পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের বেড়ে উঠার চিন্তায় ‘বিয়ে’

0

ডা. ফাহমিদা নীলা:

খুব অবাক লাগলেও এটাই সত্য যে, প্রতিটি বাঙালী মেয়ে বেড়ে উঠছে বিয়ের চিন্তা নিয়ে। যদি এইটা বলি যে, সেইদিন থেকে সে নিজের বিয়ে নিয়ে চিন্তা করা শুরু করে যেদিন থেকে সে বুঝতে শেখে, তাহলেও সেটা ভুল হবে। বরং ‘বিয়ে’ শব্দটা বোঝার আগে থেকেই সে বিয়ের স্বপ্ন দেখা শুরু করে। কথাটা ভারী অদ্ভুত শোনালেও এটা ১০০% সত্য।

ছোটবেলায় হাঁড়ি-পাতিল খেলার সময় এরা বউ সাজে, জানেই না তখনো বউ মানে কী? পুতুল সাজিয়ে বিয়ে দেয়, বোঝোই না তখনো বিয়ে অর্থ কী? কিন্তু কেন? কেন একটা শিশু তার শিশুতোষ খেলার মধ্যে বিয়ের মতো পরিণত বিষয়টা ঢুকিয়ে ফেলছে?

এটার কারণ খুঁজতে হলে প্রথমেই বাবা-মায়ের কাছে যেতে হবে। যেদিন কন্যা সন্তান জন্ম নিল ঘরে, ঐদিন থেকেই বাবা-মা মেয়েকে শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করার যতোটা না স্বপ্ন দেখে তার থেকে বেশি দেখে, একটা ভালো পরিবারে ভালো ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দেয়ার স্বপ্ন।

প্লিজ, আপনারা এখনই মাইন্ড করবেন না। জরিপ করে দেখুন। তবে হ্যাঁ, জরিপের আগে বাবা-মাকে মনের খাঁটি সত্যিটা বলবে বলে প্রমিজ করিয়ে নিতে ভুলবেন না। আমরা বাঙালীরা মনের কথা অকপটে বলার সাহস হারিয়েছি জন্ম থেকেই।

আপনার প্রথম সন্তানের জন্ম হয়েছে, কন্যা সন্তান। ধরে নিলাম, আপনি খুশি, আপনার পরিজনেরাও খুশি। তদুপরি সদ্যেজাত কন্যা শিশুকে কোলে নিয়ে স্বজনেরা আপনাকে বলবে,
-বাহ্, তোর মেয়ে তো খুব সুন্দর হয়েছে। তোকে আর জামাই খুঁজতে হবে না।
আর কোনভাবে যদি আপনার মেয়ে কালো হয়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই।
-টাকা-পয়সা এখন থেকেই ভালো করে জমিয়ে রাখিস, বেটির বিয়ে দিতে লাগবে তো।

আচ্ছা থাক, আপনার ফুলের মতো তুলতুলে সদ্যেজাত সন্তানের কথা না হয় বাদ দিলাম। মেয়ে একটু একটু করে বড় হচ্ছে। আশেপাশের সকলে মেয়েটাকে খুব ভালো করে বুঝিয়ে দেবার দায়িত্ব নিবে যে, সে মেয়ে, তার জন্মই হয়েছে বিয়ের জন্য, সে বেড়েই উঠছে অন্য কোনো পরিবারে জন্ম নেয়া এক পুরুষের জন্য।

ধরুন, মেয়ের জিদ বেশি, আপনি কিছু না বললেও পাশে থাকা আপনারই কাছের কোনো আত্মীয় বলবে,
-তোর মেয়ের এতো জিদ! বিয়ে দিবি কী করে?
মেয়ে দুরন্ত। মেয়ে সামলাতে হিমশিম খেতে খেতে নিজের অজান্তেই আপনার মুখ দিয়ে বের হবে,
-তুই কবে বড় হবি? হায় আল্লাহ্! এই মেয়েকে বিয়ে দিব কেমন করে?

এই মেয়েটি বড় হতে হতে নিজের বাবা-মা’সহ আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে আরও এরকম হরেক কথা প্রতিনিয়তই শুনতে থাকবে যতদিন না তার বিয়ে হয়!
-মেয়েমানুষের অত রাগ হতে নেই। অত রাগ হলে তোকে বিয়ে করবে কে?
-এতো বজ্জাত মেয়ের কোনদিন বিয়ে হবে? তোকে ভাত দিবে কে?
-ভালো করে লেখাপড়া করো, লেখাপড়া ছাড়া আজকাল আর ভালো বিয়ে হয় না, বুঝেছো?
-ভালো জায়গায় চান্স পেতে হবে, না হলে ভালো ছেলে পাবি কোথায়?
-আচার-ব্যবহার একটু ভালো করো, নইলে তোমার জন্য আর পাত্র পাওয়া যাবে না।
ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
লিখতে বসলে পুরো একটা বই হয়ে যাবে মনে হয়।

এবার আসি, বিবাহযোগ্যা কন্যাটির কথায়। আসলে আমাদের দেশে বিবাহযোগ্যা কথাটাই একটা প্রহসন। এদেশে পিরিয়ড শুরু হওয়া মাত্র একটা মেয়েকে বিবাহযোগ্যা ভাবা হয়, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেয়ের শরীরে বয়ো:সন্ধিকালীন প্রাথমিক পরিবর্তন আসার সাথে সাথেই বিবাহযোগ্যা ভাবা শুরু হয়। এ পর্যন্ত আমরা সবাই জানি। কিন্তু জানেন কী, আমাদের দেশে এমনও সমাজ আছে যেখানে মেয়ের বয়স ৯/১০ হতে না হতেই পাত্র খোঁজা শুরু করে কিংবা আশেপাশের গ্রাম থেকে বিয়ের সম্বন্ধ আসা শুরু হয়? কোনভাবে এদের বয়স ১২ পেরিয়ে গেলে বাবা-মায়ের মুখের ভাত আর গলা দিয়ে নামে না, কিংবা নামতে চাইলেও আশেপাশের লোকজন তা নামতে দেয় না।

-এতো বয়স হলো, বেটির বিয়া হলো না! তাড়াতাড়ি আগে বেটির বিয়ার ব্যবস্থা করো।
-বেশি দেরি করলে আর তোমার বেটির বিয়া দিবার পারবা?
-মেয়ে মানুষের বিয়া যতো তাড়াতাড়ি হয়, ততো ভালো।

ব্লা ব্লা ব্লা……..
এ তো গেলো অশিক্ষিত সমাজের চিত্র। শিক্ষিত সমাজেও মেয়ের বয়স ২০ পেরুতে পেরুতেই বিয়ের জোরেশোরে তাগিদ আসতে থাকে চতুর্পাশ থেকে। কোনো গার্ডিয়ান যদি খুব শক্তভাবে বলেন যে, তিনি কোনভাবেই লেখাপড়া শেষ করার আগে মেয়ের বিয়ে দেবেন না, তাহলে তিনি উপর্যুপরি স্বজনদের উপদেশ ও প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে থাকেন।

-বেশি বয়স হলে কিন্তু আর ভালো ছেলে পাবে না।
-মেয়েদের একটু বয়স হয়ে বিয়ে হলে অ্যাডজাস্ট করতে সমস্যা হয়। কেন ভুল করছো?
-পাশ করে বের হওয়ার পর তোমার ঢিঙ্গী মেয়ের জন্য বর পাবে কোথায় শুনি?
-শোনো, ভালো ছেলে পেলে বিয়ে দিয়ে দাও। বিয়ের পর না হয় পড়বে। কিন্তু দেরি হলে যদি সেরকম ছেলে না পাও!
বাবা-মা বেচারাদের দোষ দিয়ে আর লাভ কী? একদিকে তাঁদের জন্ম থেকে গেঁথে দেয়া সনাতন মানসিকতা আর অন্যদিকে সমাজের নানান উক্তি-কটুক্তির চাপে কেউ কেউ পরাজিত হয়ে পাত্র সন্ধানে বের হোন, আর স্বল্প সংখ্যক মনে মনে তসবী জপতে জপতে অপেক্ষা করতে থাকেন, মেয়ে পাশ করার পর যেন ভালো একটা বিয়ে দিয়ে এইসব আত্মীয়ের মুখে ঝামটা দিতে পারেন।

এখন যদি আরও গভীরে যান, তাহলে দেখতে হবে আত্মীয়-পরিজন মেয়ের বিয়ে নিয়ে এতো চিন্তিত কেন। সেটার সহজ উত্তর হলো, আমাদের সমাজ ব্যবস্থা।
প্রথমত: আমাদের সমাজে যেখানে ছেলেদের পরিচয় হয়, তার নিজের বা বাবার স্ট্যাটাস দিয়ে, সেখানে একটা মেয়ের পরিচয় হয় তার স্বামীর স্ট্যাটাস দিয়ে।
দ্বিতীয়ত: আমাদের সমাজে একটা মেয়ের একক জীবন-যাপন শুধু কঠিন নয়, প্রায় অসম্ভব পর্যায়ের।

আসি প্রথম পয়েন্টটাই। একটা ছোট্ট ঘটনা দিয়ে শুরু করি। আমি ঢাকায় এমআইএসে একটা ট্রেনিংয়ে গেছি। উচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণার্থীরা হলেন সিভিল সার্জন, ইউএইচএফপিও, কনসালট্যান্ট এবং আরএমও-গণ আর প্রশিক্ষণদাতারা হলেন সচিব পর্যায়ের লোকজন।
একজন ট্রেনার, সরকারের স্বাস্থ্যবিভাগের অতি উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্ব পালন শেষে অবসরে গিয়ে জাতিসংঘের স্বাস্থ্যবিভাগে জয়েন করে স্বাস্থ্যবিভাগের নতুন নতুন প্ল্যানিং করছেন, যিনি নারী স্বাস্থ্যের উন্নয়নে কাজ করছেন, মাতৃ মৃত্যুহার কমানোর জন্য কাজ করছেন, সুতরাং বুঝতেই পারছেন ওনার স্ট্যাটাস।
উনি উনার লেকচারের এক পর্যায়ে নারী অধিকার বিষয়ে উদাহরণ দিতে গিয়ে হঠাৎই একটা মেয়েকে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করলেন,’আপনার হাজবেন্ড ডাক্তার তো?’
মেয়েটা দাঁড়িয়ে ভীষণ বিব্রত হয়ে জানালো যে, তার হাজবেন্ড ডাক্তার না। কে কী ভেবেছেন জানি না, আমি বিষয়টি খুব তাৎপর্যপূর্ণই মনে করেছি। হতে পারতো মেয়েটি অবিবাহিত, হতে পারতো সে ডিভোর্সি কিংবা বিধবা, সেক্ষেত্রে তার বিব্রত হওয়ার পরিমাণটা হয়তো দ্বিগুণ বা ততোধিক হতো! আমার পাশে থাকা চিরকুমারী কনসালট্যান্টও আমাকে বললেন, ওনাকেও প্রায়শ:ই এমন বিব্রতকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।
উদাহরণটা আমি কেন দিলাম আশা করি বুঝেছেন। এদেশে একটা মেয়ের সাথে পরিচয়ের সময় দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রশ্ন হয়,
-আপনার হাজবেন্ড কী করে?
প্রশ্নটি করার আগে একটিবারের জন্যও কেউ দ্বিধা বোধ করে না। এমনকি উক্ত প্রশিক্ষকের মতো এদেশের অতি হাই প্রোফাইল লোকও এই সনাতন বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। এরকম হাজারটা উদাহরণ আমি দিতে পারবো।

এবার আসি দ্বিতীয় পয়েন্টে। সত্যি বলতে কী, এ পয়েন্টটি এই ছোট্ট ফিচারে ব্যাখ্যা করা প্রায় অসম্ভব। এটার জন্যও একটা বই লেখা দরকার। একটি সিঙ্গেল মেয়ে বাড়ি ভাড়া নিতে পারে না, চাকুরির ক্ষেত্রে সুবিধা করতে পারে না, বদলী-প্রমোশনের ক্ষেত্রে হাবুডুবু খায়, হাটে-বাজারে হেনস্থা হয়, হেনস্থা হয় আত্মীয়-পরিজনের কাছে, অফিসে, আদালতে সর্বত্র।
মোটের উপর একটা কথা, মেয়েটি একা সবকিছু সামলিয়ে চলছে এ নিয়ে কেউ উৎসাহ তো দেয়ই না, বরং তার সাথে এমন একটা আচরণ দেখানো হয় যে, সে যেন একা থেকে এ সমাজটাকে কলুষিত করছে। আরও একটা ব্যাপার তো আছেই, সিঙ্গেল মেয়েকে এ সমাজের পুরুষেরা ‘সরকারি সম্পত্তি’ মনে করে। এ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত লেখার অবকাশ মূলত: এখানে নেই।

কথা হচ্ছিল, পুরুষতান্ত্রিক/পুরুষশাসিত এ সমাজে মেয়েদের বিয়ের চিন্তা নিয়ে বেড়ে ওঠা প্রসঙ্গে। এখানে বলে রাখা ভালো যে, আমি কিন্তু বিবাহ বিরোধী নই। বিয়ে একটি সামাজিক এবং ধর্মীয় প্রথা। স্বাভাবিক ধারায় সঠিক সময়ে এটি আসবে, সন্নিকটে আসলে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হবে। কিন্তু জন্ম থেকেই বিয়ের চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠার জন্য মেয়েদের চিন্তাধারা একটা নির্দিষ্ট বলয়ের মধ্যে আটকে থাকছে।

পুরুষও তো বিয়ে করছে, কই পুরুষকে তো শিশুকাল থেকে বিয়ের চিন্তা মাথায় গেঁথে দেয়া হচ্ছে না। শুধু এই এক বিয়ে স্বপ্ন কিংবা বিয়ে চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে মেয়েরা আরও অনেক স্বাধীনভাবে বেড়ে উঠতে পারতো, নিজেদের আরও অনেক সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করতে পারতো অনায়াসে। এই ট্রাডিশন ভাঙতে কত শত বছর লাগবে, আমি জানি না।

গ্রাম অঞ্চলে শিক্ষার হার বাড়ালে বাল্যবিবাহ কমলেও কমতে পারে, কিন্তু মেয়েদের এই বিবাহ চিন্তা বিষয়ক ট্যাবু কীভাবে ভাঙবে তা নিয়ে গবেষণার প্রয়োজন আছে। অবশ্য আমি সন্দিহান, পুরুষশাসিত সমাজ আদৌ এ ট্যাবু ভাঙতে চায় কি না! শিক্ষার সাথে যখন সমস্যার সম্পর্ক থাকে না, তখন শুধুমাত্র শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি করে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা।

আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি, বারবার বলি, সমাজ মানে আর কেউ নয়, সমাজ মানে আমরা, অর্থাৎ আমি, তুমি এবং সে। সুতরাং পরিবর্তন আনতে চাইলে শুরু করতে হবে আমরা’র উত্তম পুরুষ ‘আমি’ থেকে। আসুন, ‘আমি’র পরিবর্তন দিয়ে শুরু করি সমাজের পরিবর্তন।

কন্যাসন্তানেরা বেড়ে উঠুক সন্তান হিসেবে, নিজের গতিতে, আপন পরিচয় নিয়ে। বিবাহ স্বপ্ন বা বিবাহচিন্তা নিয়ে নয়, অন্যের পরিচয়ের ট্যাগ লাগানোর আশায় নয়, বরং সকল বাঙালী নারী প্রস্ফুটিত হোক আপন প্রতিভায়, স্ব-মহিমায়।

এমবিবিএস; এফসিপিএস(গাইনী); ফিগো ফেলো(ইটালী)
গাইনী কনসালট্যান্ট
পপুলার ডায়াগনষ্টিক সেন্টার
বগুড়া

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 164
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    164
    Shares

লেখাটি ৩৫৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.