বুড়ো সেলিব্রেটির ঘাড়ে মিউজ

মাসকাওয়াথ আহসান:

লেখক রাইটার্স ব্লকে ভুগছে। এভাবে সৃজনশীল কাজ হয় না। লেখক স্ত্রীকে জানায় ব্যাপারটা।
–হচ্ছে না, কিচ্ছু হচ্ছে না। কিছুতেই নতুন কিছু আসছে না মাথায়। লিখতে না পারলে ভালো লাগে না কিছুই।

স্ত্রী বলে, একটু বই-টই পড়ো; শুধু লিখতে চাইলে হবে; তার আগে পড়তে হবে।

–আরে দূর কী যে বলো! বই কী জীবনে কম পড়েছি। আসল ব্যাপার হচ্ছে; এই মনোগামিক জীবনে লুলা হয়ে পড়ে আছি; লেখালেখির জন্য অনুপ্রেরণা লাগে। ধরো এক একটা নতুন উপন্যাসের জন্য এক একজন নায়িকা লাগে। ইউরোপে একে “মিউজ” বলতো। লেখকরা মিউজের অনুপ্রেরণায় মাস্টারপিস লিখতো।

–সে যুগে মেয়েরা বোকা ছিলো তো; তাই তাদের এসব মিউজ-টিউজ বলে এক্সপ্লয়েট করতো ক্রিয়েটিভ ফিল্ডের লোকেরা। শো’বিজের কাস্টিং কাউচ থাকে না; ওটা আসলে ক্রিয়েটিভ লোকেদের ঘাড়ে থাকে। ওটাকেই মিউজ বলে শিল্পের প্রলেপ দেয় তারা।

–তুমি আসলেই একেবারেই ক্রিয়েটিভ নও তো। তাই চট করে বাজে কথা বলে দাও।

স্ত্রী হাসতে হাসতে ট্যাবে বর্জ্য-ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে একটা টেড লেকচার দেখতে শুরু করে।

লেখক খুবই বিরক্ত হয়। মেয়েটার কী বিশুষ্ক জ্ঞানতৃষ্ণা। কী সব কঠিন কঠিন বিষয় দেখে অবসর কাটায়।

নতুন উপন্যাসের জন্য প্লট আছে; কিন্তু সে প্লটের নায়িকা আর যাই হোক গার্বেজ ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে লেকচার শোনে না। সে খুব রোমান্টিক মেয়ে। কবিতা পড়ে; কবিতা পড়ে ফোঁস ফোঁস করে কাঁদে। কেঁদে চোখ ফুলিয়ে সেলফি দেয়। রোমান্টিক কথা-বার্তা লেখে ফেসবুকে।

সেলিব্রেটিদের আত্মবিশ্বাস এভারেস্ট শৃঙ্গের চেয়ে উচ্চ। বিশেষ করে খুশীজল পান করার পর তার নিজের বাঘ মারার গল্প কোন মেয়েকে বলতে ইচ্ছা করে।

কিন্তু এই লেখকের স্ত্রী তার বাঘ মারার গল্প গুলো প্রায় একহাজার বার শুনে ফেলেছে। ভদ্রতার খাতিরে কিছু না বললেও লেখক বুঝতে পারে শ্রোতার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাচ্ছে।

লেখক আকুল হয়ে ফেসবুকিং করতে করতে এক তরুণীর ইনবক্সে বার্তা পাঠায়, আজ রাতে আমার বাঘ মারার গল্প শুনবে।

–এসব কী বলছেন! আপনি বাঘ পেলেন কোথায়! দেশে বাঘ নাই; সাপ আছে। সাপ মারার গল্প থাকলে বলেন।

এই তরুণী সুবিধার নয়। লেখক আস্তে করে কেটে পড়ে।

ওদিকে চার পাত্তর খুশীজল মেরে দেবার পর লেখকের মিউজের তৃষ্ণা এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়। ফেসবুকে আরেক নারীর ইনবক্সে বার্তা দেয়, এই তুমি আমার মিউজ হবে!

নারী জিপিএ ফাইভ যুগের হওয়ায় বিস্মিত হয়। কিন্তু ফটাশ করে ইংরেজিতে উত্তর দেয়, হোয়াট ইজ মিউজ।

লেখক হতাশ হয়। শিক্ষা-ব্যবস্থার যে হাল হয়েছে। আরে বাবা, একটু গুগল করে নিয়ে উত্তরটা দেবার সামর্থ্যও কী নেই।

স্ত্রী টরেন্ট থেকে একটা টেলি- ড্রামা সিরিজ ডাউনলোড করতে করতে জিজ্ঞেস করে, কী মিউজ পেলে! বি কেয়ারফুল। এটা কিন্তু “মি টু”-র যুগ। কুড বি মিউজ এসে কিন্তু স্ক্রিণশট ফাঁস করে তোমার সোশ্যাল রেপুটেশানের বারোটা বাজিয়ে দেবে!

লেখক পাঁচ পাত্তরের আত্মবিশ্বাসে বলে, বোদলেয়ার কখনো সামাজিক সুনামের পরোয়া করেনি। আমি কেন ভয় পাবো! তুমি থাকো তোমার মারভেল কমিকস-এর চাইল্ডিশ জগত নিয়ে। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।

লেখক আবার এক তরুণীর ইনবক্সে বার্তা দেয়, আজ রাতে আমার সঙ্গে একটু ফ্রি হবে!

পড়বি তো পড় একদম মি টু’র ঘাড়ে। সে ছিলো গাছের আড়ে।

ফেসবুক ছেয়ে যায় এই ‘অশোভন’ ক্রিনশটে। সমাজে ছ্যা ছ্যা পড়ে যায়।

লেখকের ঘনিষ্টরা ফোন করে, এইটা কী করলেন ভাই! আপনার মান-সম্মান তো কিছুই রইলো না। আপনি ফেসবুকে স্টেটাস দ্যান, আমার আইডি হ্যাক হয়েছিলো।

লেখক তোতা পাখির মতো স্ট্যাটাস দেয়, আমার আইডি হ্যাক হয়েছিলো।

লেখকের এক অতিরিক্ত শুভাকাংক্ষী বুদ্ধি দেয়, অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স; আপনে সাইবার আইনের কয়লা ধারায় ঐ তরুণীর বিরুদ্ধে মামলা কইরা দেন। বাকিটা আমরা দেখতেছি। এরে বলা হয়, ইমেজ পুনরুদ্ধার কৌশল।

সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ এটি একটি বিশ্বজনীন গল্প। সব চরিত্র কাল্পনিক। বাস্তবের কোন চরিত্রের সঙ্গে মিল খোঁজা ‘কান’ নিয়েছে বলে চিলের পিছে দৌড়ানোর মতো।

শেয়ার করুন:
  • 377
  •  
  •  
  •  
  •  
    377
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.