লেখিকার স্বাধীনতা

আমেনা বেগম ছোটন:

মেয়েরা লিখছেন, বেশ আগে থেকেই। বেগম রোকেয়া, কুসুম কুমারী বা আশাপূর্ণা দেবী লিখে গেছেন অনেক কথাই। আরও কত কত নারী লেখক লিখে গেছেন।

হাল আমলেও অনেকে লিখছেন। অতীতের সাথে বর্তমানের লেখকদের পার্থক্য হচ্ছে, প্রায় তাৎক্ষণিক পাঠকের প্রতিক্রিয়া পাওয়া। অনলাইন বা ভার্চুয়াল মিডিয়াতে লেখার ব্যাপারে সাধারণের আগ্রহ অনেক। কেননা এভাবেই আপনি লেখাটি বা ভাবনাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। সেজন্য প্রকাশক বা সম্পাদকের দ্বারস্থ হবার প্রয়োজন নেই। অনেক সময় ভালো লিখলে সম্পাদক প্রকাশকই আগ্রহী হবেন লেখা ছাপাতে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে, পাঠককূলের রাগ, ক্ষোভ, অভিমানের, তিক্ততার ভারও নিতে হবে আপনাকে। আগে, লেখক পাঠক ছিলেন সমাজের বিচক্ষণ লোক। ভার্চুয়াল মিডিয়ার কল্যাণে এখন ভিড়ের সুযোগে গায়ে হাত দেয়া লোকটি বা কলতলায় ঝগড়াটে খান্ডার মহিলার প্রতিক্রিয়াও আপনার গ্রহণ করতে হচ্ছে।

সে না হয় হলো, গণতন্ত্রে সকলের মত প্রকাশের অধিকার আছে। লিখেছেন যখন, কমেন্টের বোঝা বইবার দায়ও আপনার। কিন্তু এদিকে সমস্যা অন্য। আপনি সুবচন দিচ্ছেন, তার মত আপনার সাথে মিলছে ততদিন লেখক-পাঠক সুবন্ধু। যখন মিলছে না, শুরু হয়ে গেল বিষোদগার, আপনার ব্যক্তিগত জীবন, ধর্ম, দর্শন মায় পরিবার, গৃহপালিত জীব নিয়ে টানাটানি। লিখেছেন হয়তো তিন প্যারা, তার সমালোচনার জবাব দেবেন সাত কাণ্ড। তাও মানলাম, গঠনমূলক তক্কাতক্কির দরকার আছে বৈকি।

আরো আছে পরিবার, ভালো মেয়ের মতো সব ভালো বলে যান, খুব বাহবা দেবে। যেই কিনা পরিবার, সমাজ নিয়ে কিছু বলেছেন, অমনি শুরু হয়ে যাবে, আপনার কারণে নাকি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে, তারা সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছেন। আমার এক লেখিকা বান্ধবী খুব ভালো লিখতেন, সাধারণ মেয়ের সাধারণ সব ছোটখাটো সুখ-দু:খের কথা। প্রথমে স্বামী কিছু বলতেন না, যখন দেখলেন স্বামীপ্রবরের গুণপণার কথাও প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে, মেয়েটির লেখা বন্ধ করালেন। বিনি-পয়সার কিছু অক্ষর সাজানোর খেলাটুকুর আনন্দ কেড়ে নেয়া হলো। আমি জানি সে লিখতে কতো ভালবাসতো, না লিখতে পেরে তার কেমন কষ্ট হচ্ছে!

কী আর করা, দুটো কথা লিখতে গিয়ে সংসারে অশান্তি না আনাই তো বুদ্ধিমতীর কাজ! লিখে আর কী হয়? এর বদলে দুই পদ নাস্তা হয়ে যায় বেশ। আদর্শ মা বা বউরা তো সেটাই করে।

স্বাধীনচেতা মেয়েদের কথায় আসি। ভিড়ের সুযোগে হাতাহাতি বিশেষজ্ঞ অনলাইনে-মেসেঞ্জারে এসে হাজির হবে। ভদ্রভাবে বন্ধু হতে চাইবে। তা বেশ তো, বন্ধুত্ব তো খারাপ কিছু নয়। বন্ধুত্বের আলাপের এক পর্যায়ে উনি কিছু দেখতে চাইবেন, দেখাতে চাইবেন, দেখিয়েও দিবেন। আপনার কিল খেয়ে কিল চুরি ভিন্ন উপায় নেই, কেননা, যদি আপনার একমাত্তর অস্ত্র স্ক্রিনশটটি প্রকাশ করেন, মেয়েরাই বলে দেবে, আহা, তোমাকেই কেন দেখাতে গেলো, নিশ্চয়ই সে পথ তুমিই দেখিয়েছো। আমি হলে তো বাপু, ব্লক করতাম। অমুক মানবাধিকার নিয়ে জীবনপাত করা লোকটি যে আপনার ইনবক্সেই এসে পৌরুষ প্রদর্শন শুরু করবেন, এ আপনি কীভাবে জানবেন সেটি অবশ্য কেউ বলে দেবে না।

তবু মেয়েরা দমে না। একে-তাকে এড়িয়ে সরিয়ে লিখে যায়। এবার নতুন যন্ত্রণা, সংঘবদ্ধভাবে লেখিকার ফেসবুক আইডি রিপোর্ট করে বন্ধ করে দেয়া। এবার একটু থমকাতেই হয়। দুদিন পরপর ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে, হ্যাঁ গো, আমিই সেই আসল আমি, বলে সাক্ষীসাবুদ জমা দেয়া কোনো আনন্দদায়ক বিষয় না। ফেসবুক বলে যতোই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করুন, এ শুধু রাফখাতা নয় যে হারিয়ে গেলে আবার লিখে নেবেন। এতে থাকে বন্ধুবান্ধব, প্রিয়জন, প্রিয়মুহুর্ত, কত-শত ছবি, স্মৃতি, গল্প।

সব ছাড়তে ছাড়তে তাই একসময় লেখালেখিটাও ছেড়ে দিতে হয়। অত ঝামেলা করে লিখতে যাবার দরকারটা কী, বলুন? মেয়ে বলেই সব তাতে বাড়তি ঝামেলা। ভুলে গেলেও বন্ধু শত্রু, দেশশুদ্ধ লোক বারংবার মনে করিয়ে দেবে, তুমি মেয়ে। লেখালেখি করলেও বৃত্তবন্দী হয়ে থাকবে, আমাদের সবার মন রেখে যদি লিখতে না পারো, তবে আর লিখে কাজ নেই।

শেয়ার করুন:
  • 107
  •  
  •  
  •  
  •  
    107
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.