প্রিয় মোশাররফ করিম, এতো ভীতু আপনি?

0

সুপ্রীতি ধর:

প্রিয় মোশাররফ করিমকে বলছি, আপনি তো দেশে বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়ার মতোন কিছু বলেননি, নতুন কিছুও বলেননি যা আমরা এতোদিন ধরে শুনিনি বা বলছি না, তাহলে কিছু ছাগল-মার্কা আবালের কথায় ভয় পেয়ে গেলেন? যেসব ছাগল দিন-রাত আমাদের গোষ্ঠী উদ্ধার করে, আমাদের হত্যার হুমকি দেয়, কই, আমরা তো তাদের ভয়ে আমাদের কথা বলা বা লেখালেখি বন্ধ করিনি। হয়তো হুমকির দাপট যখন বাড়ে, একটু সময় দেই নি:শ্বাস নেবার। আবার ফিরে আসি সদর্পে। কিন্তু আপনি এটা কী করলেন?

কেন ক্ষমা চাইলেন আপনি? আপনার কী মনে হয় যে, যতোটুকু যাই বলেছেন, তা নিজে বিশ্বাস করে বলেননি? মানে আপনি বিশ্বাস করেন না যে, পোশাক দায়ী নয় ধর্ষণের জন্য? যদি বিশ্বাস করেই বলে থাকেন কথাটা, তাহলে ক্ষমা চেয়ে কী প্রমাণ করলেন? নিজেকেও ওদের কাতারে নামিয়ে আনলেন? এবং আমাদের বিশ্বাস করাচ্ছেন যে, আসলে পোশাকই ধর্ষণের জন্য দায়ী? নাকি ‘নাস্তিক’ শব্দটা শুনে ভয় পেয়ে গেলেন মোশাররফ করিম?

আপনার তো আরও শক্তপোক্ত হওয়া উচিত ছিল এই দেখে যে, ওরা আপনার কথাকে ধর্মানুভূতির সাথে কেমন ঘুটা দিয়ে সুন্নতে শরবত বানিয়ে দিল! এই শরবত কি আপনি গিলতে পারবেন?

 

 

 

 

 

 

 

 

একটু দেখি কী বলেছিলেন আপনি-

“একটা মেয়ে তাঁর পছন্দমতো পোশাক পরবে না? আচ্ছা, পোশাক পরলেই যদি প্রবলেম হয়, তাহলে সাত বছরের মেয়েটির ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব, যে বেরাকা পরেছিলেন তাঁর ক্ষেত্রে কী যুক্তি দেব? কোনো যুক্তি আছে?”

বাহ, বেশ তো। কথা তো সত্যি। তার মানে এ কথাগুলো আপনি ঠিক বলে মনে করেন বা ধরে নিতে পারি যে, আপনি বিশ্বাসও করেন। আপনি মিডিয়ায় যতোই সুড়সুড়ি মার্কা বিনোদন উপহার দেন না কেন, আপনার ভিতরে একজন ‘মানুষ’ এখনও আছে। আপনি হয়তো দিকে দিকে ছড়াতে থাকা ধর্মানুভূতিকে ততোটা গুরুত্বের সাথে দেখেন না, যতোটা আমরা দেখি। তারপরও মুখ ফসকেই হোক, বা মনের ভিতর থেকেই হোক, বলে ফেলেছেন একটা কথা। কিন্তু আপনি বুঝতে পারেননি যে, এইদেশে এখন ধর্মানুভূতি আর ধর্ষকানুভূতি একাকার হয়ে গেছে। আপনি মুমিনদের ধর্ষকানুভূতিতে আঘাত দিয়ে ফেলেছেন। ধর্ম এখন চালিত করে ধর্ষণকে। আঘাতপ্রাপ্ত ধর্ষকানুভূতিকে ধর্মানুভূতির মোড়কে মুড়ে আপনাকে একজন ইহুদী, নাস্তিক, কাফের বানিয়ে দিল ওরা।

আপনার কী করা উচিত ছিল জানেন? আপনার নিজের বক্তব্যে সটান দাঁড়িয়ে থাকা উচিত ছিল। নো নড়চড়। কী হতো থাকলে? হ্যাঁ, আপনাকে হুমকি-ধমকি দিতো, কয়েকদিন লাফাতো ছাগলের বাচ্চারা, কিন্তু আমরা আপনাকে নিজের বলে কিছুটা হলেও ভেবে নিতাম, না যাক, একজন হলেও পাওয়া গেছে, যিনি সত্য কথা বলতে পারেন।

তার বদলে আপনি যথারীতি পুরুষতান্ত্রিক/ধর্মান্ধ বাঙালীর নিকট ক্ষমা চেয়ে নিলেন। জেহাদী জোশে আবার কোন দিন চাপাতির কোপ দিয়া বসে আপনাকে, তাই ভয় পেয়ে একটা চরম সত্য থেকে পিছু হটলেন!

ছি: মোশাররফ করিম। পাশের দেশের দিকে তাকান, মেরুদণ্ডটা সোজা করতে শিখুন। ওই দেশেও ধর্মান্ধতা আজ ভয়াবহ আকার নিয়েছে। কিন্তু সেই দেশের সুশীল বলেন, প্রগতিশীল বলেন, এবং লেখক-কবি-সাহিত্যিক-অভিনয় জগতের সবারই মেরুদণ্ড আছে স্ব-স্থানে। সময় সময় তারা সেটাই টান টান করে ঋজুভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে ফেলেন। তারা মুখের ওপর রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার বা উপাধিও প্রত্যাখ্যান করতে জানেন, এবং করেনও। সমাজের অনাচার-বিচারের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার। তারা আমাদের মতোন লেজুড়বৃত্তিওয়ালা নন অন্তত।

সতীর্থ রাহাত মুস্তাফিজ এর লেখা থেকে ধার করে বলি, “মোশাররফ, আপনি আপনার অবস্থানে অনড় থাকলে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। গৎবাঁধা ভাঁড়ামোপূর্ণ বেশকিছু নাটিকা হতে এদেশ বঞ্চিত হতো। কিন্তু আপনার শক্ত অবস্থান দেশের ধুঁকতে থাকা প্রগতিশীল যাত্রায় কিছুটা বেগ সঞ্চার করতো। এদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষ, কিন্তু সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সৎ সাহসী মানুষের বড্ড অভাব। এখানে সত্যটা কেউ সত্যের মতো করে উচ্চারণ করে না। এমনকি আর কিছুদিন পরে ভবলীলা সাঙ্গ হবে এমন অশীতিপর বুদ্ধিজীবীটিও এখানে মহাজাগতিক ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত!

আপনার জন্য শুভকামনা মোশাররফ করিম। আপনার ক্ষমা প্রার্থনা এতোক্ষণে মঞ্জুর হয়ে গেছে আশা করি। ওইতো অন্ধকারের উল্লাসধ্বনি শুনতে পাচ্ছি …।”

আপনারা শুধু বিনোদনই দিতে শিখলেন, তাও অভিনয়ের মাধ্যমে, নিজের জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে অনুকরণীয় হতে পারলেন না। আফসোস।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ৬,১১৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.