুল থেকে ব্যাচ করে ছাত্র পড়াতো এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে।
স্কুলের কাছেই ওদের বাড়ি হওয়াতে ওদের বাসায় পড়ানো হতো।

বাড়িটাও ছিল বিশাল। বড় বড় কামরা। সব পুরনো আমলের জিনিস।
বাড়িটা আসলে হিন্দু জমিদারের ছিল। একাত্তরে দেশ স্বাধীনের সময় তারা বাড়ি ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন।
যুদ্ধের পরে পরিত্যক্ত বাড়িতে ভূমিহীনরা বাস করতো।
নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলে এমন অনেক পুরনো বাড়ির এখনো দেখা যায়।

আমিও বিপুদের সে পুরনো বাড়িতে পড়তে যেতাম।
এত ভাল লাগত। সব পুরনো, দেয়ালের ইটগুলোও পুরনো। ঘরের আসবাবপত্র গুলোও পুরনো ধাচের।
যতগরমই পড়ুক কখনো ওদের বাড়িতে গরম লাগেনি আমার।
বিপুর মা আন্টি ছিলেন খুব সৌখিন। সবসময় পরিপাটি থাকতেন। সব গোছালো তার।
দারুণ রান্না পারতেন, তার হাতের আচার যেন অমৃত।
আন্টির শখ ছিল সেলাই করা, গাছ লাগানো।
এমনিই পুরনো বাড়ি জুড়ে গাছ ছিল। দেয়ালের ইটের ফাক দিয়ে পাখির ফেলে যাওয়া বিচি থেকে গাছ জন্মাত।
তারপর আবার তিনি নিজেও গাছ লাগাতেন। ঘরের কত কোণে যে হরেক রকম পাতাবাহার লাগাতেন!
খুব পছন্দ করতেন ফুল।
শিউলি, বেলী, হাসনাহেনা, বকুল, গন্ধরাজ এরকম ফুলের গাছ দিয়ে বাড়ির কোনগুলো ভরে রেখেছিলেন।
বেলী ফুলের গাছটা বুনেছিলেন একেবারে জানালার পাশে যেখানে আমি রোজ পড়তে গেলে বসতাম।

দুই ছেলে উনার। মেয়ে নেই।
ছোটটার নাম বিপু।
আমি ও বিপু এক ক্লাসেই পড়তাম। কিন্তু ছেলেমেয়ে আলাদা ক্লাস হতো তাই ছেলেদের সাথে মেয়েদের কখনো যোগাযোগের সুযোগ ছিল না।
সে সিস্টেমটাই ভালো ছিল এখন মনে হয়।
স্কুলের ব্যাচ ছেলেমেয়ে একসাথেই করা হলো।
আমাদের ব্যাচে আমরা প্রায় পনেরো জন একসাথে পড়তাম।
বিপুদের বাসায় ম্যাডাম গিয়ে পড়াতেন।

সবই ঠিক ছিল।
সমস্যা বাঁধালো বিপু।
কয়েক মাস যাওয়ার পর বিপুর আচরণ অদ্ভুত ভাবে পরিবর্তন হতে লাগলো।
এমনিতে ও খুব মেধাবী। আমার চেয়ে ভালো স্টুডেন্ট।
ওর সব ঠিক আছে। হৈ চৈ করছে। পড়তে বসে বন্ধুদের সাথে হাসিঠাট্টাও করছে, কিন্তু যেই আমি পড়ার ঘরে ঢুকেছি, অমনি ও মুহূর্তের মধ্যে বেলুনের মতো চুপসে যেতো।
মুহূর্তেই এটি ঘটতো।

এরপর যতক্ষণ আমি ব্যাচে পড়তাম ও একবারও মাথা তুলে উপরে তাকাতো না।
নিচের দিকে তাকিয়ে থাকতো, অথবা লজ্জায় লাল হয়ে থাকতো ঠিক বোঝা যেতো না।
কারণ কালো ছিল তো!

ওর এই আচরণ একে একে সবার চোখে পড়লো।
সবাই অদ্ভুত ভাবে বুঝে গেল ও আমার ব্যাপারে দুর্বল।
আমি প্রথমে বুঝিনি পরে সবার টিপ্পনীতে ব্যাপারটা ক্লিয়ার হলো।

হঠাৎ করে বিপুকে ভালোলাগার চোখে মাপতে গেলাম।
উহু, সাথে সাথে মেজাজ খারাপ হয়ে গেল।
এমন গাধাকে ভালো লাগানো যায়!
গাধাটার এই অদ্ভুত আচরণ আরও বেশী মেজাজ বিগড়ে দিত। অথচ বিপুর মাকে আমার খুব ভালো লাগতো। এখনও ভালো লাগে। তার মতো রুচিশীল মহিলা আমি কমই দেখেছি।
সেই মহিলার ঘরে কিনা এমন গর্দভ ছেলে।

আমি প্রায়ই সব শেষে ঘর থেকে বেরুতাম, দেখি গাধাটা কিছু বলে কিনা! আমি ওর কথার উত্তরগুলো ধারালোভাবে তৈরি করে রেখেছিলাম যেন কখনো কিছু বললে ছিলে দিতে পারি।
কিন্তু ও কিছুই বলতো না, সেরকম একলা ঘরেও মাথা নিচু করে থাকতো।
আমি যখন চলে আসতাম, আমি পেছনে না তাকিয়েও বুঝতাম ও মাথা তুলে আমার চলে যাওয়াটা দেখছে।

বেলী ফুলের প্রতি ভালো লাগাটাও ওদের বাড়ি থেকে তৈরি হয়েছিল আমার।
গাছগুলোর যত্ন ওরা মা ছেলে করতো।
ম্যাডাম বুঝতে পারলেন ব্যাচে বিপুর কিছুই পড়া হয় না।
ও আমার উপস্থিতিতে পড়তে পারে না। নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত থাকে।
তারপর আমাদের ব্যাচ আলাদা করে দিলেন।

দুজন দুই ব্যাচে পড়তাম।
তবে ওদের বাড়িতেই পড়তাম।
আমি ওকে দেখতে পেতাম না, জানতাম ও আমাকে ঠিক দেখে কোন না কোনভাবে।
কোন একটা কারণে সপ্তাহ খানেক পড়তে যাইনি।
এক বিকেলে দেখি বিপু আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে অনেকক্ষণ।
জানালা দিয়ে দেখে মনে মনে ঠিক করলাম, আজ ওর কলার ধরে টেনে বাড়িতে নিয়ে আসবো। আর একটা চড় দিয়ে জিজ্ঞেস করবো ও এমন এবনরমাল হলো কবে থেকে!

সত্যিই ওর সামনে গিয়ে কলারটা চেপে ধরলাম।
“বিপু শোন্ ”
বলতে না বলতে ও এমন দৌড় দিল!
এরপর থেকে আর আমার বাড়ির কাছে ওকে আমার চোখে পড়েনি।

পরীক্ষা রেজাল্ট বের হয়েছে।
যে বিপুর A+ পাওয়ার কথা সেখানে ও পেয়েছে B গ্রেড। তবু ওর মা খুশি ছেলে তো শেষ পর্যন্ত পাশ করেছে!

গল্পটা এটুকু হলেই ভালো লাগতো।

কিন্তু নিয়তি এর সমাপ্তি দিল অন্যরকম করে।
শান্তশিষ্ট, বন্ধুবৎসল বিপুর খেলাতে খুব আগ্রহ ছিল। এক পহেলা বৈশাখে খেলার মাঠে ঝগড়ার সময় প্রতিপক্ষের ধারালো চাকুর আঘাতে বিপু খুন হয়ে যায়।
ওর লাশ আসে সেই পুরনো বাড়িতে যেখানে ওরা থাকে।
সবাই ছুটে যায় সেখানে।

আমিও পহেলা বৈশাখে পরা লাল সাদা শাড়ি পরেই ছুটে যাই ওদের বাড়িতে ওকে দেখতে।
সব ঠিক আগের মতোই ছিল। বেলী গাছ, বকুল হাসনাহেনা সব….
শুধু হাহাকার করছিল বিপুর মা।
আর আমি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছিলাম
কৈশোরের আমার মৃত প্রেমকে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 76
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    76
    Shares

লেখাটি ৫৯৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.