এটাও আরেক ২৫শে মার্চ, এবং গণহত্যা …

কুঙ্গ থাঙ:

চারদিকে দৌড়-ঝাঁপ। সবাই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে এদিক-ওদিক ছুটছে। রাইফেলের ঠা-ঠা-ঠা-ঠা আওয়াজ। প্রাণভয়ে পালাচ্ছে মানুষ। সবার মনে একটাই চিন্তা, প্রাণ বাঁচাতে হবে আগে, পরিবারের সবাইকে নিয়ে মাচা ছেড়ে পালাতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ে। পালাচ্ছে….. জুম্মরা পালাচ্ছে… যে যেভাবে পারে নিজের সহায় সম্বল যা আছে কাঁধে করে পালাচ্ছে। কারো কাঁধে চালের বস্তা, কারো মাথায় কাপড়ের পোটলা, কারো হাতে থালা-বাসন…. সবাই ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।

কিন্তু……এই গর্ভবতী নারী যিনি একা পড়ে আছেন বাড়িতে তিনি কী করবেন? বাড়ির লোকজন কাজে বের হয়েছে সেই সকালে। শ্বশুর গেছেন আর্মি অফিসারের ডাকা এক মিটিংয়ে। স্বামী পেশায় শিক্ষক, তার এখন স্কুলে থাকার কথা…. বাকিরা কে কোথায়, কে জানে!

আবারও গুলির শব্দ… চিৎকার হৈচৈ এর আওয়াজ। গর্ভবতী নারীটি আতঙ্কিত, ভয়ার্ত…কী করবেন বুঝতে পারছেন না। … আজ আবার কী হলো? কেউ এসে একটা খবর দিয়ে যেতে পারে না? কী হচ্ছে এখানে? থর থর শরীর কেঁপে উঠছে তার… রক্ত হিম হয়ে আসছে। কী করছে আমার স্বামী? আমার শ্বশুর? বাড়ির অন্য সদস্যরা?

এবারে হাউ-মাউ করে কান্না শুরু করে দিলেন তিনি। চিৎকার করে পাশের বাড়ির প্রতিবেশীকে ডাকলেন…

অয়্যুশি…অয়্যুশি…অয়্যুশি…. সাড়া মিলছে না! অসু জামা হিংগাইতেলে? জু লেগাইলিলে? নবঃ পঃতেগা! জালে ফ্রঃরে? (কে কোথায় আছো? কোথায় গেলো সবাই? বন্দুকের আওয়াজ কেন! কী হয়েছে?)

হঠাৎ দেখা গেল দৌড়ে আসছে তার ছোট ভাই থুইমং। চিৎকার করতে করতে বলছে, দিদি পালাও। প্রত্যেক জুম্ম ঘরে একজন আর্মি আর দুইজন বঙ্গাল দা হাতে নিয়ে ঢুকেছে। ঘর পুড়িয়ে দিচ্ছে… আর্মি গুলি করছে …আর হাতে দা নিয়ে বঙ্গালরা কোপাচ্ছে।

নারীটি এবার বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। বিড়বিড় করতে করতে বললেন, এগুলো কী বলিস তুই? আমার শ্বশুর- শাশুড়িকে ফেলে কীভাবে যাই? আমার স্বামী? ছোট ভাইটি ধমক লাগায় … এখন না দিদি, সবাই পালাচ্ছে। এসব ভাবার সময় না এখন। তাড়াতাড়ি চলো। তাড়াতাড়ি চলো। …নারীটি যখন উঠে দাঁড়ালেন, ঠিক তখনই ডাক দেয় পাশের ঘরের প্রতিবেশি উক্রা… অয়্যুশি আর্মি তয়ঃ নবঃ রব্যা ঙাগো খঃরে। জা..প্যাংফুলে অয়্যুশি? (আর্মি বন্দুক তাক করে আমায় ডাকছে, কী করবো আমি?)

গর্ভবতী ক্ষীণকন্ঠে উত্তর দেন….শিঃখ্যাংগেঃ শিঃ অয়্যুশি। লেঃ….ইদু শাঃলাই। ইং নঃকা লাইংঘ সাঃপ্যা ব্রিঘাইমে ব্যঃ। (মরলে মরবো…এই নিচে আসো…বাড়ির পেছনে রাস্তা দিয়ে পালাই)

এই সেই ঊনিশশো আশি সাল…. পঁচিশে মার্চ… হায় এই রাতে নাকি পাকিস্তানী মিলিটারিরাও রাতের অন্ধকারে নিরীহ মানুষ হত্যা করেছিল! রাঙ্গামাটির কাউখালীতে রাষ্ট্রীয় মদদে এই দেশের মিলিটারি আর বঙ্গালরা মিলে তেমনই এক নিষ্ঠুর ও বর্বরোচিত গণহত্যা চালিয়েছিল সেদিন। বৌদ্ধ বিহার সংস্কারের জন্য নিরীহ পাহাড়িদের ডেকে এনে একত্র করা হয়েছিল, তারপর নৃশংস কায়দায় ব্রাশ ফায়ার করে তাদের মেরে ফেলা হয়েছিল। তারপর পাহাড়ি পল্লীতে তাণ্ডব চালানোর জন্য লেলিয়ে দেয়া হয়েছিল সেটলারদের।

সেই কাউখালী….কাউখালী বাজার….রাঙ্গীপাড়া… কলমপতি… যেখানে আজ কেবল সেটেলার আর আর্মি ক্যাম্প…. আজ নীরবে শুধু কান্না করে হয়তো বা বলবে কোথায় আমার জুম্ম গ্রাম তংব পাড়া?? কোথায় চাকমা পাড়া?? কোথায় আমার অরুঃ কইং।।আমি যে এই সেটেলার বঙ্গালের ভার বহন করতে পারছি না…!!

সীমাহীন আতংকের, বিভীষিকাময় ঘটনাটি এইখানে শেষ করলাম।। পরের ধারাবাহিক ঘটনাগুলো সহজেই অনুমানযোগ্য কিংবা ওগুলো সহজ ধাঁধাঁ হিসাবে রেখে দেই। কেননা তারপর থেকে এই পাহাড়ে কতবার এরকম অসংখ্য… অজস্র ঘটনা… এই ভূগোলের ভালো মানুষদের অগোচরে ঘটে গেছে তার সীমা-সংখ্যা নেই। কত সহস্র হৃদয়বিদারক নিষ্ঠুরতার ইতিহাস লুকিয়ে আছে ঐ অন্ধকার ঘরের কোণগুলোতে। জং ধরে গেছে…মরিচা পড়ে গেছে…. জঙ্গলের ঝোপঝাড়ে পড়ে আছে। তবে আমরা দেরি করে ফেলেছি ঐ ঘটনাগুলো এই প্রজন্মকে জানাতে, অথবা হয়তো সে সুযোগ ছিল না।

এই বঙ্গ সমাজ দর্পনে কেবল বৈষম্যই প্রতিবিম্বিত। আজ সেইসব ঘটনা… উনিশশো আশি থেকে দুই হাজার আঠারো… সেই পানছড়ি.. লংগদু… লোগাং…নানিয়াচরের উচ্ছেদ গণহত্যা, লুন্ঠন, গণধর্ষণের কথা মনে হলে নিজেকে পৃথিবীর অসহায়তম জীব মনে হয়। এই রাষ্ট্রের বড় মুণ্ডুওয়ালা নিচুমন চতুর বঙ্গালরা এই ইতিহাস-ঘটনাগুলোকে কখনো সরল পথে চলতে দেবে না। দুই পা এগিয়ে নিয়ে আমাদের তিন পা পিছিয়ে দিবে।

এই প্রজন্ম কি পারবে প্রগতিশীল শক্তিদের সবসময় সজাগ রাখতে? পারবে কি প্রতিক্রিয়াশীলতাকে রুখে দিতে? কখনও কি আসবে সেই সেই মসৃণ দিন? নাকি এই রাষ্ট্র, সেই দানব জলপাই বুট… সেই সেটেলার বঙ্গাল….আরও নির্মম, আরও বিধ্বংসী হয়ে সময়ের কালের স্রোতে আমাদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে দেবে?

___________________________________________
[‘উথেন জুম্ম’ এর বয়ান থেকে অনুলিখিত ]

পটভূমি: ১৯৮০ সালের ২৫ মার্চ তারিখে রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার কলমপতি ইউনিয়নে রাষ্ট্রীয় মদদে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর সেটেলার দ্বারা এক বর্বরতম গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিলো। এদিন সেনা কর্মকর্তারা বৌদ্ধ বিহার সংস্কারের জন্য পাহাড়িদের ডেকে এনে নৃশংসভাবে ব্রাশ ফায়ার করে এবং সেটলারদের লেলিয়ে দেয়। সেনা ও সেটলারের হামলায় এ হত্যাকাণ্ডে ৩০০-এর অধিক নিরীহ পাহাড়ি প্রাণ হারায়। আহত হয় শত শত । নিকটস্থ বৌদ্ধ বিহারে হামলা করে ভিক্ষুকেও গুরুতর জখম করে এবং পুরো এলাকা তাণ্ডব-লুটপাট চালায়।

হাজারের অধিক লোকজন বিভিন্ন এলাকায় এবং এমনকি ভারতে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ রক্ষার চেষ্টা করে। হাজার একরের অধিক জায়গা-জমি-বসতভিটে সেটলাররা জুম্ম জনগণের কাছ থেকে কেড়ে নেয়। সেই কাউখালী এলাকা যা একসময় জুম্ম জনগণের ছিলো তাতে সেটলাররা জনপদ গড়ে তুলে। কাউখালী হত্যাযজ্ঞ নিয়ে সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল অথবা এন্টি স্লেভারি সোসাইটি তৎকালীন সময়ে একটি রিপোর্ট করেছিলো।

কাউখালী হত্যাযজ্ঞ নিয়ে তদন্ত করার জন্য সরকারী তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছিলো বলে জানা যায়। কিন্তু সেই রিপোর্ট হয়তো করাই হয়নি অথবা তা আলোর মুখ দেখেনি। তবে কাউখালী হত্যাযজ্ঞের প্রায় একমাস পর ২২শে এপ্রিল (১৯৮০) বিরোধী দলীয় তিন সংসদ সদস্য শাহজাহান সিরাজ(জাসদ), উপেন্দ্র লাল চাকমা(জাসদ) ও রাশেদ খান মেনন(ওয়ার্কাস পার্টি) ঘটনা সরেজমিন তদন্ত করতে কলমপতি যান। ঢাকায় ফিরে ২৫ এপ্রিল (১৯৮০) তারা এক সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন। এতে তারা জানান, “নৃংশস ঘটনাবলীর খবর সম্পূর্ণ সত্য। ২৫ মার্চ সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে তিনশ পাহাড়ি নিহত ও সহস্রাধিক নিঁখোজ হয়েছে।”

শেয়ার করুন:
  • 440
  •  
  •  
  •  
  •  
    440
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.