জীবনের গল্প – ১

0

ইসাবেল রোজ:

কথা হচ্ছিলো একজন বাংগালী প্রবাসী নারীর সাথে, যিনি ইংল্যান্ডে আছেন প্রায় ১২ বছর ধরে। তার নাম ধরে নেই শাপলা। দেশে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর অনার্সে ভর্তি হবার পরপরই ইংল্যান্ডে বসবাসরত এক ত্রিশোর্ধ পাত্রের সাথে তার বিয়ে ঠিক হয়ে যায়। বিয়ের দেড় বছর পর তিনি ইংল্যান্ডে আসেন।
শাপলা একজন গৃহিণী। তার দুই সন্তান, বড় জন পড়ে ইয়ার ৫ এ, ছোট ছেলেটি পড়ে রিসেপশনে। অর্থাৎ আমার মেয়ের ক্লাসে।

ফিরে আসি মূল কথোপকথনে। আমি আমার আরও দু’জন বান্ধবীসহ প্ল্যান করেছি যে আমরা স্কটল্যান্ডে যাবো। এটা অনেকটা মেয়েলি নাইট আউট। শুধু আমরা তিনজন মেয়ে একটু হৈ হুল্লোড় করা। মূলত সংসার বাচ্চা এদের থেকে বিরতি নেয়া। এখানে উল্লেখ্য আমি ছাড়া আমার বাকি দুজন বন্ধুদের বাচ্চা নেই। একজন সিংগেল আছেন। আরেক জন বিবাহিত।

আমি আমার মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে একটু আগেই চলে গেছিলাম। শাপলাও আমার মতোই আগে চলে আসায় আমরা গল্প করছিলাম। যখনই আমার হলিডে প্ল্যানটা বললাম, শাপলা খুব অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। আমাকে বার বার প্রশ্ন করতে লাগলো যে সত্যি সত্যি আমি আমার মেয়েকে তার বাবার কাছে রেখে হলিডে যাবো?
আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, এতে আপনি এতো অবাক হচ্ছেন কেন? তখন উনি বললেন, আমি খুবই ভাগ্যবতী একজন মেয়ে। যে কিনা এভাবে জীবনটা উপভোগের সুযোগ পাচ্ছে। আমার উচিত আমার হাজবেন্ডের পা ধুয়ে দেয়া। এরকম হাজবেন্ড পেয়ে আমার জীবন ধন্য।

আমি কিছুক্ষণ শুনলাম তার বক্তব্য। আমি জানতে চাইলাম উনি কেন এমন আমার ভাগ্যের প্রশংসা করছেন? উনি বলছেন,

১) কোনো বাংগালী পুরুষ তার বউকে একা হলিডে যেতে রাজী হবে না,
২) রাজী হলেও বাচ্চা রাখতে রাজী হবে না
৩) অবিশ্বাস করবে
৪) এটা কে খুবই খারাপ চোখে দেখবে
৫) ফ্যামিলিতে বদনাম হবে মেয়ে মানুষ একা বাইরে গেলে;

উপরোক্ত কারণসমূহের জন্য আমি একজন এক্সট্রা অর্ডিনারি ভাগ্যবতী মহিলা।
আমি শাপলাকে বললাম, এর আগেও আমি একা আমার মেয়েকে নিয়ে নিউইয়র্ক গিয়েছি এবং মেয়েকে ছাড়া স্পেনে গিয়েছি। তখন তার মাথা আরও খারাপ হয়ে গেল। এটা কীভাবে সম্ভব?
আমি এটা কীভাবে পারলাম? এখন তার প্রশ্ন।

তারপর তিনি শুরু করলেন আফসোস। তার জীবনটা এখানেই শেষ। তিনি এতোদিন ধরে এদেশে আছেন, অথচ ইউরোপে কোথাও বেড়াতে যেতে পারেননি। তো আমি উনাকে বললাম, আপনাকে কে আটকে রেখেছে, আপনি যান। উনি স্বীকার করলেন, উনি ইংরেজি বলতে পারেন না, তাই কোথাও একা যেতে উনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।

আমি বললাম, এই দেশে এতো সুবিধা, এখানে বিনা পয়সায় ইংরেজি শিখায়, কেন আপনি শিখেন নাই? উনি লজ্জায় শিখেননি। এখন আসেন, আপনি মেলামেশা করেন কাদের সাথে? তারা কী ভাষায় কথা বলে? তারা বেশির ভাগ সিলটি এবং ইন্ডিয়ান ও পাকি। তাদের সাথে ফ্লুয়েন্ট হিন্দীতে কথা বলেন।

উনাকে আমি বললাম, আমি আসলে ভাগ্যবতী কেউ না। কারণ এদেশে আসার সাথে সাথে আপনার মাথার উপর ছাদ ছিল, উষ্ণ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত ঘর ছিল। একটি নিজস্ব রান্না ঘর ছিল, যেখানে আপনি গরম ভাত রান্না করে খেতে ও খাওয়াতে পারতেন। আপনি বাইরে পা রাখতেই গাড়ি দাঁড়ানো থাকতো। নিজেকে কোন দিন চালের বস্তাসহ বাজার টেনে নিয়ে ঘরে আনতে হয়নি। অসুস্থ হলে দেখার লোক ছিল।

এবার আমার কথা বলি। তারপর বিচার করেন কে ভাগ্যবতী! আমি এদেশে এসে প্রথমে একটা বাড়ির কিচেনে রাত কাটিয়েছি, কারণ থাকার কোনো জায়গা ছিল না। ঠাণ্ডায় এখনও আমার ঘাড় ব্যথা করে। যেহেতু কিচেনে থেকেছি, অনেকে ভোরে উঠে কাজে যেত, তাই আমাকেও ভোরে উঠে জায়গা ছেড়ে দিতে হতো। রাস্তাঘাট আমি ম্যাপ দেখে বাস ট্রেনে একশ বার ভুল করতে করতে তারপর চিনেছি। যখন থাকার মতো রুম পেয়েছি, সেখানে উঠে বাজার করেছি ইচ্ছেমতো। তারপর দেখি এগুলো বয়ে নিয়ে যেতে আমার দু হাত খসে পড়ে যাচ্ছে। ঠাণ্ডায় হাত কখন কেটে গিয়েছে নিজেও টের পাইনি। তখন যে ক্যাব ভাড়া করে বাড়ি যাবো, সেটাও মাথায় আসেনি। আসলেও টাকার অভাবে সে পথে পা বাড়াইনি। ধীরে ধীরে এই অচেনা শহরে বন্ধু করে নিয়েছি স্বজাতীয়দের নয়, বরং এদেশিয়দের। আজকে যা কিছু দেখছেন সব কিন্তু নিজের গড়া। কেউ আমাকে এখানে পৌঁছে দেয়নি।

আমার মেয়ের স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। শাপলা অরেঞ্জ ট্রি ক্লাস রুমের সামনে গিয়ে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আমি আমার মেয়েকে পেয়ে তাকে বিদায় জানিয়ে চলে এলাম।

আমি ফরচুনেট যে আমি অনেক দেশ বিদেশ ঘুরেছি। বিভিন্ন দেশে গিয়ে ফাইভ স্টার হোটেলে বিলাসিতা করতে নয় বরং প্রতিটা দেশের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, ইতিহাস এগুলো সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করেছি। অনেক আনন্দ করেছি, সবাই যখন বলে তুমি খুব ভাগ্যবতী, তুমি এতো দেশ ঘুরেছো একা একা, মেয়ে হয়েও যাযাবরের মতো ছুটে বেড়িয়েছো, কটা বাংগালী মেয়ে পারে এমন?

আমি তখন ভাবি, আমি যে তার মূল্য দিয়েছি কীভাবে, সেটা কেউ জানতে চায় না। কেউ জানে না যখন টিউশন ফি দিয়ে পকেটে একটি টাকাও নেই, তখন শুধু কর্মস্থলে ফ্রি কফি ব্রেড দিয়ে ভিজিয়ে খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। প্রচণ্ড শীতে বরফের রাতে গ্যাস ফুরিয়ে গেলে নাইট বাসে চড়ে শহরের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ঘুরেছি। শুধু বাসের ভিতর একটু উষ্ণতা পাবার জন্য। একবার অজ্ঞান হয়ে বাথরুমে পড়েছিলাম পুরো একদিন। দরজা ভেংগে আমাকে বের করে প্যারামেডিক্স। আমার বাড়িওয়ালা ওদের ফোন করে খবর দেয়।

আজও আমার গাড়িতে করে সপিং যেতে ইচ্ছে করে না। আমি হেঁটে নিজের বাজার নিজেই টানি। এখন আমি পুরোপুরি আত্মনির্ভরশীল। এটাই আমার পরম পাওয়া। আর হলিডে? আই হ্যাভ আর্নড ইট।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 617
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    617
    Shares

লেখাটি ৩,২৭৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.