মা হতে কতোটা প্রস্তুত আপনি?

ইসাবেল রোজ:

আমাদের এই জনবহুল দেশে খুব অল্প বয়সেই কিছু বুঝে উঠার আগেই আমরা মা হয়ে যাই। বাংলাদেশে খুব কম সংখ্যক মা বা নারী আছেন, যিনি মা হবার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে মা হবার সৌভাগ্য অর্জন করেন। আমাদের দেশের শিক্ষিত মেয়েরা বিয়ে করে ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যে। আরেকটি শ্রেণির বিয়ে হয়ে যায় ১৫ থেকে ২০ এর মধ্যেই। এই দুই শ্রেণির মধ্যে একটা বিষয়েই মিল খুঁজে পাওয়া যায়, সেটা হলো উভয় শ্রেণির নারীরাই কোন প্রকার প্রস্তুতি ছাড়াই মা হয়ে যান। বা হতে বাধ্য হয়।

আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত নারীদের বিয়ের দুই বছরের মধ্যেই সন্তানের মা হবে বলে পরিবার-পরিজন আশা করে থাকে। সেক্ষেত্রে মেয়েটির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে কখনই আমলে নেয়া হয় না। এটা অনেকটা কম্পিউটারের বাই ডিফল্টের মতোন। বিয়ে হয়েছে, এখন বাচ্চা জন্ম হবে, এটাই স্বাভাবিক। কেউ জানতেও চাইবে না আপনি মানসিক দিক দিয়ে কতোটা প্রস্তুত? আপনি আদৌ প্রস্তুত কিনা!

সন্তানের দায়িত্ব কিন্তু সারাজীবনের। উন্নত দেশে আমরা দেখি সন্তানকে প্রাপ্ত বয়স্ক হবার পর নিজের ভাগ্য নিজেকে গড়ে নিতে দেয়া হয়। আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে সন্তান ছেলে হলে কিছুটা ছাড় পায়, কিন্তু মেয়ে হলে তার দায়িত্ব হয়ে উঠে সাংঘাতিক।

প্রতিটা নারীকে সন্তান পালনের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হয়। এটা প্রতিটি নারীর জন্মগত দায়িত্ব। সন্তান ধারণের আগে ও পরে যে শারিরীক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নারীর শরীর ও মন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অপরিচিতভাবে বিকশিত হয়, সেই সম্পর্কে খুব কম নারী অবগত থাকেন।

আমরা বাঙালীরা মনে করি, সংসারে অশান্তি? একটা সন্তান হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। সংসারে স্বামীর মন নেই, দাও সন্তান জন্ম, সব ঠিক হয়ে যাবে। আসলেই কি হয় সব ঠিক? অনেকে ভালবাসায় পূর্ণতা পেতে বাচ্চা নিয়ে ফেলেন। কিন্তু এটার জন্য মানসিক প্রস্তুতি বা পরিকল্পনা দরকার সেটি সম্পর্কে ভাবেন না।

এর ফলাফল হয় ভয়াবহ। আপনি প্রি এন্ড পোস্ট নেটাল ডিপ্রেশন নামক মনোরোগে ভুগতে পারেন। অর্থাৎ সন্তান জন্মের পূর্বে ও পরে আপনি বিষন্নতা অনুভব করতে পারেন। আপনার এক সময়ে সব কিছুকেই অসহ্য মনে হতে পারে। আপনি অতিরিক্ত রাত জাগার কারণে অথবা সন্তান লালন-পালনে ব্যস্ততার দরুন নিজকে বিচ্ছিন্ন ভাবতে পারেন। আপনি বেবী ব্লু নামক বিষন্নতায় ভুগে নিজের ভেতরে নিজ ক্ষতি করার মতো মানসিক প্রবৃত্তি গড়ে তুলতে পারেন। আপনার চারপাশে যারা আপনার সন্তানকে নিয়ে আহ্লাদিত, তারা কেউ কিন্তু আপনার এই মন খারাপের কারণ খুঁজে পাবে না। তারা উল্টো আপনাকে দোষারোপ করবে আপনি কেন ব্যর্থ হচ্ছেন সন্তান লালন-পালনে।

আপনার শরীরের অতিরিক্ত মেদ আপনাকে ভাবিয়ে তুলতে পারে। আপনি নিজেকে তখন কুৎসিত ও অবাঞ্ছিত ভাবা শুরু করতে পারেন। যারা প্রথমবার মা হোন, তারা কিন্তু এসমস্ত পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কোনো ধারণা ছাড়াই মা হয়ে যান।

ইউকে’তে একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছে যারা ৩০ বছরের পর মা হোন, তারা ৩০ বছরের নিচের মায়েদের তুলনায় অনেক ধৈর্য্যশীল হোন এবং তাদের সন্তানরাও বেশি সুখী হয়ে থাকে। যেহেতু আমাদের দেশের মেয়েরা কিছু না বুঝতেই মা হয়ে যায়, তাদের সাথে বাচ্চাদের একটা পর্যায়ে মানসিক দূরত্ব চলে আসে। কারণ একটাই। একটি মা অনেক সংগ্রাম করে তিলে তিলে নিজে বিষন্নতায় ভুগে সন্তান লালন-পালনসহ সংসারের সবরকম দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হয়।

ধরা যাক সেই মা একজন শেষ বর্ষের ছাত্রী অথবা কর্মজীবী নারী। তার সমস্ত সংগ্রামের উৎস হয়ে উঠে সেই সন্তান। সন্তানের মুখ চেয়ে বাংগালি মেয়েরা সংসার আঁকড়ে ধরে রাখতে চায়। নারীর মানসিক চাপ কিংবা মানসিক রোগের কারণ কখনো পারিবারিকভাবে কেউ স্বীকার করে না। চিকিৎসার কথা না হয় ছেড়েই দিলাম।

একটু অধিকার সম্পর্কে সচেতন হলে কিন্তু এই মানসিক কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে পারেন। আপনি আপনার স্বামীকে খুলে বলুন, আপনি বাচ্চার ব্যপারে কতটা প্রস্তুত। নিজের মনে একটি লিস্ট তৈরি করুন আপনি আপনার কোন দিক থেকে কতোটা ছাড় দিতে প্রস্তুত? নিজের প্রতি এবং বাচ্চার প্রতি যত্ন নেয়ার মতো ধৈর্য্য আপনার মধ্যে কতোখানি? নিজেকে নিজে মুল্যায়ন করুন। যদি মনে করেন আপনি তৈরি নন, আরও সময় দরকার, তাহলে নিজ দায়িত্বে নিজকে অন্ত:সত্ত্বা হতে রক্ষা করুন। নিজে সিদ্ধান্ত নিন, অথবা পরামর্শ করুন। আপনি মা হবেন, কাজেই আপনাকেই হতে হবে তৎপর।

যে সকল লক্ষণ অনুভব করলে আপনি বুঝবেন যে আপনি মনোরোগে ভুগছেন:
১) আপনি সবসময় শারীরিকভাবে অবসন্নতা অনুভব করবেন।
২)আপনার হঠাৎ করেই খাওয়ার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যাবে। যেটাকে ‘প্লেজার ইটিং’ বলা হয়ে থাকে.আপনি যদি বুকের দুধ সন্তানকে খাওয়ান, তাহলে আপনার এমনিতেই ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্ত লাগবে। কিন্তু আপনার খাওয়ার মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে শরীরের ওজন বাড়তে থাকবে।
৩)আপনার খাবারের প্রতি অনীহা দেখা দিতে পারে।
৪)আপনার প্রচণ্ড কান্না বা মন খারাপ হবে, মাঝে মাঝে নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা দেখা দিবে।
৫)আপনার নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হবে, মনে হবে আপনি কোথাও চলে গেলেই সবাই খুশি হবে। ভালো থাকবে।
৬)আপনার মধ্যে সুইসাইড টেন্ডেন্সি গ্রো বা প্রবল আত্মহত্যার ইচ্ছে জাগ্রত হতে পারে।
৭)নিজেকে কুৎসিত, অবাঞ্ছিত মনে হবে। কোনো কাছের মানুষের সান্নিধ্য ভালো লাগবে না।

মানসিক বিষন্নতা দূরীকরণের সবচেয়ে ফলপ্রসু পন্থা হলো নিজের সন্তানকে দেয়া সময়টাকে উপভোগ করা। দ্বিতীয় উপায় হলো নিজের জন্য কিছু সময় ব্যয় করা। যেখানে শুধুই আপনি আপনার নিজের সাথে সময় দিবেন। এটা হতে পারে এক কাপ চা এবং রবীন্দ্র সংগীত, হতে পারে নির্জনে একটু পায়চারি করা, হতে পারে নাচ, গান, কবিতা অথবা বই। নিজের পছন্দ মতো যেটা খুশি বেছে নিন।

বিষন্নতাকে জয় করার আরেকটা উপায় নিজের প্যাশন খুঁজে পাওয়া। এমন কিছু আপনি খুঁজে বের করুন যেটা আপনাকে মানসিক শান্তি দেয়। সেটা হতে পারে রান্না, সেটা হতে পারে ভাষা শিক্ষা, হতে পারে প্রিয় বন্ধুদের সাথে আড্ডা। এমন বন্ধু বা আত্মীয়কে এড়িয়ে চলুন যে আপনাকে মানসিক চাপে রাখতে পারে।

মাতৃত্ব মানেই সারা জীবনের জন্য জুড়ে যাওয়া আরেকটি নতুন জীবন। মাতৃত্ব দায়িত্বের। মাতৃত্ব আনন্দের। সচেতন মা এবং সুখী সন্তানরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

শেয়ার করুন:
  • 399
  •  
  •  
  •  
  •  
    399
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.