নিরপেক্ষতা এবং সুসম্পর্ক স্পিকারের বড় চ্যালেঞ্জ

0
shirin sharomin

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী

নাহিদ সুলতানা: সংসদ সদস্যদের সঙ্গে একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করা, নিরপেক্ষ থেকে প্রত্যেকের সঙ্গে একটা সুসম্পর্ক গড়ে তোলাকে একজন স্পিকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন জাতীয় সংসদের প্রথম নারী স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। তিনি বলেন, সংসদের সকল সদস্যের আস্থা অর্জন এবং সে আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে স্পিকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এক সাক্ষাতকারে তিনি আরও বলেন, শুধু নেতৃত্বের পদ দিয়ে নারীদের বিচার করলেই হবে না। নারীরা আজ সবজায়গায় এগিয়ে আছেন। আমরা যদি গণমাধ্যমের কথা বলি, সেখানে প্রচুর মেয়েরা কাজ করছেন। বিভিন্ন সাহসী অ্যাসাইনমেন্টে তারা যুক্ত। পুলিশ, সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীতে নারীদের সেবা উজ্জ্বল। আমরা নারীরা সবসময় নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণ করে এসব জায়গায় এসেছি। আমি মনে করি, নেতৃত্বের জায়গাতে নারী থাকাতে, কর্মপরিবেশে এর একটা বিরাট ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। নীতিগুলো সহায়ক হয়, রাষ্ট্রীয় দর্শন নারীর প্রতি সহায়ক হয়, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীর চলার পথ আরও বেশি মসৃণ হয়।

সাক্ষাতকারটির কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-

রাজনৈতিক জীবনের শুরু কবে থেকে?

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী: বাবা রাজনীতিবিদ হওয়ার ফলে এক ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশেই আমার বড় হওয়া। বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ ও লালন করা, এরকম একটি পরিবেশেই আমি বড় হয়েছি। আইন বিষয়ে পড়ার পেছনেও যে বিষয়টি কাজ করেছে তাহলো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখা। এগুলোতে একজন আইনজীবী হিসেবে ভূমিকা রাখার সুযোগ বেশি। সেজন্য মনে হতো এই পেশায় সংযুক্ত হলে রাজনীতি আমার জন্য ফলপ্রসু হবে। সবসময়ই মনের ভেতর একটা সুপ্ত ইচ্ছে ছিল যে, আমি রাজনীতিবিদ হবো। পাশাপাশি লেখাপড়াকেও ভীষণ গুরুত্ব দিয়েছি। আমি কখনোই চাইনি রাজনীতির কারণে আমার পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটুক। সেজন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, পড়াশোনা শেষ করে, আইন পেশায় যুক্ত হয়ে পরবর্তী সময়ে আমি রাজনীতিতে আসব। ২০০০ সালে পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরি এবং সক্রিয়ভাবে হাইকোর্টের প্র্যাকটিসে যুক্ত হই। ২০০১-এ সরকার পরিবর্তনের পর নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক রাজনৈতিক মামলা হয়। সেসব মামলা পরিচালনার কাজ করেছি এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যে লিগ্যাল সেল গঠিত হয়, সেই সেলের একজন আইনজীবী হিসেবে আমি যুক্ত হই। লিগ্যাল এইডের যে কমিটিগুলো হয়, সেই কমিটিগুলোতেও কাজ করেছি। মূলত ২০০৮ সালের পর আমি সক্রিয় রাজনীতিতে আসি। নারীর সংরক্ষিত আসনে এমপি নির্বাচিত হয়ে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। এরপর এই পর্যন্ত আসা।

বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, স্পিকার, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীত্ব পদে এখন নারী। বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?

ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী: আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে এটার অবশ্যই একটি বিরাট ইতিবাচক প্রভাব আছে। কারণ আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় আছেন দু’জন নারী, দুটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের প্রধান দুই নারী এবং এরা জনগণের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত হয়ে আসছেন। অর্থাৎ জনগণের মধ্যে নারী নেতৃত্বের প্রতি একটা আস্থা আছে। অথবা তাঁদের নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা আছে, যারা নারী। এর ফলে স্পিকার, মন্ত্রিপরিষদ পরিচালনাসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন, নারীর ক্ষমতা গ্রহণ ইত্যাদি বিষয়গুলো এক ধরনের বার্তা দেয় যে, এই সকল পদগুলো এখন নারীর জন্য উন্মুক্ত। যদি কোনো নারী তার শিক্ষা, জ্ঞান, মেধা, যোগ্যতা ও যথাযথ প্রক্রিয়াসহ সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করেন, তাহলে যে-কেউ এই পদে নিযুক্ত হতে পারেন এবং ‘নারীরা পারেন’ এই ব্যাপারটি আমরা বারবার দেখতে পাচ্ছি। আমরা দেখি যে, যখন যে পদেই নারী আসুক না কেন, সে তার দক্ষতা প্রমাণ করেই ছাড়ে এবং তা একবার নয় বারবার প্রমাণ করে। আরেকটি ব্যাপার উল্লেখ্য যে, শুধু নেতৃত্বের পদ দিয়ে নারীদের বিচার করলেই হবে না। নারীরা আজ সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন। সেটাকে তৃণমূল পর্যায় থেকে যে-কোনো ক্ষেত্রেই। আমরা যদি গণমাধ্যমের কথা বলি, সেখানে প্রচুর মেয়েরা কাজ করছেন। বিভিন্ন সাহসী অ্যাসাইনমেন্টে তারা যুক্ত। এখন আর নারীরা কেবল ‘নারী বা শিশু বিট’ নিয়ে কাজ করে না। পুলিশ, সেনা, নৌ, বিমানবাহিনীতে নারীদের সেবা উজ্জ্বল। ইউএন’এর পিস মিশনে আমাদের নারী পুলিশ নিয়োগ পাচ্ছেন। আমরা নারীরা সবসময় নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রমাণ করে এসব জায়গায় এসেছি। আমরা আজ দেখব যে সব পেশাতেই নারীরা দৃশ্যমান। আমি মনে করি, নেতৃত্বের জায়গাতে নারী থাকাতে, কর্মপরিবেশে এর একটা বিরাট ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। নীতিগুলো সহায়ক হয়, রাষ্ট্রীয় দর্শন নারীর প্রতি সহায়ক হয়, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীর চলার পথ আরও বেশি মসৃণ হয়। এবং তখনই নারীদের নিজস্ব প্রতিভা বিকশিত করে এগিয়ে আসার সুযোগ সৃষ্টি ও সম্প্রসারিত হয়।

প্রথমে মন্ত্রী ও পরে স্পিকার, কোনটা বেশি চ্যালেঞ্জিং?

ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী: মন্ত্রীর কাজ ও স্পিকারের কাজ দুটো একেবারেই ভিন্ন। আমি যখন মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছি তখন তা সুচারুভাবে করার চেষ্টা করেছি। মন্ত্রীর কাজে দৌড়-ঝাঁপ বেশি। প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে কাজ করা থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়ের সকল কাজে যুক্ত থাকতে হয়। এবং যেখানে যা দরকার আমি সাধ্যমত চেষ্টা করেছি। এখন স্পিকারের জায়গা থেকে, যে কাজগুলো করা দরকার তা সবই আমি করব। স্পিকারের জায়গাটি শুধুমাত্র কাজ নয়, সংসদে স্পিকার একটা ‘সিম্বল’ হিসেবে কাজ করে। এই সিম্বলের মোদ্দা কথা হলো যাকে সকলে অনুসরণ করবে। সংসদ ঠিকমতো পরিচালনা করা, প্রত্যেক সদস্যের প্রতি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় আচরণ করা। মূলত সংসদে দুভাবে কাজ করতে হয়। প্রথমত সংসদ অধিবেশন পরিচালনা করা এবং দ্বিতীয়ত, এর পেছনে যে কর্মযজ্ঞ আছে তা যথাযথভাবে পরিচালনা করা। আমি মনে করি, স্পিকার হিসেবে এই দুই কাজের সমন্বয়ই হবে আমার মূল চ্যালেঞ্জ। শুধু তাই নয়, সংসদ সদস্যদের সঙ্গে একটা নেটওয়ার্ক তৈরি করা, প্রত্যেকের সঙ্গে একটা সুসম্পর্ক গড়ে তোলাও স্পিকারের একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে মনে করি। সংসদের সকল সদস্যের আস্থা অর্জন এবং সে আস্থা অর্জনের লক্ষ্যে স্পিকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে স্পিকার হওয়ার প্রস্তাব পেয়ে কেমন লেগেছিল?

ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী: অফার তো আসলে সেভাবে দেননি। আপনারা জানেন আমার এই নিয়োগের বিষয়ে অনেক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, পত্র-পত্রিকায় ও মিডিয়ায় এসেছে। এমন কি আমি নিশ্চিত হওয়ার আগেই মিডিয়ায় আমার নিযুক্তির খবর চলে যায়। চূড়ান্তভাবে খবরটি যখন আমার কাছে আসে তখন আমি অত্যন্ত খুশি হই এবং সম্মানবোধ করি এই ভেবে যে আমি প্রথম নারী স্পিকার। এটা আমার জন্য খুবই গৌরবের। শুধু আমিই না বাংলাদেশের সকল নারী এই সম্মানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং আমি এটা সব সময় মনে রাখি যে, আমি যদি কোনো কারণে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হই, তাহলে শুধু আমি-ই না আমার সঙ্গে পুরো নারী জাতি-ই ব্যর্থতার দায়ভারে আক্রান্ত হবেন। সেই জন্য প্রথম নারী স্পিকার হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি।

আমাদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় একজন ক্ষমতাবান নারী হিসেবে কতটুকু কাজ করা সম্ভব বলে মনে হয়? কোনো বাধা আছে কি?

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী : অনেক কাজ করা সম্ভব। যত আপনি ‘ক্ষমতা’ পাবেন, ততই আপনি কাজ করতে পারবেন। নারী যত ক্ষমতাবান হবে, পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্য ততোই ভাঙতে সক্ষম হবেন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা অবস্থায় নারী যে কাজগুলো করবেন তা অন্য নারীদের এগিয়ে নিবে। ক্ষমতায় গেলে যে দায়িত্বগুলো নারীর ওপর বর্তায় তা পালনের মাধ্যমে দেশ-জাতির উন্নয়নে নারী আরও এগিয়ে যায়।

সংসদ সদস্যদের ভূমিকা কি হওয়া উচিত বলে মনে করেন? ভাষা, ব্যবহার ও আচরণ ইত্যাদি।

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী : সংসদ সদস্যদের সকলের ভাষা, আচার-আচরণ ও নিয়ম-কানুন ইত্যাদি মেনে চলা উচিত। জনগণের কল্যাণের লক্ষ্যেই তারা তাদের সংসদীয় পদটি ব্যবহার করবেন বলে আমার বিশ্বাস।
আমি মনে করি, গণতান্ত্রিক চর্চা ও ব্যবহার যত দীর্ঘ হবে তার ভেতর থেকেই এই বিষয়গুলো গড়ে উঠবে। একটা সুস্থ সংসদ গড়ে ওঠা খুব সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘদিনের নিয়মিত গণতান্ত্রিক চর্চার। কেবল তা হলেই সম্ভব সুস্থ গ্রহণযোগ্য সাংসদদের গড়ে তোলা।

নারীর সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচন কবে সম্ভব বলে মনে করেন?

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী : বঙ্গবন্ধু’র ১৯৭২-এর সংবিধান ছিল একটি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন যুগান্তকারী সংবিধান। পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এই সংবিধানের মাধ্যমে আমরা নারীদের সংসদে যুক্ত করতে পেরেছি। এজন্য আমরা এখন ৫০ জন নারীকে সংরক্ষিত আসনে পাচ্ছি এবং বছরে বছরে এই সংখ্যাটি কমেনি, বরং বেড়েছে এবং এটা একটি বিরাট বড় শক্তির জায়গা এবং সরাসরি নির্বাচনেও নারীদের আসতে কোনো বাধা নেই। এখন সরাসরি নির্বাচনে নির্বাচিত আছেন ২০জন নারী। সেটা আশা করি আরও বাড়বে। এখানে একটা স্টেপিং স্টোন আছে। এমন একদিন আসবে যখন ১০০ নারী সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। তখন সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন হবে না। তবে এর জন্য সময় লাগবে। নারীকে পর্যাপ্ত সুযোগ ও অগ্রাধিকার না দেয়া পর্যন্ত তারা সরাসরি নির্বাচনে আসতে পারবে না। কারণ একটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই তাকে নির্বাচনে আসতে হবে। এখানে আমি স্মরণ করতে চাই যে, কাউন্সিলর পর্যায়ে নারীদের বিশাল বিজয়ের কথা। আমাদের ইউনিয়ন পর্যায়ে ১২ হাজার নারী নির্বাচিত হয়েছেন। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবেও নারীরা বিজয় লাভ করেছেন। তারা তাদের যোগ্যতা দিয়েই এই পর্যায়ে এসেছেন এবং জাতীয় পর্যায়েও এটা সম্ভব বলে আমি মনে করি। শুধু সময় ও মনোযোগ লাগবে।

‘পিতৃতন্ত্র ও ধর্ম যখন নারী মুক্তির জন্য বিরাট বাধা’ তখন নারীর ক্ষমতায়ন কিভাবে, কতটুকু সম্ভব?

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী : আমাদের সমাজ কাঠামোতে পিতৃতন্ত্র সবসময়ই বাধা হিসেবে ছিল, এখনও আছে, কিন্তু এই বাধা পার হয়েই নারীরা ক্ষমতায়িত হয়েছে এবং একে অব্যাহত রাখা জরুরি। নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। রাষ্ট্রীয় দর্শনে নারী নীতিগুলো যেন সমুন্নত থাকে সেই বিষয়ে আমাদের সজাগ থাকতে হবে, কাজ করে যেতে হবে। রাজনীতিক সদিচ্ছার কারণে নারী নীতিমালা গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। আমি মনে করি, এটা একটা বড় অর্জন এবং আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো রাজনৈতিক দলগুলোই পূরণ করবে।
আমার কাছে মনে হয়, ধর্ম নারীর জন্য কোনো বাধা নয়। যেটা বাধা, সেটা হলো ধর্মের অপব্যাখ্যা। ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যা প্রদান করা হলে সেটা নারীর পক্ষেই যায়, বিপক্ষে নয়।

‘রাজনৈতিক খোলামেলা স্বচ্ছ পরিবেশ নারীর ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত’ এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী : দেখুন, আমরা এখন সব জায়গাতেই নারীকে দেখতে পাই। কর্মক্ষেত্রে এমন জায়গা এখন বিরল যেখানে নারীর উপস্থিতি নেই। সুতরাং আমি মনে করি রাজনীতিতেও নারী একদিন আরো বেশি সক্রিয় হবেন। নারীর জন্য কেউ কিছু করে দেবে না, বিশেষ সুবিধা দেবে না, বাড়তি কিছু রাখবে না। নারীকে নিজের জায়গা নিজেকেই সুসংহত করতে হবে। নিজেকে যেকোনো মূল্যে এগিয়ে নিতে হবে, গড়ে তুলতে হবে। এখনকার পুরুষ নারীকে কর্মক্ষেত্রের সকল জায়গায় দেখে অভ্যস্ত হচ্ছে এবং পুরুষ নারীর সহায়ক ভূমিকা রাখছে। পরিবার থেকেও সহায়তা করা হচ্ছে। একজন পিতা যদি তার মেয়েটিকে স্কুলে না পাঠান তাহলে সে কী করে শিক্ষিত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে? এখন মোটামুটি সবাই উপলব্ধি করছে, মেনে নিচ্ছে যে, নারী উপার্জনক্ষম হলে, আয় বাড়লে সংসার ও জীবন ব্যবস্থা উন্নত হয়। স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই উপার্জনক্ষম হলে সংসারে সচ্ছলতা আসে, ছেলেমেয়েদের ভালো হয়, পরিবারেরও ভালো হয়।

আজকাল আমরা দেখি নারী বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষমতাসীন। বড় বড় পদে কাজ করছেন কিন্তু তারপরও সহিংসতা ও নির্যাতন হয়েই চলেছে, এর কারণ কি?

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী : এর কারণ হচ্ছে পারসেপশন সমস্যা। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটের মাথার মধ্যে কাজ করে যে, নারীকে চাইলেই নির্যাতন করা যায়। নারীকে অবদমন করে রাখা যায়। নারী সাত চড়ে রা করবে না, ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলো আমাদের সমাজের মধ্যেই আছে। একটা পরিবারে একটা ছেলে ও মেয়ে যখন বড় হয় তখন ছেলেটা মেয়েটিকে চাইলেই চড় মারে, লাথি দেয়, গাল-মন্দ করে। মনে করা হয় এটা কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এটা বিষয়। এটা মানসিকতার ব্যাপার। এই জায়গাগুলোতে পরিবর্তন আনতে হবে। তাহলে নারী-পুরুষের সুষম অবস্থান তৈরি হবে। নারী-পুরুষ ভেদাভেদ কমে আসবে। একে অপরকে সম্মান করবে। নারী পুরুষের কর্মবণ্টনের বিভাজন কমে আসছে। আজকাল পুরুষরাও ঘরে কাজ করছেন, আর নারীরা তো বাইরে কাজ করছেনই। দু’জনকেই এখানে সমন্বয় করতে হবে। এখন মানসিকতার পরিবর্তন ঘটছে এবং সামনে আরো পরিবর্তন হবে বলে আমার বিশ্বাস। তখন সহিংসতা ও নির্যাতন ঘটবে না।

আপনি কি নিজেকে একজন নারীবাদী মনে করেন?

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী : পৃথিবীব্যাপী নারীবাদের বিভিন্ন ধারা ও ধরণ আছে। বিভিন্ন দেশের নারীবাদী চর্চা ভিন্ন ভিন্ন। তবে আমার কাছে নারীবাদ মানে নারী-পুরুষের সমতা ও সমঅধিকার। নারী ও পুরুষের শারীরিক পার্থক্যটুকু ছাড়া আমি দু’জনকেই মানুষ হিসেবে দেখি। নারীর অধিকার, সম্মান, প্রাপ্তি ও মর্যাদার জন্য যে লড়াই আমাকে করতে হয় সেটুকুর জন্য আমি অবশ্যই একজন নারীবাদী। নারী-পুরুষে সমান অধিকার ও সমান অবস্থা ও অবস্থান আমার কাছে নারীবাদ।

বর্তমান প্রজন্মকে কিভাবে দেখছেন?

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী : বর্তমানের বিরাট অংশ আমাদের তরুণ প্রজন্ম। সেটাই আমাদের সম্ভাবনার সকল আশার দুয়ার খুলে দেয়। তারা বহির্বিশ্বের সঙ্গে যেভাবে সম্পৃক্ত হচ্ছে, তাতে আমি মনে করি তারাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই তরুণ প্রজন্ম নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রমাণ করছে বারবার। এটা আমাদের জন্য বড় একটা গৌরবের বিষয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তরুণ প্রজন্মের হাতে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,৫৮২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.