পোড়া লাশেরও পিছু ছাড়ে না লিঙ্গীয় ও ধর্মীয় পরিচয়!

ঈশিতা বিনতে শিরিন নজরুল:

ইউএস বাংলা! গত দুদিন ধরে নিউজ ফিডজুড়ে, সমস্ত মিডিয়া জুড়ে শুধু এই সংবাদ। প্রথমে ব্রেকিং নিউজ, তারপরে ধীরে ধীরে কিছুটা বিস্তারিত, কিছু ছবি, কিছু স্বপ্ন, সবই সামনে আসতে থাকে। এই হাজার মাইল দূরে থেকেও আমি যেন সেই পোড়া গন্ধ পাচ্ছিলাম গত দুটি দিন ধরে। মনে হচ্ছিল, এ তো আপনার আমার জীবনেও হতে পারতো বা হতে পারে যেকোনো সময়। অবশ হয়ে যাচ্ছিল শরীর!

যখন ছোট্ট শিশুটির কথা চিন্তা করি নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে পারি না। আমি শিউরে উঠি যখন ছবিগুলো দেখি. শিউরে উঠি যখন এই বিভীষিকাময় মৃত্যুক্ষণটি কেমন ছিল তাদের কাছে সেটি উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। কী করছিল তখন সেই বাবা আর মা তাদের ছোট্ট সন্তানটিকে নিয়ে? এক বুক স্বপ্ন নিয়ে যে দুজন মাত্র ১৩ দিন আগে হাতে হাত ধরে সারাজীবন পাশে থাকার কথা দিয়েছিল, কেমন ছিল তাদের শেষ মুহূর্তটি? পৃথুলার কি শেষ মুহুর্তে তার মায়ের কথা মনে পড়ে বুক ফেটে কান্না এসেছিল? যারা পুড়তে পুড়তেও বের হতে চেয়েছিল, কতটা যন্ত্রণা হয়েছিল তাদের? ভাবতে পারি না আমি, মৃত্যুর ভয়াবহতা সবসময় আমাকে দিশাহারা করে দেয়।

আমি বুঝতে পারি, বেশিরভাগ মানুষই এই মর্মান্তিক ঘটনায় বিহ্বল। কিন্তু তার ভেতরেও আমি, আমরা দেখতে পাই যে, এই মৃত্যুর ভয়াবহতা ছাপিয়ে যেন লাশের ব্যবচ্ছেদ ঘটছে তাদের লিঙ্গীয় আর ধর্মীয় পরিচয়ে! অনলাইনে ভরে গিয়েছে সেই মানুষরূপী বর্বরদের মন্তব্যে! সবগুলোই ফ্লাইটে থাকা নারীদের নিয়ে! সে হোক পাইলট, বিমান ক্রু, কিংবা যাত্রী!

আমি অবাক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে পড়ছি আর শিউরে উঠছি!! নাহ, এবার আর মৃত্যুর সংবাদে নয়, মৃতদের লিঙ্গীয় পরিচয়ের সে কী জোর, সেটা দেখে!! তাদের লিঙ্গীয় সত্ত্বা যেন তাদের মৃত্যুকেও প্রত্যাখ্যান করছে! তারা কেন চাকরি করতে গিয়েছে, কোন ধান্দায় কোন ধরনের মেয়েরা এসব চাকরি করে, মেয়ে হয়ে আবার প্লেন চালাতে গেল কেন, মেয়ে কেন হানিমুন করতে গেল!!! এত্তো এত্তো কেন……. আর কেন….!!!! সব কেনই শুধু প্লেনে থাকা নারীদের দিকে ছুঁড়ে দিচ্ছে!

অনেকেই মনে করেছেন যে, মক্কা-মদিনাতে হানিমুন করতে গেলে নাকি এই দূঘটনাটি ঘটতোই না!! কেন রে মূর্খের দল মক্কা-মদিনা কি মৃত্যুর উর্দ্ধে নাকি রে? প্রতি বছর যে হজ করতে গিয়ে মানুষ মরে, সেটা জানা আছে? কুরআনের কোন জায়গাতে আছে যে, মক্কা-মদিনায় গিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া না করলে চলবে না? আবার কেউ কেউ মনে করছেন, ফ্লাইটে বিধর্মী না থাকলে বোধহয় এরকমটা হতো না! ওরে মূর্খ, বর্বরের দল, জীবিত মানুষকে নিয়েই কুৎসা রটানো বা গীবত করা মহাপাপ, আর সেখানে দলে দলে আপনারা ‘মুমিন‘ অনলাইন বিশ্লেষকগণ মৃত নারীদেরকে নিয়ে রগড় করেই যাচ্ছেন!!! কেয়া বাত!!!

শত শত মন্তব্য পড়ে সত্যিই আমার মনে হচ্ছে যে, ঐ ফ্লাইটে নারী যাত্রী, নারী পাইলট বা নারী ক্রু ছিল বলেই যেন এই দুঘটনা ঘটেছে, নারী মাত্রই ‘অপয়া‘! আপনি ঈশ্বরে বিশ্বাস করুন কী নাই করুন, মৃত্যু কিন্তু সত্য। সবাইকেই মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবেই, এর থেকে কারও নিস্তার নেই, আপনারও না। কিন্তু আজ আমি সত্যিই লজ্জিত মানুষ হিসেবে জন্মে!

আমরা মৃত হলেও নারীকে রেহাই দেই না অপমান করা থেকে, অামরা মৃত বলেও নারীর চরিত্র নিয়ে কচলে স্বমন্থনের স্বাদ নিতে ভালবাসি, শুধুমাত্র নারী বলেই আমরা তাদের প্রথম কিংবা তৃতীয় মধুচন্দ্রিমায় যাওয়া এবং সেটা স্ট্যাটাস দেয়াকে অশ্লীলতা হিসেবে দেখি, কিংবা মানুষ বলেই হয়তো ‘ভাল হইছে মরে গ্যাছে‘ টাইপ কথা সহজেই বলে ফেলতে পারি! মানুষ বলেই হয়তো যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতি ফ্লাইট ক্রুদের শ্রমকে আমরা সম্মান দিতে পারি না! এই পৃথিবীকে নারী শূন্য করে দিলে বোধকরি আপনারা মৃত্যুকে জয় করতে পারবেন!!

এই ধরনের দুর্ঘটনার নেপথ্যে অনেক কারণই থাকা স্বাভাবিক; তবে কোনটিই নারী সংশ্লিষ্ট নয়!! তাই, এই মৃতদের জন্য আমরা প্রার্থনা করি, তাদের পরিবারের জন্য প্রার্থনা করি, প্রার্থনা করি যেন এধরনের মৃত্যু আর কারও না হয়। যা আপনার কাছে বিনোদনের খোড়াক জোগাচ্ছে, তা একটি পরিবারের সারা জীবনের অপূরণীয় ক্ষতি। একজন মা বা শিশুর সারাজীবনের কান্না। আর কিছু পারেন কী না পারেন, অন্তত মৃতদেরকে আপনাদের প্রহসন থেকে মুক্তি দিন।

শেয়ার করুন:
  • 1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.