একটি উড়োজাহাজ দুর্ঘটনা এবং দায়িত্বপরায়ণ আমরা

0

সালমা লুনা:

নেপালে দুর্ঘটনায় ছাব্বিশজন মানুষের মৃত্যুর আহাজারি কিছুটা থিতিয়ে এসেছে দেশে। শোকের প্রাথমিক তীব্রতা অনেকটাই কেটে গেছে আমাদের। মিডিয়া অনেক কাজ করেছে। দৌড়ঝাঁপ, ছুটোছুটি। তাদের ভূমিকা একেবারে খারাপ ছিলো না এক্ষেত্রে। কাজও আপাতত শেষ।
আহতরা ফিরছেন।

উড়োজাহাজ কর্তৃপক্ষ ইউএস বাংলা এখন পর্যন্ত বেশ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। চিকিৎসার ভার, দেশে ফিরিয়ে আনা, আত্মীয় পরিজনদের কাছে গিয়ে দুঃখপ্রকাশ, সর্বোপরি নিহত পাইলটের পাশে থাকা, এসবই দেখলো দেশবাসী।
এখন শুধু দুর্ঘটনায় পতিত মানুষগুলো এবং তাদের স্বজনদের জন্যই তোলা রইলো সারাজীবনের শোক।

এই কদিন তো হতাহতদের স্বজনদের শোক করারও সময় ছিলো না। পরিবার সামলাতে হয়েছে, উৎসুক মানুষ, মিডিয়া সামলানোর পাশাপাশি ছুটতে হয়েছে দেশ পেরিয়ে আরেক দেশে।
সামলাতে হয়েছে নিজ দেশের সরকারি ব্যবস্থা, উড়োজাহাজের মালিক পক্ষ, ভিন দেশের সরকার এবং হসপিটালসহ বিমানবন্দরের নানান বিষয়াদি – অনেক বড় বড় ব্যাপার।

মৃত্যুর শোক করা তাই খুব সহজ ছিলো না তাদের জন্য। এরই মাঝেই কত কথা! এসবও তো সইতে হয়েছে তাদের। বেদনা আরো ভারি হয়েছে হয়তো।

পাইলটের দোষ, নাকি উড়োজাহাজ কর্তৃপক্ষের! ওই দেশের এয়ারপোর্ট অথরিটি নাকি খোদ এয়ারপোর্টেরই।
মেয়ে পাইলট নিয়েও তো কত কথা! মেয়ে পাইলটটি কীভাবে ‘ডটার অব বাংলাদেশ’ খেতাব পেলো, আসলেই কী পেলো কীনা এসব আলোচনাও শেষ হয়েছে।

কিন্তু আমার ব্যক্তিগত দুঃখশোক উপচে উঠছে। সেইসাথে প্লেনে চড়ার আতঙ্ক। কিছুতেই মনকে বাগে আনতে পারছি না।

এঘটনার একদিন আগেই মিরপুরের পল্লবিতে বস্তিতে আগুন লেগেছিলো। বস্তি খালি হবে কীনা, এজন্যই আগুন জ্বললো কীনা এসব আলোচনা শুরুর আগেই নেপালে প্লেন বিধ্বস্ত হলো।

শুরু হলো অন্য আলোচনা।

দেখলাম মানুষ মৃত্যুরও ভেদাভেদ করে। বুর্জোয়া ব্যবস্থা বলে সরকারের দিকে আঙ্গুল তুলতে গিয়ে কেউ কেউ প্লেন দুর্ঘটনায় মৃত্যুগুলোকে বড়লোকের মৃত্যু বলেও আখ্যা দিলেন, উপহাসও হলো কিছু।

মিরপুরের বস্তির আগুনে জমিলা নামে একজন ষাটোর্ধ বৃদ্ধা চিকিৎসাধীন অবস্থায় চারদিন পর হাসপাতালে মারা গেছেন।

ফেসবুক উপচে উঠলো,
মিরপুরের আগুনে পুড়ে যাওয়া বস্তির গরিব মানুষগুলোর মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর দুঃখ বেশি! নাকি জীবন্ত পুড়ে মরে যাওয়া দুই শিশুসহ উড়োজাহাজের ছাব্বিশজন বাংলাদেশী বড়লোকের জন্য গৃহীত শোকদিবস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এইসব দেখতে দেখতে বেশ আতঙ্ক হচ্ছিলো। আতঙ্ক আর বড় বেশি শোক উথলে উঠছিলো নিজের জন্য।

আমার জন্মমৃত্যু কোনটার উপরেই আমার হাত নেই। আবার আমি যে জীবন যাপন করি এটি কারো পড়ে পাওয়া দান নয়। নয় কারো উৎসর্গ করা জীবনের উপহার। আমি তো আমার মতো করেই উপভোগ করি এই জীবন। এই আমি যদি এখন স্বামী সন্তান নিয়ে কোথাও ভ্রমণে গিয়ে হঠাতই প্লেন দুর্ঘটনায় সপরিবার মরে যাই, তাহলে কিছু মানুষ কী সব মন্তব্য করবে, বা করতে পারে আমার জানা হয়ে গেলো।
আমিও তো যাবার সময় ছেলেমেয়ে নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে ছবি পোস্ট করি যেন আমার আপনজনেরা যারা উদ্বিগ্ন সময় কাটাবে আমরা গন্তব্যে না পৌছানো পর্যন্ত, তারা অন্তত ফেসবুক থেকে জানবে। ভ্রমণে আমার পরনেও থাকে শখ বা সুবিধার জন্য পরা জিনস-টপস। এরা তখন প্লেন দুর্ঘটনার পর আমার ছবি ভাইরাল হলে আমার পোশাকটাকেই কেউ দায়ী করবে। কিংবা কেউ বড়লোকি প্লেন ভ্রমণটাকে।

মাসখানেক আগে ছোট বোনটা গেলো ক্যালগেরি, স্বামীর কাছে। সে যথাসময়ে দুটো ট্রানজিট হংকং আর টরন্টো থেকে ফেসবুকে আপডেট দেয়নি বা জানানোর ফুরসত পায়নি বলে রেগে গিয়েছিলাম। মেসেঞ্জারে কথা বলতে গিয়ে বোনকে বললাম, আপডেট দিলে অন্তত জানতে তো পারতাম কখন পৌঁছালে বা ঠিকমতো পৌঁছালে কীনা!

এগুলো তাহলে করা ঠিক হবে না আর। কারণ একটা বৃহৎ সংখ্যক লোক এইগুলো দেখে ভাবে, আমাদের মতো মানুষদের জন্যই দুর্ঘটনা ঘটে। এবং আরেকটা সংখ্যা ভাবে প্লেনে যেহেতু চড়ে, তাই এরা বড়লোক। এবং এইসব বড়লোকদের মৃত্যু হলেই বা কী! বস্তিবাসীদের মৃত্যুই মৃত্যু এবং সেই মৃত্যুই আলোচনাযোগ্য কিংবা শোকে আকুল হবার মতো।

এইগুলো নিয়ে এতো কথা হয়েছে যে এখন কারো আর কিছুই জানতে বাকি নাই। অন্তত যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সামাজিকতা রক্ষা(!) করে চলেন তারা সবই জানেন।

খুবই দুঃখ লাগছে দেখে যে, মানুষগুলো এখনো তাদের মৃত প্রিয়জনদের প্রাণহীন দেহগুলো দেশে ফিরে পায়নি। পুড়ে যাওয়া ক্ষতবিক্ষত প্রাণহীন শরীরটা, কারো কারো ক্ষেত্রে দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনতে এখনো আরো কয়েকটা দিনের দুঃসহ অপেক্ষা।
এরই মাঝে চলছে ঘৃণ্য এক খেলা। শুরু থেকেই পাইলট, কো-পাইলট, কেবিন ক্রু নাবিলাকে নিয়ে কিছু লেখালিখি দেখা যাচ্ছিলো। পাইলটকে তো ভিলেনই বানানোর পাঁয়তারা চলছিলো বিভিন্ন চ্যানেলে। তারা বিশেষজ্ঞ ডেকে, সিনিয়র পাইলটদের ডেকে রীতিমতো আদালত বসিয়ে তাতে অদৃশ্য কাঠগড়ায় অদৃশ্য পাইলটকে আসামী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দোষী বা প্রায় দোষী সাব্যস্তও করে ফেলছিলেন।

তারা কেউই ভাবেননি তারও পরিবার আছে। স্বজনরা, তার স্ত্রী তার শোকাকুল একমাত্র পুত্রের কাছে এই ঘটনাগুলো কেমন বেদনাদায়ক হতে পারে!
পৃথুলার পাশে তখন প্রায় সকলেই দাঁড়িয়েছেন। কেউ কেউ পৃথুলার মর্মান্তিক মৃত্যুকে আরো বেদনাদায়ক করতে নাবিলার ফুটফুটে মেয়েটিকে পৃথুলার মেয়ে বলেও প্রচার করেছেন। কিন্তু পাইলট বা ক্রু নাবিলার পাশে কেউ দাঁড়িয়েছেন তেমনটা দেখা যায়নি।

কেউ বলেননি, আহা! পাইলট আবেদ যখন বুঝতে পেরেছিলেন তিনি প্লেনটিকে আর বাঁচাতে পারবেন না, তখন কি তার প্রাণপ্রিয় পুত্রের মুখখানি প্রিয়তম স্ত্রীর মুখখানি ভেসে উঠেছিলো চোখে!
নাহ্। এমনটা নয়, বরং উল্টোটাই দেখা গেছে।

এখন তো ক্রু নাবিলার চরিত্র নিয়ে চলছে কাটাছেঁড়া। পৃথুলাকে যা বলতে পারেনি, তাও নাবিলাকে নিয়ে বলা সহজ হবে। তার তো আগেপিছে কেউ নেই। সে অসাধারণ কোনো নারী তো নয়। এক অতি সাধারণ কেবিন ক্রু। শুধু নাবিলা না, শুরু হয়েছে সেইসব নারীদের নিয়ে রগরগে তামাশা – যারা বন্ধুর সাথে নেপাল ভ্রমণে গিয়েছিলেন। যা যা তখন সম্ভব ছিলো না, এখন তা আস্তে-ধীরে করা সম্ভব হবে।

এইসব দেখছি আর ভাবছি।
সত্যিই বিধাতা বাঙালিদের এক অদ্ভুত যতনে বানিয়েছেন।

এমন যতনে সম্ভবত আর কোন দেশের মানুষকেই বানাননি যারা মানুষের ঘরে উঁকি দিতে দিতে, অন্যের পোশাক টেনে খুলে লজ্জাহীনতার কথা বলতে বলতে নিজেকে কতটা নির্লজ্জ করে তোলে, নিজের পেছনটাই কতটা উদোম করে ফেলে তা তারা বুঝতেই পারেনা। নিজেকে তখন কেমন কদাকার দেখায় তাও তারা জানতেই পারে না! তারা যেমনই শিক্ষিত হোক, যেখানেই থাকুক না কেন তাদের এই বাঙালিপনা অক্ষয় কোম্পানির তৈরি।
আফসোস!

আজ মনটা ভারাক্রান্ত হলো আরেকটা খবরে। পাইলট আবেদ সুলতান এর স্ত্রী স্বামীর এই মর্মান্তিক প্রস্থান মেনে নিতে পারেননি সম্ভবত। আজকেই তিনি ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে হসপিটালে আইসিইউতে আছেন।

আবেদ সুলতানের কিশোর পুত্রের কথা ভেবে মনটা ভীষণই ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে। থেকে থেকে মনে পড়ছে টিভিতে দেখা সেই বুকভাঙা দৃশ্যটা – নির্বাক মিসেস আবেদের হাত ধরে বসে আছে তার কিশোর পুত্র। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে।

প্রার্থনা করছি ভীষণভাবে, তিনি সুস্থ হয়ে ছেলেটার কাছে ফিরে আসুন। বড় হবার পথে ছেলেটার যে ভীষণ দরকার হবে তাকে, ছেলের হাতটা শক্ত করে ধরে থাকবার জন্যে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 239
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    239
    Shares

লেখাটি ৯০৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.