বুড়ো গাজীর মিউজ, আপনি-আমি কি নিরাপদ?

গোধূলী খান:

আহারে! এতো দিন ধরে চলছিল, কেউ টু পর্যন্ত করেনি। সমস্যা হয়নি কোনো, যদিও কেউ কেউ ব্লক মেরেছে, কেউ ম্যাসেঞ্জার কনভারসেশন অপশন বন্ধ করে দিয়েছে। কেউবা আনফ্রেন্ড করেছে। তাদের কেউ সামনা-সামনি হলে খুবই পেশাদার ব্যবহার করেছে, গাজী সাহেব ভাব করেছে কিছুই হয়নি। প্রথম প্রথম ভয়-টয় একটু লেগেছে হয়তো, যেহেতু কেউ কিছু বলেনি তাই থেমে যায়নি মধ্যরাতের মিউজ (মিস ইউজ)। গাজী জানতো মেয়েরা সব বিষয়ে মুখ খুললেও যৌন নিগৃহীত হবার কথা, মলেস্টেশন বা অশ্লীল আচরণের কথা কাউকে বলে না। মর্মে মরে গেলেও লুকিয়ে কাঁদা ছাড়া আর কিছুই করে না। সো নো চিন্তা ডু ফুর্তি।

গাজীর সেক্স মিউজের গাড়ি গড়গড়িয়ে চলেছে। ব্রেক লাগানোর প্রয়োজন পড়েনি। রাত বাড়লে বুড়ো গাজীর মিউজ মিউজ খেলা চলে নিরন্তর। দিনের পর দিন মিউজপক্ক বুড়োর গাড়ি চালায়, লালা ঝরায়। ম্যাসেঞ্জারে চলে মধ্যরাতের চলে মিউজ ক্রিয়া।

বুড়ো গাজী বা গাজী রাকায়েত হোসেন একজন বাংলাদেশী অভিনেতা, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র পরিচালক। নাট্য অভিনয় দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হলেও পরে চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছে (একজন যৌন নিগ্রহকারীকে আপনি সম্মোধন করা সম্ভব হলো না)। ২০১৫ সালে “অনিল বাগচীর একদিন” চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুবাদে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। তার আগে ২০১৩ সালে মৃত্তিকা মায়া’র জন্য পাঁচটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। এহেন ব্যক্তির মনের গহীনের চোরা কুঠরিতে লালসার স্রোত বয়ে যায় তা অনুমানে ব্যর্থ হবে অতি নিকটজনও।

আমার ব্যক্তিগত অভিমত গোপনাঙ্গ দেখতে চাওয়ার মধ্যে কোনো দোষ নেই। তবে খুব জরুরি হলো, দেখতে হবে কে দেখতে চাইছে, কারটা দেখতে চাইছে। দুজন মানুষের মধ্যে তেমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও যৌথ সম্মতিতে যৌন সম্পর্ক থাকলে দেখা ও দেখানোর মধ্যে দোষ নেই। কিন্তু স্বল্প পরিচিত, বা পরিচিত বা অতিপরিচিত কারো সাথে কথা বলতে যেয়ে তোমার সাথে শুতে চাই, বা তোমার পুশি দেখতে চাই, কী পোশাক পরে আছে তার নিচে কী পরে আছো, তার রং কী? সাইজ কত? বলার মধ্যে আছে অন্যায়। আর যা অন্যায় তার বিচার অত্যাবশ্যক।

কিছু পুরুষের অতি যৌন কাতরতা যা দিনের আলোয় চাপা থাকে, তা রাত বাড়ার সাথে কাতরতা বাড়ে। নিজের পদমর্যাদায় বা সামাজিক অবস্থানও এদের প্রশমিত করতে পারে না। একটা মেয়ের সাথে যৌন চ্যাটে হোক, ফোনে হোক, কথা বলতে হস্তপ্রক্ষালনের মাধ্যমে নিজের অবদমিত কামনা মিটিয়ে থাকে। এরা জীবনসঙ্গীর কাছে সাধু, কিন্তু রাত-বিরাতে ভাদ্রকুকুর।

কারো অ্যাকাউন্ট হ্যাক হতেই পারে, কিন্তু কাজের ছেলের কাছে পাসওয়ার্ড থাকা বা পার্সোনাল অ্যাকাউন্ট তিনজন ব্যবহার করার মতো একের পর এক বালখিল্য কথা বলার মধ্যেই প্রকাশ পায়। ধরি, গাজী রাকায়েতের পাসওয়ার্ড তার কাজের ছেলের কাছে ছিল, তাহলে কেন কাজের ছেলের বিরুদ্ধে মামলা করলো না? কিম্বা অপর তিন ব্যক্তি যারা ঐ অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিলো না?

নিলেন যে তার অন্যায় আচরণ প্রকাশ্যে এনেছে, সেই মেয়েটিকে হয়রানি করার জন্য সব থেকে নিকৃষ্টতম ধারায় মামলা করেছে। জনাব গাজী ভাবলো, ৫৭ ধারা দিয়ে সবার মুখ বন্ধ করে দেবে। গাজীর মনোভাব অন্যায় করলে দোষ নেই, দোষ অন্যায়ের প্রতিবাদে। গাজীর এই মনোভাব দেশের অধিকাংশ পুরুষতান্ত্রিক মনের মানুষের মনোভাব, চাইলেই নারীর সাথে যথেচ্ছা ব্যবহার করা যায়।

দেশের সর্বত্র নারীর প্রতি অবমাননাকর আচরণ বেড়েই চলেছে। নিগৃহীত নারীর পাশে যতজন দাঁড়ায়, নিগ্রহকারীর পাশে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে তার অধিক দাঁড়ায় তার সামাজিক অবস্থান ও ক্ষমতার উপর ভিত্তি করে।

“একটুকু ছোঁয়া লাগে একটুকু কথা শুনি তাই দিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনি”, এই গানের মতো একদল পুরুষ রাস্তাঘাটে, মার্কেটে, অফিসে, বাড়িতে, স্কুলে, মসজিদে, মাদ্রাসায়, মন্দিরে, কোর্টে, দোকানে, হাসপাতালে, বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে, দিনে রাতে একটু গুঁতো দিয়ে, আঙ্গুলের স্পর্শ, একটু চাপ দিয়ে পুরো যৌন সুখের আনন্দ পায়। এই অসুস্থ জনগোষ্ঠীর মধ্যে, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সবাই রয়েছে।

নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আইনের প্রয়োগ না থাকায় দিনে দিনে মাত্রা ছাড়িয়েছে। আইনের প্রয়োগকারী বা রক্ষাকারীও প্রকাশ্য দিবালোকে ডিউটিরত অবস্থায় নারীকে হয়রানি করতে পারে। নারীকে যৌন হয়রানি করা ও তাকে নিয়ে হাসাহাসি, উপহাস, তামাশা করা যেন ছেলের হাতের মোয়া। একদল অসুস্থ্ মানুষের জন্য নারী ঘরে-বাইরে কোথাও নিরাপদ না।

এককালে কলকাতার বিশেষ পাড়ার নিরীহ গেরস্ত বাড়ির সদর দরজায় লেখা থাকতো গেরস্ত বাড়ী, না হলে গাজী রাকায়েতদের মতো ইনবক্সে সেক্স চ্যাট ইউজকারী মিউজওয়ালারা দিন-দুপুরে সদরে টোকা মারতো।

তবে একটা কথা না বললেই না যে, গাজী রাকায়েত হোসেনের কাজের ছেলে বেশ শিক্ষিত, সে জানে কী করে সঠিক বাক্য প্রয়োগ করতে হয়। কোন কথার জবাব কীভাবে দিতে হয় নারীর বিশেষাঙ্গের আধুনিক নাম পর্যন্ত জানে। শুধু গাজী রাকায়েত জানেন না, কোনটা অন্যায় কোনটা অন্যায় না। তার পক্ষে অনেকেই আছে, আছে বিভিন্ন শিল্পী কলাকুশলীরা, তারা গাজী রাকায়েতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের কাছে জানতে চাই, উনাদের নেতা কি অন্যায় করেননি, কাউকে মাঝরাতে শুতে চাওয়া বা পুশি দেখতে চাওয়ার মাঝে অন্যায় না হলে, আপনারা কি নিজেদের মেয়ে, বউ, মা, বোনের সাথে কেউ ইনবক্সে সেক্স চ্যাট করতে চাইলে বা শুতে চাইলে মাইন্ড করবেন না?
নাকি আপনাদের স্বামী, ভাই, ছেলে, বাবা অন্য কোনো মেয়েকে সেক্স চ্যাটে করতে বিরক্ত করলে কিছুই মনে করেন না! এটা কি আপনাদের কাছে স্বাভাবিক?

তাহলে বলার কিছু নেই। আপনারা এহেন কামুক মানুষের পক্ষে বা কাছে আরামেই থাকবেন নিঃসন্দেহে। গাজী রাকায়েত একাধারে দুটো অন্যায় করেছে। এক, একজন মেয়েকে যৌন হয়রানি করেছে। দুই, অন্যায় ভাবে ৫৭ ধারায় মামলা করেছে মেয়েটির বন্ধুর নামে। নিজের পাপ চাপা দিতে সে ভুল কাজ করে চলেছে। মামলা করতে হলে তার কাজের ছেলে ও তিন সহযোগীর বিরুদ্ধে করার কথা। আশা করি, অনলাইনের প্রতিবাদগুলো গাজী রাকায়েত এবং তার সুহৃদরা দেখতে পাচ্ছে, অচিরেই তার ভুল বুঝবে এবং এই মামলা প্রত্যাহার করে নেবে।

আর যারা চুপ আছেন বা রাকায়েতের পক্ষ নিয়েছেন, তাদের বলছি, আপনাদের এমন মনোভাবের কারণে সমাজে বেড়ে চলেছে কামুক মানুষের বেপরোয়া আচরণ। আজ আপনি প্রতিবাদ করছেন না, কারণ অপরাজিতা সংগীতা আপনার কেউ নয় বলে।

কাল আপনার আমার মেয়ের ইনবক্সে হামলা হবে। এমনকি গাজী রাকায়েতের কন্যাও শিকার হতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত সেক্স চ্যাটের। আপনারদের ভুল পক্ষালম্বন ও অবিবেচক আচরণই একদল কামুক ছেলে-বুড়োকে বেপরোয়া করার জন্য দায়ী। আপনি নিশ্চয় চান না, এমনকি সেক্সচ্যাট হামলাকারী গাজী রাকায়েত চাইবে না তার মেয়ে এমন পরিবেশে বেড়ে উঠুক। তাই প্রতিবাদী হোন, থাকুন সত্য ও ন্যায়ের পথে, তাহলেই বুড়ো গাজীদের মিউজ বন্ধ হবে।
শেয়ার করুন:
  • 478
  •  
  •  
  •  
  •  
    478
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.