আহা, সব যদি এভাবেই উল্টে যেত!

0

শামিম আল মামুন:

(যদি এমন হতো, যদি প্রকৃতি পুরুষদের গর্ভধারণের ক্ষমতা দিতো, সী-হর্সদের মতো)

১) দেখ দেখ, উত্তেজিত কণ্ঠে মেনকা বললো বাকি মেয়েদের। ছেলেটার অবস্থা দেখেছিস, খবরই নেই শার্টের বোতাম খুলে গেছে জানেই না, বুকের লোম দেখা যাচ্ছে। ওরা চারজন বরাবর এর মতই মোড়ের দোকানের সামনে আড্ডা দিচ্ছিলো। তখনই এই ঘটনাটা দেখতে পেয়েছে ওরা।

না না না, এটা মেনে নেয়া যায় না, দেখেছো ছেলেটা কীভাবে শার্টের বোতাম খুলে ঘুরছে। কী অসভ্য ছেলেরে বাবা, ছেলেদের মান-ইজ্জত নষ্ট করে ফেলবে। আমাদের একটা সামাজিক দায়িত্ব আছে না! এই ছেলেটাকে ভালোভাবে শিক্ষা দিতে হবে। রম্ভা খুব জোরে শিস্ দিয়ে উঠলো।

ছেলেটা চমকে উঠে তাকাতেই রম্ভা নিজের বুকের খোলা উপত্যকার দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলো, তারপর আঙ্গুল লম্বা করে ছেলেটার বুকের দিকে ইশারা করলো। ছেলেটা নিজের বুকের দিকে তাকিয়েই জমে গেলো, কারণ উপরের বোতামটা খোলা। রম্ভা এতো অল্পতেই ছেড়ে দেবার মেয়ে নয়। তাই জিহ্বা বের করে চাটুনির ভঙ্গি করতেই – ছেলেটা আধা-দৌড়-পায়ে দ্রুত চলে গেল এবং দুই হাত শার্টের বোতাম লাগাতে ব্যস্ত। ওদিকে হাত উঁচিয়ে খক খক করে হাসছিলো ওরা সবাই। ওরা চার ঘনিষ্ট বন্ধু রম্ভা, উর্বশী, মেনকা ও তিলোত্তমা। তিলোত্তমা বললো, ভালো শিক্ষা দেয়া হয়েছে ছেলেটাকে। পরের শিকারের আশায় চোখ খোলা রেখে আড্ডা দিতে থাকলো ওরা চারজন।

২) ইশ কেন যে এমন হলো! বাবা সব সবসময়ই বলে, বাইরে যখন যাবি একটু খেয়াল করে কাপড় চোপড় পরবি। দেখবি শার্টের বোতাম যেন গলা পর্যন্ত লাগানো থাকে। মনে রাখবি তোর বুকের লোম যদি দেখা যায়, তবে ইজ্জত শেষ। ছোট বোনটার এমন মুখ কাটা – ফট করে বলে ফেললো, বাবা বুকের লোম তো শরীরেই একটা অংশ, তাহলে হাত বা মুখ দেখানোতে ইজ্জত শেষ না হলে বুকের লোম দেখা গেলে ইজ্জত কেন শেষ হবে!

বাবা, নরমভাবে হেসে বললো, যা পাগলি তুই এসব বুঝবি না। যদিও ছোট বোনের কথায় যুক্তি আছে, কিন্তু লালন জানে, এই নিয়মগুলো শত শত বছর ধরে চলে আসছে। ছেলেদের জন্মই হয়েছে ঘর সংসার করার জন্য, বউ সেবা, রান্না-বাড়া-সন্তান মানুষ করে তোলা এটাই তাদের জীবনের উদ্দেশ্য। নিজের শরীরকে সব সময় ঢেকে রাখতে হয়, নইলে বদনাম হবে।

এছাড়াও বলা যায় না কোনও বদ মেয়ের নজরে পরে গেলে ওরা জীবন অতিষ্ঠ করে দেবে। এইতো কিছুদিন আ্গেই ঐ মোড়েই সাব্বিরকে কিরকম নাজেহাল করেছিলো ঐ গুণ্ডা মেয়েদের দলটা। সাব্বিরের মা কাজ থেকে ফিরে এসে এতোটাই রেগে গিয়েছিলেন, পুলিশ পর্যন্ত ডেকে এনেছিলেন। সব শুনে পুলিশের দারোগা বললেন, আরে ম্যাডাম এতে এতো রাগার কী আছে, মেয়েরা বড় হয়ে উঠছে, ওরা একটু-আধটু দুষ্টামি ফাজলামি তো করবেই। কান না দিলেই হয়, আচ্ছা ঠিক আছে আমি বলে দেবো আর যেন উত্যক্ত না করে।

ঐ বদমাইশ মেয়েগুলো সব সময়ই মোড়েই থাকে, ছেলেদের দ্যাখে নানা রকম কটূক্তি করে। কবে যে এরা যাবে সে আশায় স্রষ্টার নাম ডাকতে ডাকতে বাসায় গেলো লালন। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো আজ থেকেই আবেয়া পরবে, বাবা’র পুরনো একটা দিয়েই শুরু করলেই হবে। বাবাও খুব খুশি হবে।

৩) ওর বিয়ে হয়ে গেছে দুই বছর আগে। ওর বউটা খুব ভালো, লেখাপড়া জানা উন্নত মনের মানুষ। বলেছে লালনের মাস্টার্সে এতো ভাল রেজাল্ট, সুতরাং লালন যদি চাকরি বাকরি করতে চায়, তবে তার আপত্তি নেই। ওর বউয়ের নাম পুরুবা রেহমান, মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির অপারেশনস ম্যানেজার, ভালো কামাই এবং মনটাও ভালো। লালনকে যথেষ্ট আদর যত্ন করে, মাঝে মাঝেই দুপুরে ফোন করে বলে, সুইটি, আজ সন্ধ্যায় রান্না করো না, বাইরে খেতে যাবো। তবে পুরুবার বাবাটা এমন দজ্জাল, লালনকে দু’চোখে দেখতে পারে না। বিয়ের পর পুরুবা নিজেই থেকেই একটা আলাদা ফ্ল্যাট কিনেছে, কিন্তু ওর বাবার ধারণা, লালন বুদ্ধি দিয়ে মেয়েকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কথাটা মিথ্যা পুরুবা জানে, শুধু বলেছে, মুরুব্বি মানুষ বাদ দাও।

আজ ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে আসতে পারেনি, কোথাও কোনো একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে, তাই রাস্তা বন্ধ। মতিঝিল থেকে বাসায় ট্যাক্সিতে গেলে অনেকগুলো টাকা চলে যাবে। অনেক চিন্তা ভাবনা করে লালন পাবলিক বাসে উঠলো, ইউনিভার্সিটি জীবনের পরে আজ প্রথম বাসে ওঠা। বাস চলছে, হঠাৎ একটা অনাহুত স্পর্শে চমকে উঠলো লালন, একটা অদৃশ্য হাত এসে ওর কোমরের কাছাকাছি স্পর্শ করেছে। আরও চমকে উঠলো, যখন বুঝলো হাতটা আস্তে আস্তে নিচের দিকে নামছে।

খুব ঘাবড়ে গেল লালন, একদিকে অস্বস্তি, অন্যদিকে ভয়, নিজেকে খুব বকলো, কেন যে পাবলিক বাসে উঠলাম। ট্যাক্সি নিয়ে গেলেই হতো। ওমা হাতটা আরও নিচের দিকে নামছে। চট করে পাশ ঘুরে গেল লালন, চোখাচোখি হয়ে গেল ওর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে। লম্বা চুল, খুব ফর্সা, টকটকে লাল লিপস্টিক দেয়া ঠোঁট। এরকম একটা সুন্দর মেয়ে এমন একটা অসভ্যতা করতে পারে লালনের বিশ্বাসই হচ্ছিলো না।
একটা চোখ টিপ দিলো, তারপর ঠোঁট দিয়ে চুমু’র ভঙ্গি করলো মেয়েটা, ঘৃণায় গা শির শির করে উঠলো লালনের, কেমন অসভ্য চক্ষুলজ্জাও নেই। পাশে বসে থাকা একটা মুরুব্বি গোছের মেয়েকে বললো, দেখেছেন আপু এই মহিলাটা কেমন অসভ্যতামি করছে, আমার গায়ে হাত দিয়েছে! মহিলাটা খুব ভালো ছিল, জোরে এক ধমক দিয়ে লাল লিপস্টিকধারীকে শাসিয়ে দিলো। বললো, ভাই, আপনি আমার সিটে বসে পরুন, আমি সামনেই নামবো।

৫) রাত ঠিক সাড়ে তিনটায় লালনের ব্যাথা উঠলো। পুরুবা একলাফে উঠেই ফোন করে করলো ড্রাইভারকে, তারপর সোজা শমরিতা হাসপাতাল। প্রতি তিন মিনিট পর পর ব্যথার সুনামি যেন লালনের শরীরের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিলো। ডঃ ফিলিপ এখানে কাজ করেন। বিদেশি মানুষ খুব ভালো গাইনি’র ডাক্তার, উনি রুমে এসে নার্সদের জিজ্ঞাসা করলেন, কী অবস্থা! তারপর লালনকে পরীক্ষা করে বললেন, হুম আট সেন্টিমিটার, গুড গুড। পুরুবা একটু পর পর পানি, অরেঞ্জ জুস এগিয়ে দিচ্ছে। ব্যথার ফাঁকে ফাঁকে পুরুবার দিকে তাকিয়ে খুব কষ্ট হচ্ছে লালনের, কী অসহার মুখ বানিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে বউটা।

আবারও তীব্র ব্যাথায় সারা দুনিয়া নীল হয় উঠলো লালনের।

ঠিক এই সময়ই স্বপ্ন ভেঙ্গে গেলো লালনের, সারা গায়ে ঘাম, নিঃশব্দে শরীরে নিচের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো একটু পরীক্ষা করলো। ফিক করে হেসে ফেললো, কী স্বপ্নরে বাবা। তারপর ছেলে হবার ভাগ্যে খুশি হয়ে আবারও ঘুমুতে গেলো।

লালন দুঃস্বপ্ন থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, কারণ ওটা শুধুই একটা দুঃস্বপ্ন, এবং জেগে উঠলে এর অস্তিত্ব থাকবে না। কিন্তু রম্ভা, উর্বশী, মেনকা ও তিলোত্তমাদের জন্য এই দুঃস্বপ্ন তো জাগ্রত জীবনেই।
তবে আমি আশাবাদী মানুষ, পরিবর্তন হচ্ছে এবং আরও হবে এবং সেই সময় দূরে নয় যখন মেয়ে ও ছেলেরা সমান মানুষ হয়ে বেঁচে থাকবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 32
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    32
    Shares

লেখাটি ২৪০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.