‘কাস্টিং কাউচ’ নিয়ে সামান্য ইউটোপিয়ান, আর একটু প্র্যাগম্যাটিক চিন্তা

আনা নাসরিন:

একটা সময় ছিল নাটক, সিনেমায় কাজ করা মেয়েদের জন্য অত্যন্ত অসম্মানজনক মনে করা হতো। কোনও শ্রেণীই নাটক সিনেমায় নারী কাজ করুক, তা চাইতো না। তখন মঞ্চে ও পর্দায় পুরুষরাই নারী চরিত্রকে রূপায়ণ করতো। সব নারী চরিত্রে অভিনয় করতো পুরুষরাই – ভাবতেও কী অদ্ভুত লাগে তাই না!

ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত ও হাস্যকর। তাই অনেক চেষ্টা করেও যখন তৎকালীন নির্মাতারা নারীদের অভিনয়ে আগ্রহী করতে ব্যর্থ হন তখন নিরুপায় হয়ে তথাকথিত ভদ্র পাড়ার নারী অভিনেত্রীর আশা বাদ দিয়ে অভিনয়ে নিয়োজিত করেছিলেন কিছু যৌনকর্মী নারী।

এভাবে কিছু কাল অতিবাহিত হলে একজন একজন করে ‘ভদ্র ঘরেরই’ জনা কয়েক সাহসী নারী অভিনয়ে আসতে রাজি হন। সেই আকালের সময় বলাই বাহুল্য যে এই নারীদেরকে পায়ে চুমু খেয়ে নির্মাতারা বরণ করেছিলেন; সেই গর্বিত নারীরা ছিলেন শিল্পাঙ্গনের মাথার মণি। তাই তাদেরকে কোনও কাস্টিং কাউচের শিকার হতে হয়নি নিশ্চিতভাবেই। অনেক বছর পর্যন্তই টিকেছিলো এই সুস্থ শিল্প চর্চা। সত্যিকারের শিল্পীরাই কেবল তখন শিল্পচর্চার মাধ্যমে টিকে থাকতেন। দক্ষ শিল্পী না হলে বাদ পড়ে যেতেন। তাই তারা বছরের পর বছর অক্লান্ত সাধনা করে নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতা গড়ে তুলতেন। শিল্পী হবার একমাত্র যোগ্যতা তখন ছিল প্রতিভা।


পরবর্তীতে প্রতিভাকে ছাপিয়ে যায় শিল্পী জীবনের সফলতা। শিল্পীদের সফল জীবনে প্রলুব্ধ হয়ে কিছু অযোগ্য, প্রতিভাহীন নারী কেবল রূপ-সৌন্দর্যকে পুঁজি করে শর্টকাট পথে নাম-যশ-খ্যাতি ও অর্থকড়ি উপার্জনে ব্রত হয়ে কিছু সুযোগ সন্ধানী দেহলোভী প্রযোজকের অন্যায় আবদারের কাছে মাথা নত করে, শরীর বলি দিয়ে রাতারাতি তথাকথিত সফলতা অর্জন করতে শুরু করে। আর এভাবেই খুব দ্রুত, প্রায় রাতারাতি গোটা সিস্টেমটাই পাল্টে যায়।

একটা মেয়ের কথা কল্পনা করা যাক, যে মেয়েটা জন্মলগ্ন থেকে অভিনয়টা ছাড়া আর কিছু শেখেনি, শিখতে যায়ও নি, যার জীবনের ধ্যান-জ্ঞান ছিলো শুধু নাটক, সিনেমা, মঞ্চ; পা থেকে মাথা পর্যন্ত যে মেয়েটা শুধুই একজন শিল্পী, ধমনীর রক্তে যার কেবল শিল্প। সে মেয়েটাই দেখা গেলো বাদ পড়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাচ্ছে তারা যারা শিল্পের ‘শ’ টাও বোঝে না।

আমি জেনেছি এমন পরিস্থিতিতে ‘অ-শিল্পী’ গুলোর সাথে টিকে থাকতে গিয়ে কিছু আপাদমস্তক জাত শিল্পীকেও করতে হয়েছে সেই ভয়ংকরতম অসম্মানজনক আপোষটি। আমি জানি না একজন প্রতিভাবান মানুষ কী করে এমন বীভৎস অসম্মানকে বরণ করে নিতে পারেন! তবে জানি, শিল্পীর আত্মা মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকতে চায়, তার প্রতিভার দীপ্তি ছড়িয়ে দিয়ে যেতে চায়। এমন দু’এক জন শিল্পীকে আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে চিনি যারা ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নেবার জন্য যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও কারো ‘যৌন আব্দার’ মেটাতে হয়েছে বলে ঘনিষ্ঠ মাধ্যমে জানতে পেরেছি।

যাদের সৃজনশীলতা সত্যিকারের অর্থেই শিল্প মানে সমৃদ্ধ, তাই তাদের নাট্যকর্মী না বলে আমি শিল্পী বলতেই চাই। আমি জানি না কতখানি কষ্ট বুকে চেপে তারা ‘যৌন আপোষ’ করার মাধ্যমে আত্মসম্মানবোধকে হারিয়ে দিয়ে জিতিয়ে দিয়েছিলেন সুপ্ত শিল্পীসত্তাকে। তা আমি জানি না, আর জানতে চাইও না। আমি শুধু একটা অলীক স্বপ্ন, কিংবা একটা দিবা স্বপ্ন দেখতে ভীষণ ভালোবাসি। তা হলো নারী সর্বক্ষেত্রে তার হারানো সম্মান ফিরে পাক। শ্রমিক থেকে শিল্পী, কোনও নারীকেই যেন তার নারীত্বের প্রতি অসম্মান না মেনে নিতে হয়।

আজ থেকে আর একজন নারীও যদি ঐ লম্পট পুরুষগুলোর অন্যায় সেই নোংরা আব্দারে সাড়া না দেয়, কী হবে তাতে? আবার কি তারা পুরুষ দ্বারা রূপায়িত করবেন নারী চরিত্র? হলে হোক, সেই ভালো। মাত্র অল্পকাল যদি তাদেরকে আবার অতীত কালের মতো নারী সঙ্কটে ভুগানো যেতো তাহলেই দেখা যেতো, শিল্পীর নিকট অন্যায় আব্দার দূরে থাক, আবার সেই পায়ে চুমু খেয়ে ‘আম্মাজান ডেকে’ এসে নিয়ে যেতে হতো।

আমরা কেন নিজেদের অসহায় ভাবি? আমরা কেন তাদের অসহায়ত্বটা ধরতে পারছি না! আমরা কেন বুঝতে পারছি না যে নারী ব্যতীত নাটক, চলচ্চিত্র আর হবে না। হতেই পারে না। যেমন হতে পারে না পুরুষ ব্যতীত। নিজেরা অকারণ নত না হয়ে কেন তাদেরকে নত হয়ে ফিরে আসবার সুযোগ দেই না আমরা? আমরা যদি সবাই মিলে একযোগে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারি, তাহলে সুদিন আসবেই।

এতোক্ষণ যে সমাধানের পথটি খুঁজছিলাম সেটি আসলে একটি ইউটোপিয়ান চিন্তা মাত্র। এ ধরনের স্বপ্ন দেখাটা বেশ আরামদায়ক হয়। তবে বাস্তবায়ন অসম্ভব। কেননা কোনও দেশে, কোনও সমাজে, কোনও সেক্টরেই অযোগ্য ব্যক্তির কোনও অভাব হয় না। হলে যোগ্য ব্যক্তির অভাব হতে পারে, অযোগ্য ব্যক্তি ভুরিভুরি। তাই প্রতিভাবানরা মুখ ফিরিয়ে নিলে অপ্রতিভাবানরা এসে যেকোনও মূল্যে জায়গাটা লুফে নেবে। তাই এই পথটিও খুব কার্যকর নয়।

পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় মুক্তির দীপ শিখা জ্বালাতে পারে একমাত্র পুঁজিই। অর্থ ও ক্ষমতাই যেহেতু সকল অনাচারের মূল চালিকাশক্তি। তাই অনাচার রোধেও অর্থের বিকল্প নেই। অনন্তকাল নিশ্চিন্তে শুধু শিল্পচর্চা করে গেলেই চলবে না। নারীদেরকে হয়ে উঠতে হবে শিল্পের পৃষ্ঠপোষক। নাট্যকার থেকে শুরু করে পরিচালনার দায়িত্ব নিতে হবে, আর তার চেয়ে আরো জরুরি হলো নারীদের প্রযোজক হয়ে উঠতে হবে। কেননা এই প্রযোজকদের হাতেই মূলত বাঁধা থাকে শিল্পী থেকে শুরু করে পরিচালক পর্যন্ত সবার ইচ্ছে/অনিচ্ছে, ভাগ্য/দুর্ভাগ্যের সুতো। সেই সুযোগেই একরকম পুতুল নাচ নাচিয়ে ছাড়েন এরা।

বিপুলসংখ্যক নারী এসে যদি কোনোদিন এই ক্ষমতার জায়গাগুলো অর্জন করতে পারেন, কেবল সেদিনই আসবে সুদিন। তা নাহলে কোনদিন নয়। আমরা জানি শুধু নারী নয়, অর্থনৈতিক পরাধীনতা সকলের জন্যই পরাধীনতা। অর্থনৈতিক মুক্তিই অন্যসব মুক্তির মূল চালিকাশক্তি।

শেয়ার করুন:
  • 101
  •  
  •  
  •  
  •  
    101
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.