শ্রমের বাছবিচার করে নারীবাদ কায়েম হবে না

আনন্দময়ী মজুমদার:

যখন দেখবো মেয়েদের একটা কমপ্লিট প্রতিবেশ বলে গণ্য করা হচ্ছে, স্বয়ংসম্পূর্ণ, স্বয়ম্ভূ, সংসারে একা থাকা, বা পুরুষ ছাড়া থাকা ডালভাত হয়ে গেছে, সেটা নিয়ে কৌতূহলী গুঞ্জন, সমালোচনার বিষ ছড়াচ্ছে না, রাতে স্টেশনে একটা মেয়ে আটকে পড়লে নিরাপত্তা নিয়ে ভয় পেতে হচ্ছে না – আমেলি ছবিতে নায়িকার মতো দিব্যি ঘুমিয়ে পড়তে পারছে স্টেশনে, যখন দেখবো মা-দের সঙ্গে সন্তানদের এই ‘পূত:পবিত্র’ কাব্যিক বিশেষণে ঋদ্ধ, ‘অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক’ কে আইনের বাস্তব অধিকারে রূপান্তরিত করা হয়েছে, সেই সম্পর্কের জন্য তাকে সমাজ ও আইন মর্যাদা দিচ্ছে, যখন দেখবো সম্পত্তির অধিকারে তার অগ্রাধিকার আছে, যখন দেখবো চাকরিতে মা-রা সমীহ ও সাপোর্ট পাচ্ছেন, দরকারে ছুটি পাচ্ছেন, যখন দেখব মেয়েদের একা পেয়ে পিছনে পিছনে সুবিধাবাদী মানুষ ঘুরে ঘুরে তাদের জীবন ও স্পেইসে হানা দিচ্ছে না, বাগে না পেলে, তার ওপর শাস্তি নির্যাতন ও অভিযোগের পাহাড় গড়ে তুলছে না, যখন ঘরে ও বাইরে তার জীবিকা ও জীবন সে যে-ভাবে চায় শিল্পিত ও রূপায়িত করার জন্য শাস্তি পাচ্ছে না, আর ঘরে যখন পরিবারের সকল সদস্য সংসারের তাবৎ কাজ, দৈনন্দিন পরিচালনা, লালনপালন, রান্নাবান্নার জন্য স্টিরিওটাইপ ভেঙে আন্তরিকভাবে কাজে লেগে গেছে, লিঙ্গ-নির্বিশেষে, তখন নারীবাদ নিয়ে কথা বলার হয়ত দরকার থাকবে না।

***

পুনশ্চ: ভেবেছিলাম আমার প্রথম সন্তান মেয়ে হবে। হয়নি যখন আফসোস মুছে গেছে কবেই। খেয়াল করে দেখলাম সে ঘর ঝাড়ু দিতে ভালোবাসে দুই বছর থেকে, চা বানিয়ে দেয় চার বছর থেকে, বিছানা ঝাড়ে ও মশারির দড়ি খুঁজে দেয় চার বছর থেকে, আর আয়না পরিষ্কার করে পাঁচ বছর থেকে। সে রান্না শিখতে চায় ছোট থেকেই, সে লিটল মিস্টার হেল্পফুল হতে চায়, বাগান ভালোবাসে, পশুপাখি ভালোবাসে, আর মনে করিয়ে দিলে (মিস্টার মেসি বলে ক্ষ্যাপালে) ঘর গুছিয়ে রাখে।

আমরা মনে করি না এগুলি এমনি এমনি হয়েছে বা হয়।

আমরা ছেলে বলে ওকে দূরে সরিয়ে রাখিনি, অসংবেদনশীল বা আনাড়ি একটা মানুষ তৈরি করতে চাইনি। বন্ধু হিসেবে দেখতে চেয়েছি। চেয়েছেন ওর কেয়ার গিভার আর যারা আছেন। ‘সব কাজে হাত লাগাই মোরা, বাধাবাঁধন নেই গো নেই’ — শিখেছিলাম ছোটবেলায় – যা শিখেছিলাম তা আত্মীকরণ করেছিলাম কিছুটা।

কোন কাজ মেয়েদের, আর কোন কাজ পুরুষের এই বিভেদ দেখলেই আশ্চর্য হয়ে পড়ি।

সেলফিশ জীনের নাম করে বিজ্ঞান-মনস্করা কী সুন্দর হাত গুটিয়ে নিচ্ছেন সংসারের কাজকর্ম থেকে, লালনপালনের দায়িত্ব থেকে, আর ধর্মের বালাই দিয়ে বা না দিয়ে মেল ইগো কীভাবে উড়ছে হিলিয়াম বেলুনের মতো।

বাজারের হাতে নিয়ে প্যাচপ্যাচে কাদায় বাজারে ছোটাছুটি করতে করতে মনে হয়েছে, আমরা তো নিজেকে বাঁচাবার চেষ্টা করিনি কষ্ট আর সংগ্রাম থেকে।

মাছের বাজার থেকে ফিরে গিয়ে কবিতা অনুবাদ করতে বা আস্বাদন করতেও সমস্যা হয়েছে বলে মনে পড়ে না।

কাজ এড়িয়ে চলা ফাঁকিবাজ, সে মেয়ে হোক, আর পুরুষ, তাঁদের দিয়ে সাংস্কৃতিক বিপ্লব হবে না। মূল্যবোধের পরিবর্তনে শ্রমের মর্যাদা কেন্দ্রে আসতে হবে। যে শ্রম করে, তাঁকে শ্রদ্ধা করা যায়, যে শ্রমের বাছবিচার করে না, তাঁকে আরও। মেয়ে পুরুষ নির্বিশেষে।

আমাদের দাদা কুনাল ঘোষ শুনেছি সাম্যবাদের কমিটমেন্ট থেকে সোনার ক্যারিয়ার ছেড়ে একদা রাস্তায় রাস্তায় পাথর ভেঙেছেন, আমাদের সামনে তিনি বাড়ির সবচেয়ে ময়লা কাজটাও করেছেন। তিনি কারনেগিমেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসাইটে প্রফেসর এবং উপ-চেয়ার। তিনি বলার মতো অনেক কিছু। আমার বৌদি তারই মতো গুণী ও শ্রমী, কিন্তু মেয়েদের ব্যাপারে এসব আর কে বলতে যায়, বলুন? বউদির কথা শুনে অবাক হবেন না জানি। তবে পুরুষদের মধ্যে এমন হয় না তাই এই ঘটনাকে সকলে অস্বাভাবিক মহত্বের ব্যাপার বলে ধরে নেবেন। নিজে রান্না করতে পারেন না, এই দুঃখে দাদা বউদির সঙ্গে রান্নাঘরে থেকে বাসন মেজে দিতে দেখেছি।

তো – এরা যদি পারেন, তাহলে আর কোনো কৈফিয়ত ধোপে টেকে না। বড়ো হতে গেলে ছোট হতে হবে, এ তো জানা কথা।

এই স্বাভাবিকতা যতদিন না আসে, মেয়েদের আর পুরুষদের অর্ধ নারীশ্বর বা ঐশী প্রাণী হিসেবে নিজেদের কাছে নিজেদের স্বীকৃতি মিলছে না।

শেয়ার করুন:
  • 99
  •  
  •  
  •  
  •  
    99
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.