নারীর বিড়ম্বনা

0

আফরোজা আলম:

–তুমি কবিতা লেখো?
একজন আকাশ থেকে পড়ে জিজ্ঞ্যেস করে। কাঁচুমাচু হয়ে জবাব দিতে গিয়ে তোতলাতে থাকলাম। বিরাট অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসছি। অপরজন আস্তে আমার কাছে ঝুঁকে এসে ঘন হয়ে বসে জিজ্ঞেস করে,
–আমাকে বলো কী হয়েছে? শুনেছি প্রেমে পড়লে আর ছ্যাঁকা খেলে নাকি কবিতা-টবিতা লেখে তা –তোমার তো এখন সে সব বালাই নেই, তবে কেইসটা কী?

আমি জানি না আমি কী এমন ঘটনা ঘটালাম চারদিকে গুন গুন, ফিস-ফাস। কেউ কেউ বাসায় এলে স্বামীকে বলে
-দোস্ত তোর বউ আজকাল কবিতা লেখে, তুই তো তবে কবির জামাই।
অতঃপর স্বামীর কটমটে চাউনি থেকে পালিয়ে বাঁচা। শুনেছি কবিদের নাকি ভাত নেই। আমি ভাত কাপড়ের অভাবে কবিতা লিখি না, গল্প লিখি না।

এমন বিরাট গোছের কেউকেটা হবো, এমন স্বপ্ন ঘূণাক্ষরেও দেখি না। মন চায় তাই কিছু লিখি। নারী হয়ে জন্মেছি, হাড়ি ঠেলবো, চাকুরি করলে শিক্ষকতা করবো, নয়ত ব্যাংকে কেরানি হবো। নাহ্ মেয়েরা মাথা খারাপ করা লিখবে কেন? প্রবন্ধই বা লিখবে কেন? লিখবে ঘর-গেরস্থালীর কথা। পতি সেবার গপ্পো।

মাঝে মধ্যে মনের মাঝে অদ্ভুত এক একটা অনুভূতি হয়, তখন লিখি। ওটা কবিতা,গদ্য না পদ্য কিচ্ছু বুঝি না।
কেন লিখি তাও জানি না। তবে আজকাল মনে হচ্ছে লেখাটা বিরাট সমস্যা হয়ে গেলো। লিখতে হবে ভারি ভারি কিছু, যা চিন্তার খোরাক যোগাবে। দেশ ও দশের উন্নতি হবে, তা না করে কবিতার মতো বিষয়। না না এক্কেবারেই অনুচিত ব্যাপার।
ছোটবেলা থেকেই ‘কবি’ মানেই চোখের সামনে ভাসে লম্বা লম্বা চুল, নিদেনপক্ষে কাঁধে থাকবে ঝোলা। যেমন রবীন্দ্রনাথ, হালে আরও অনেক কবি, সেইসাথে ফাইন আর্টস নিয়ে পড়া ছাত্র। তারা তো তবু দেশ নিয়ে কিছু করছে, কেননা স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণের অবদান অনেকেই ভুলে গেলেও আবার অনেকেরই মনে আছে। তবু কবিতা লেখা মানেই অকর্মার দল যেন।

আশ্চর্যের ব্যাপার সেই বিষয়টা আমার মাথায় এলো কী করে?

দিনে চিন্তা, রাতে ঘুম হয় না। সবার কানাকানি, ফিস-ফাসে টেকা দায়। যেন মহা অন্যায় করে ফেলেছি। আমি এক তস্কর। ধরা পড়ে গিয়েছি সবার কাছে।
আড়ে-ঠারে অনেকেই এই সব কথা বোঝাতে বাকি রাখে না।

সেদিন একজন তো বলেই দিলো-
– আপনি কি বাংলায় পাশ? সকৌতুকে চোখ নাচানাচি তার।
– কেন বলুন তো? নাহ, আমি বাংলা নিয়ে পড়াশোনা করিনি।
মুখে চোখ যেন উদ্ভাসিত হয়ে গেল প্রশ্নকর্তার। নড়েচড়ে বসে আবার বলেন –
– আপনার সাবজেক্ট আলাদা জানলাম। তাহলে কবিতা এই সব লিখে কী হবে? আপনার বরং চিন্তা করা দরকার দেশ নিয়ে। দেশের কথা কিছু লিখুন।

ভাবতে বসি দেশের কথা। নেতা, নেত্রী, অনুগত, দল থেকে দলান্তর, দেশ বাঁচাও এমন কতো ভালো ভালো রাঘব বোয়াল রয়েছেন। আমার মতু হতদরিদ্র মনের মানুষ দেশের মতন এমন বিশাল ব্যাপক বিষয় নিয়ে কী বা লিখবো। ভেবে ভেবে ঘুমাই, ঘুম থেকে উঠে আবার ভাবি।
ভাবনার নাটাইয়ের সূতো উড়তে থাকে। দেশ আর দশের চিন্তা করতে থাকি।

ওদিন নারী বিষয় নিয়ে কথা উঠেছিল। নারী মুক্তি, নারী আন্দোলন এই সবের সাথে জড়িত না হলে নারীদের জন্য কিছু করা আদৌ সম্ভব না।
আমি কিছু বলতে চাইলাম। তো ক’জন হো-হো করে হেসে বলে উঠলো,
-আরে তুমি যে নারী নিয়ে লেখো, ভালো কথা। কিন্তু স্বামীর খাও, স্বামীর পরো, পুরুষের রোজগারে চলে যে মেয়েরা, তাদের মুখে কী নারীদের কথা মানায়? তুমি বলো?
আসলে সত্যি তো নিজেকে একটা অপদার্থ ছাড়া আর কিছু মনে হলো না। অন্যের অন্ন খেয়ে আবার নারীদের নিয়ে কথা বলা?

শত অপরাধেও চুপচাপ লক্ষী বঁধূ হয়ে থাকতে হবে। কেননা আমি যে আর এক পুরুষের খাই। তার দায়-দায়িত্ব আমাকে আমার বাচ্চাকে ভরণপোষণ করার। তবু এমন মহান কাজ যিনি করছেন, তার শত অপরাধেও নতমুখী নীতি নিয়ে থাকা দরকার।
নিজে কতভাবে এই সংসারে খাটলাম। সকাল থেকে রাত অবদি। হাড় ভাঙ্গা খাটুনি। অন্য জাগায় চাকরি করলে ভালো বেতন পাওয়া যেত। লেখাপড়া না জানলে যদি ঝি-গিরি করা হতো, তাও কিছু টাকা পাওয়া যেত। আর রোজগেরে মানুষ মাত্রই তার মূল্য আছে। ঘরের গৃহিণীর যেন অনেকটা গৃহপালিত পশুর মতন অবস্থান।

লোকে বলে -আরে দুধ দেয়া গরুর লাথি খাওয়া ভালো।
হায় হায় আমি তো তাও নই। আমাদের মতন যারা এমন পরগাছা, তাদের কী উপায় তবে? না ঘরকা না ঘাটকা।
অতঃপর নারী নিয়ে লেখালেখি বন্ধ। যারা পুরুষের রোজগারে চলে, তাদের কি অধিকার নারী নিয়ে লেখার? ভাবতে বসি আবার। চুল ছিঁড়ি। আবার কবিতার লাইন মাথায় আসে। নিজকে শাসন করি।

হায় কী বিড়ম্বনা! এমন অবস্থায় কেউ যেন না পড়ে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 144
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    144
    Shares

লেখাটি ৬৮১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.