নারীবাদীর শরম

0

আমেনা বেগম ছোটন:

আচ্ছা, আপনি কি নিজেকে নারীবাদী মনে করেন?
কী উত্তর দেবেন? বেশিরভাগ আধুনিক, সুশিক্ষিত বঙ্গদেশীয় মানুষ এবং প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ হা হা করে উঠবেন, যে তিনি অতি অবশ্যই নারীবাদী নন। নারীবাদী হওয়াটা বিশাল শরমের ব্যাপার। বরঞ্চ তিনি মানবতাবাদী, তিনি সম অধিকারে বিশ্বাসী ইত্যাদি।

মেয়েদের নিজেদের এগিয়ে যেতে হবে, অধিকার আদায় করে নিতে হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি, তা বলে সেটা নারীবাদিতা নয় কিন্তু, পষ্ট বলে দিলুম, হ্যাঁ। আমাকে নারীবাদী বললে আমি কাঁদবো, আনফ্রেন্ড করবো। আপনি গে ম্যারেজ সাপোর্ট করেন কিনা, তেমনি বিব্রতকর প্রশ্ন এইটা।

নারীবাদীর সংজ্ঞা কি? উদাহরণ কে? ইয়ে মানে সংজ্ঞা-টংগা আমার ঠিক মনে থাকে না, ভারী খটমটে ব্যাপার। আর এই বিষয়ের জনক এরিস্টটল কিনা, তাও জানি না। আমি আসলে সক্রেটিসের মতো কিছুই জানি না, শুধু সেটাই মাত্র জানি।

তবু দেশের আবহমান শিক্ষাব্যবস্থায় আমি যদি জিগেস করি কয়জন নারীবাদীর নাম বলুন। ইয়ে মানে, হ্যাঁ, বেগম রোকেয়া হলেন ভদ্র নারীবাদী। আর বাকি ওই তসলিমা নাসরিন, সুপ্রীতি ধর, খুশী কবির এরা হলেন গিয়ে উগ্র নারীবাদী। এরা মেয়েদের, সমাজের ভালো চান না। উনাদের ধান্দা হলো ঘরের বউদের অবাধ্য বানিয়ে ফেলা, সমাজে ডিভোর্সের হার বাড়ানো। ওইদিকে আবার রক্তমাখা প্যাডের ছবি। কী কাণ্ড, বলুন? এই হলো আমার দেখা বাংলাদেশের মানুষের চোখে নারীবাদ।

মানুষের অবশ্য দোষ দেয়া যায় না, তারা যাদের নারীবাদী বলে চিনে, তারাই কিছুদিন পরপর নিজেদের মধ্যে কাজিয়া ঝগড়া করবে, একজন আরেকজনের গোপনীয় তথ্য সত্যমিথ্যা রঙ চড়িয়ে ফেসবুকে দেবে। সম্প্রতি শুনলাম, এক লেখিকা আরেক লেখিকাকে অভিযুক্ত করছেন তিনি নাকি অতীতে পতিতাবৃত্তি করতেন, এখনও করেন। বস্তির নারীরাও এর চেয়ে ভ্যালিড ইস্যু নিয়ে ঝগড়া করেন।
মিনিমাম স্পেস বা রেস্পেক্ট টুকু কেউ কাউকে দিতে রাজি না। নিজেরাই নিজেদের সম্মান করেন না, তাহলে সাধারণ মানুষের সম্মান টা কই পাওয়া যাবে?

আমার মাথা কিছুটা খারাপ বলে নারীবাদিতা আমার বেশ লাগে। সে আমি পরকীয়া করতে উন্মুখ বলে নয়। এমনি, দেশের মেয়েরা বেশ নিরাপদে হেসেখেলে বেড়াচ্ছে এই দেখতে ভাল লাগে। বাড়িতে দুইটা মেয়ে জন্ম নিলে কেউ মুখ কালো করবে না, শান্তিতে স্কুলে যাবে,পড়বে, নিশ্চিন্তে প্রেম করবে, বিয়ে করবে, জব করবে, বাচ্চা হলে কাজে কর্মঘন্টা কমিয়ে এনে বাচ্চা সেটল হলে পুনরায় কাজে যোগ দিতে পারবে, তাকে কেউ চাপাচাপি করবে না, এসব ছোটখাট জিনিস চাই বলে নারীবাদিতা ভাল লাগে। আমি নিজেও নারীবাদী। অবশ্য এতে কোন দীক্ষা নিতে হয় নি, স্বামী সংসার, ধর্মকর্ম ও বিসর্জন দিতে হয় নি।

নারীদিবস বা ওম্যান্স ডে এলে কেউ না কেউ বলবেই, একদিন নারীদের জন্যে দিয়ে কী লাভ? ওইদিন কি নারী নির্যাতন বন্ধ থাকে? ওইদিন কি হত্যা, ধর্ষণ — বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা —
এই যে, আপনারা বলেন, ওই একদিনও আপনার মুক্তি নেই, এ কথাটা কি আপনি বছরের অন্য দিন বলেন? ওই একটা দিনে, এই দিনের বদলে সম অধিকার, নিরাপদ মাতৃত্ব, নারীর স্বাস্থ্য ইত্যাদি জরুরী – এই আলাপ গুলি কি বছরের অন্য সময় হয়? হয় না।

নারীদের যে কিছু হচ্ছে না, হওয়া দরকার, এই জন্যে কি করা উচিৎ এসব কথাবার্তা বলার উপলক্ষ্য এনে দেয় নারী দিবস। একদিন যদি কর্তাব্যক্তিরা এবছর নারী দিবস উপলক্ষে কী করা যায়, এটা বলেও কাগজ কলমে কিছু খোঁচা মারেন, তাতেও আমার উপকার। সুতরাং আমার কাছে নারীদিবসের বেশ দরকার আছে বলে মনে হয়।

অতি সম্প্রতি, নারীবাদীরা প্যাড আর পিরিয়ড নিয়ে স্টান্টবাজি শুরু করেছে। ছিঃ, কী বেহায়া সব। কাজের কাজ কিছু নেই। বরঞ্চ, প্যাড কেনা হাইজিন, জরায়ু রোগ নিয়ে কথা বলা দরকার — আচ্ছা বলুন তো, ওই বেহায়া নারীবাদীগুলা, যদি স্টান্টবাজি না করতো, আপনি এই নিয়ে কথা বলতেন? ওই প্যাড দেখে আঁতকে উঠেই না আপনার মনে হলো কোথায় গুরুত্বারোপ করতে হবে! আপনি লিখলেন, পিরিয়ড কী, কেন? আপনার বন্ধুবান্ধব এই বিষয়ে জানলো আপনার পোস্ট থেকে। ভালো হয়নি?

পরকীয়া নিয়ে কথাবার্তা হওয়াতে গোটা সমাজ একটু নড়ে উঠলো, ছেলেরা পরকীয়া করবে, আর ঘরের বউ শাবানার মতো আকুল হয়ে তার মনোরঞ্জনের চেষ্টা করবে, ওই দিন আর নাই ভ্রাতা। বউয়ের একার দায়িত্ব না সংসার টেকানো, বউয়ের মন বোঝা, তার মানসিক চাহিদার দিকে খেয়াল রাখা সেটা স্বামীকে করতে হবে। নয়তো দুনিয়ায় বেটির অভাব যেমন নাই, ব্যাটারাও আছে, আপনার ঘাটতি পূরণ করে দিতে, ওঁৎ পেতে আছে তারা।

নারীবাদিতা, নারী দিবস দুটোই প্রয়োজন। সে দেশ, সমাজ, পুরুষ দের জন্যেও। দেশের অর্ধেক মানুষ কে উনমানুষ, বানিয়ে রাখলে দেশ এগুবে না। ছেলে না হলে আপনি মুখ কালো এইজন্যে করেন, যে মেয়ে নামক শিশুটি জন্ম দিয়েছেন সেটি আপনার কোন কাজে আসবে না, আপনার খেয়েপড়ে আরেক ঘরে যাবে, সেখানেও পুত্র জন্ম দিতে না পারলে মাথানিচু করে দেশে ঊনমানুষের সংখ্যা বাড়াবে।

মেয়েটাকে ভালোভাবে মানুষ করুন, তাকে নারীজন্মের অভিশাপ শুনিয়ে ভীত করবেন না। দেখবেন, আপনার ছেলে নিয়ে আফসোস হবে না।
নারীবাদিতা উনমানুষকে মানুষ বানাতেই। বিশ্বাস করুন, একজন বুদ্ধিমতী আত্নবিশ্বাসী মেয়ের সাথে জীবন কাটানো ভয়ংকর কিছু না, বরঞ্চ আনন্দের।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 180
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    180
    Shares

লেখাটি ৯২৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.