অপেক্ষায় থাকে মেয়েটি ….

0

সোনালী সেন:

চ্যাটবক্সের সবুজ আলোটা দপ করে জ্বলেই নিভে যায়।
সাথে সাথে বেলার হৃদপিণ্ডটা কয়েকটা বিট মিস করে স্থানু হয়ে থাকে কয়েক সেকেন্ড। শুধু একটা নির্দিষ্ট ব্যক্তির ছবির নিচের সবুজ আলোটা দেখার জন্যেই সে চ্যাট বক্সটা খোলে। সারাদিন টুং টাং টুং টাং কত বার্তা, কত শত স্তুতি। কোনটা খুলে পড়তে ইচ্ছাও হয় না। মেসেজ নোটিফিকেশনও অফ করা। তবুও কী যেন তাকে দিয়ে প্রতি ঘন্টায় চ্যাটবক্সটা খোলায়।

“Was active 3h ago” আনমনে বেলা ভাবে। কী করছে সে এখন? এতো কী ব্যস্ততা? নাকি ইচ্ছে করে ভাব ধরে? কখনও সে মাহেন্দ্রক্ষণ আসে। সবুজ আলো জ্বলে দুদিকেই।

বুকের ভিতর আবার ধুপ ধাপ, হৃদপিণ্ডের লাব-ডাব শব্দটায় কে যেন চৌদ্দ পেয়ারের লাইনার সাউন্ডবক্স লাগিয়ে দিয়েছে। চোরা চোখে তাকায় বেলা, আশেপাশের কেউ শুনতে পেলো কি এই ধুক পুকুনি, কিংবা হঠাৎ মুখের এমন রং বদল। ইস্, সে ভারি বিশ্রী হবে!
তবুও তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছা করে ওই সবুজ আলোটার দিকে। কিছু একটা লিখতে গিয়ে হাত ভারি হয়ে আসে।
কী লিখবে ও! আচ্ছা, এইযে চ্যাটবক্সে বেলার জন্য অপেক্ষা করে আছে শত শত বার্তা। সৌন্দর্যের স্তুতিতে ভেসে যায় ইনব্ক্স আউটবক্সের শব্দগুলো। কত কত মানুষ কি ভীষণ ভাললাগা নিয়ে অপেক্ষা করে বেলার একটিমাত্র প্রতিউত্তরের জন্য।
বেলা জানে যে সে সুন্দর। প্রতিদিন হাজার হাজার চোখ তাকে স্মরণ করায় সে কথা। আচ্ছা, এইযে ফেসবুক জুড়ে
ওর এতো এতো ছবি, কত শত মন্তব্য, কত শত লাইকের বন্যা, কোনদিন কি সে একটা ছবিও দেখে না! অথচ তার ফ্রেন্ডলিস্টের শুরুতেই তো তার নামটা জ্বলজ্বল করে।

এইতো সেদিন তার কবিতায় বাসন্তী রঙা শাড়ি পরা মেয়েটির কথা লিখলো। বেলা কত খুঁজে পেতে সারা বাজার ঘুরে বাসন্তী রং শাড়ি কিনলো, খোলা চুলে পরলো কৃষ্ণচূড়ার থোকা। দীপুকে ভজিয়ে কতো সাধ্যসাধনা করে ছবিও তোলালো। ফেসবুকের পাতা আলোকিত করে সপ্তাহব্যপী সে ছবি ঘুরলো মহাসমারোহে। কত কত প্রশংসা!! কত কত স্তুতি!অথচ যার জন্য এতো আয়োজন সে কিনা!

মাঝে মাঝে খুব কান্না পায় বেলার, খুব। বড্ড বিষন্ন লাগে। আচ্ছা মানুষটার এতো অহংকার কেন? সে কি নিজে থেকে কিছু লিখবে? যদি রিপ্লাই না দেয়? ভীষণ ল্জ্জার হবে ব্যাপারটা। না, বেলা কিছুতেই পারবে না।
আচ্ছা, এটা কি ভালবাসা! নাকি ভালো লাগা! নাকি ছেলেমানুষি মোহ! বেলা জানে না। জানতে চায়ও না।

একদিন আবারও চ্যাটবক্সে সবুজ আলো জ্বলে। ভারি হয়ে আসা আঙ্গুলগুলো দিয়ে বেলা লিখলো, “কেমন আছেন?” দপ করে নিভলো ও প্রান্তের আলো। চ্যাটবক্সের কোনায় অবহেলায় পড়ে রইলো বেলার কাঁপা হাতের শব্দ দুটি।
কী ভীষণ অভদ্র লোকটা! মেসেজ সিন পর্যন্ত করলো না। অনুশোচনায় বেলার দিন আর কাটে না। না, এভাবে লেখাটা বোধ হয় ঠিক হলো না। নিজের হাত নিজেরই কামড়াতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু ছুঁড়ে দেওয়া তীর তো আর ফিরবার নয়। প্রতি ঘন্টায় মেসেজ চেক করে বেলা।

নাহ্, কোথাও নেই। কোন উত্তর নেই ও প্রান্তের। Active 8 hrs ago.
পাক্কা সাতাশ ঘন্টার মাথায় উত্তর এলো। রাত্তির বারোটায়। টুং করে একটা শব্দ। স্ক্রিনে সেই নামের পাশে নোটিফিকেশনে লেখা, “ভাল। আপনি?”

চিনচিনে ব্যথা বেলার বুক জুড়ে। সেইসাথে গলা বন্ধ করা অভিমান। না, কোথাও কোন দু:খ প্রকাশ নেই। কী ভয়াবহ নির্লিপ্ততা! যা অতিমাত্রায় ফর্মাল। বেলা মেসেজ সিন করবে না এতো তাড়াতাড়ি, কিছুতেই না।
দিন যায়, বেলার অভিমান ক্রমশ ফিকে হয়। সেখানে জায়গা করে নেয় এক অন্যরকম ভালো লাগা। দুটি শব্দে আটকে থাকে জীবন।

ফের একদিন সবুজ আলো জ্বলে। বেলা লিখলো, “আপনার কবিতা আমার ভীষণ প্রিয়। ভাল থাকবেন প্রিয় কবি।” এবারে সিন হলো প্রায় সাথে সাথে।
কবি লিখছে… বেলা তাকিয়ে আছে চ্যাটবক্সের দিকে।
….. is typing,….! অনন্তকাল বয়ে যাচ্ছে। বেলার বুকের শব্দগুলো দ্রুততর হচ্ছে, গাঢ়তর হচ্ছে গালের রং।

দীর্ঘসময় নিয়ে কবি লিখলেন, “আচ্ছা”।
সংক্ষিপ্ত উত্তর। একটি মাত্র শব্দ। কবির দ্বিধাগ্রস্ত আঙুলের দীর্ঘদ্যোতনায় একটিমাত্র শব্দে বেলা খুঁজে পেল তার অদৃশ্য বার্তার উত্তর।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 501
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    501
    Shares

লেখাটি ২,৮২০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.