আমার মত আমার পথ, আপনারটা আপনার

লায়লা আঞ্জুমান ঊর্মি:

নিজেকে জানার প্রচণ্ড অনাগ্রহ থাকা সত্ত্বেও, এমনকি নিজের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত উদাসীন হয়েও সমগ্র সৃষ্টিজগৎ নিয়ে উৎসুক হয়ে নানা রকম প্রশ্ন, বিশ্লেষণ, ব্যবচ্ছেদমূলক থিউরি প্রদান করতে বাঙালির মতো এমন অগ্রসর জাতি সমস্ত সভ্যতাজুড়ে আর একটাও খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা, আমার সন্দেহ আছে।

অন্যে কী করবে, কী করবে না
কখন করবে, কখন করবে না
কেনো করবে, কেনো করবে না
কীভাবে করবে, কীভাবে করবে না
আর যদি কেও কিছু করেই ফেলে
তবে তা কেন করেছে?
কীসের জন্যে করেছে?
কার জন্য করেছে?
কখন করেছে?
কাকে সাথে নিয়ে করেছে?
কোথায় করেছে?
এমন শত সহস্র প্রশ্নবাণে গোটা বিশ্বসংসারকে জর্জরিত করতে কখনোই পশ্চাৎপদ হয় না এই জাতি।

এই অতি উৎসুক জাতি অন্যের চিন্তা – ভাবনা, আবেগ-অনুভূতি, সুখ-দুঃখ এমনকি শোক পালনের উপরও নিয়ন্ত্রণ পালন করতে ঝাপিয়ে পড়ে।
কে, কোন বিষয়ে শোক করবে, কি করবে না তা-ও ঠিক করে দেবার গুরুদায়িত্ব নিজের ঘাড়ে জোড় করে টেনে নেবার হাস্যকর অথচ বিরক্তিপূর্ণ কাজটিও তারা সানন্দে করে ফেলে। মিরপুর না নেপাল—কোন ঘটনা কাকে কতটা স্পর্শ করবে তাও তারাই তাদের ইচ্ছেমতো ঠিক করে দেবার চেষ্টা করে। মিরপুর নিয়ে শোক পালন করবে, নাকি নেপালের বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে শোক পালন করবে, এটাও তারা ফিক্সড করে দেবার জন্য শশব্যস্ত হয়ে গেছে।
সবকিছুতে দলাদলি করতে অভ্যস্ত আমরা। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্য, আস্তিক, নাস্তিক এসব দল ও উপদলে বিভক্ত আমরা।

তাই তো বিমান দুর্ঘটনা নিয়ে শোক প্রকাশ করতে গিয়ে সুনির্দিষ্ট কারণ না জেনেও কো- পাইলট হিসেবে দায়িত্বে থাকা নারীটিকে নিয়ে গালাগালি ও কটূক্তি করে সমস্ত মৃত্যুর দায়ভার তার কাঁধে তুলে দিই। অথচ আবার যখন জানতে পারি যে, নিজের জীবনের বিনিময়ে ১০ জন নেপালির জীবন বাঁচিয়েছেন কো-পাইলট পৃথুলা রশীদ, নেপাল ও ভারতের মিডিয়া, সামাজিক মাধ্যম তাঁকে ইতিমধ্যে সম্মানার্থে ‘ডটার অফ বাংলাদেশ’ বলছে, বীর হিসেবে উপস্থাপন করছে, শ্রদ্ধা জানাচ্ছে, তখন দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে আমরা কজন নেক আমলধারী মুমিন বাঙালি জাতি বের করলাম, কোন নারী যেনো হানিমুন করতে নেপাল যাবার জন্য বিমানে চড়ে বসেছে, সেই নারীই এর জন্য দায়ী। সত্যিই কি তাই?

আর মিরপুর বস্তিতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাকেও কিছু উচ্চ ফলনশীল বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় বিরোধী দলীয় নেত্রীর জামিন পাবার বিষয়ের সাথে এক করে গুলিয়ে তাদের ডিপ্রেশন জনিত উচ্ছিষ্ট সদৃশ স্ট্যাটাসে আপডেট দিয়ে জাতিকে গর্বিত করেছেন।

কিছুদিন আগে জাফর ইকবাল স্যারকে যখন ছুরিকাঘাত তরে আহত করা হয়েছে তখনো দলাদলি দেখেছি। সে হলো আস্তিক – নাস্তিক দলাদলি।

অর্থাৎ তিনি আস্তিক, নাকি নাস্তিক এটা নিয়ে বাঙালি তোলপাড় শুরু করে দিল। তারা ভাবে আস্তিক লোকের জন্য শুধু এই পৃথিবীর আলো, বাতাস। আর যদি নাস্তিক হয়, তবে পৃথিবীর আলো বাতাস তার জন্যে হারাম। এর অর্থ হলো নাস্তিক ব্যক্তিকে হত্যা করা জায়েজ।

একটা মানুষকে এই ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে মেরে ফেলা বা মেরে ফেলার চেষ্টা করা কতটা ধার্মিক মনোভাব জনিত বা কতটা মানবিক বোধজনিত বা কতটা বেআাইনি, তা নিয়ে আমারা অধিকাংশই মাথা ঘামাতে ভুলে গেলাম।

যদি তাদের কথা ধরেও বিচার করি তবেওতো নাস্তিক ব্যক্তির জীবন নিয়ে ছিনিমিনি করার অধিকার কোনো আস্তিকের উপর বর্তায় না। কারণ সে জন্যে তো সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা আছেনই। তিঁনি তবে নাস্তিকদের পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারতেন। তাঁর তো এক মুহূর্ত সময়ও ব্যয় হবে না, ছুরি-চাপাতিও লাগবে না এ কাজে। তবে আমরা কেনো অন্যের বেঁচে থাকার উপরও অধিকার ফলাবো?

এবার আসা যাক সৃষ্টিতত্ত্বের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, স্টিফেন হকিং প্রসঙ্গে। এখানেও দলাদলির মশাল দাও দাও করে জ্বলছে।

এখানে একদল বলছে_ যেহেতু হকিং সাহেবের পরলোকে বিশ্বাস ছিলো না, তাই মৃত্যুর পর তিনি কোন লোকে পলায়ন করেছে, তা নিয়ে তারা চিন্তিত।

আরেক দল পরলোকের দরজায় ধর্মঘট পালনে ব্যতিব্যস্ত। কারণ একটাই, নাস্তিক হকিং সাহেব ভুলে আবার যেনো পরলোকে প্রবেশ করে না ফেলেন, সেটাই ভয়। এ দল হকিং সাহেবের মৃত্যুতে বিশেষ প্রসন্ন। কারণ একজন নাস্তিক কমে যাবার আনন্দ।

আরেক দল আছে তারা আবার অতি ভাঁড় এবং বুদ্ধিজীবী পর্যায়ের। তাদের ভাষ্য মতে, হকিং সাহেবের আত্মার জন্য শান্তি প্রার্থনা করা যাবে না, তা করলে বিজ্ঞানী হকিং সাহেবকে নাকি অপমান করা হবে। কারণ তিনি তো আর আত্মায় বিশ্বাস রাখতেন না।

তাদের কে বোঝাবে যে, যার যার বিশ্বাস তার তার কাছে। প্রতিটা মানুষ একভাবে অনুভব করতে পারে না। প্রত্যেকের অনুভূতি আলাদা। এখানে আপনি, আমি, আমরা কেউই অন্য কারো অনুভূতি, ইচ্ছা, অনিচ্ছা নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার রাখি না। একে অন্যের মত-পথ ভিন্ন হতেই পারে। আমি আমার মত নিয়ে আমার বিশ্বাসের পথে চলে অন্যকেও যেনো নিজের মত নিয়ে নিজের বিশ্বাসের পথে চলতে দিই।

এটুকুই চাওয়া।

শেয়ার করুন:
  • 174
  •  
  •  
  •  
  •  
    174
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.