কী করবো নারী দিবস নিয়ে?

0

ফারজানা নীলা:

কী হবে নারী দিবস নিয়ে? কিছু কী হয়? গত বছর কিছু কী হয়েছিল? না এর আগের বছর? ঐতিহাসিক ৭ মার্চেই একজন নারী ভয়াবহ অপমানের শিকার হলো। ক্ষমতাসীন দলের নাম লাগানো বলে অনেক নারীবাদীরাও সন্দেহ প্রকাশ করে বসলো। নির্যাতন তো নির্যাতনই। কে করলো সেটা কি মুখ্য? কেউ যদি দলের নাম ভাঙিয়ে এসব করেও থাকে, তার জন্য ঐ মেয়েকে সন্দেহ কেন? সে ফেইক না রিয়েল, বানিয়ে বলছে না সত্য বলছে? কী হাস্যকর! ঠিক যেমন কেউ বলে রেইপড হইছে? প্রমাণ কী?

আবার অনেকে তো ঘোষণাই দিয়ে ফেলেছে “এই মেয়ের রক্ষা নাই”। এক নারী হয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে দলের পক্ষ নিয়ে মেয়েটিকে খারাপ করে ফেললেন! বাহ!

সকালে পত্রিকায় দেখি ছাপা হয়েছে এক প্রতিবেদন, নারী নির্যাতন মামলার ৯৭% মামলা বিচার পায় না। (সূত্র: প্রথম আলো)। এই হিসেব শুধুমাত্র যেসব ঘটনা নথিভুক্ত হয়, সেগুলোই। এর বাইরে কত শত ঘটনা ঘটে যায় যেগুলো লোকলজ্জার ভয়ে সামনেও আসে না। সেগুলোর বিচার কে করে?

আরে রাখেন বিচার। কিছুদিন আগে এক ভিডিও দেখলাম ধর্ষণের শাস্তি হচ্ছে কানে ধরে উঠবস করা। ওয়াও, ডিজিটাল বাংলাদেশের আধুনিক রপ।

ঘরের বাইরে নির্যাতন, তাও না হয় মাঝে মাঝে জানা যায়, ঘরের ভেতরের গুলো কে দেখে? স্বামীর মার খেয়েও মুখ বুঁজে পড়ে থাকা নারীকে নিয়ে কী বলবো! “স্বামীর ঘর ছেড়ে দিলে লোকে কী বলবে” বলা নারীদের নিয়ে কী বলা যায়? “স্বামীর মার না সইলে বাচ্চা নিয়ে কই যাবো” বলা নারীদের নিয়ে কী বলা যায়?

নারী নির্যাতন বন্ধ হোক বলা খুব সহজ। কতজন আমরা এটা মেনে চলি? বাবা মায়েরাও চায় না তাদের মেয়ে নির্যাতিত হোক। কিন্তু যখন পরের বাড়িতে অসহায় হয়ে পড়ে, তখন তারাই মেয়েকে বোঝায়, “একটু মেনে চল, এখন ওটাই তোমার সব”।

প্রতিদিন বাসে, রাস্তায় মেয়েরা কত রকম অশালীন ব্যবহার আর বক্তব্যের শিকার হয়। প্রতিবাদ করে অনেকে, আবার অধিকাংশই শুনে “ছেলেরা এমন, তর্ক করে লাভ নাই”।
কিশোরীরা অপমানে গলায় দড়ি দেয়। তার জন্য কান্না ছাড়া কী করতে পারে তার পরিবার?

ধর্ষণ শেষে গলা কেটে ফেলে রাখা তো দুধভাত। তার ভয়ে মেয়েদের আমরা বাইরে যেতে মানা করি, সন্ধ্যা হলে ঘরে ঢুকতে বলি। তবু কি রক্ষা হয়?
ঘরের ভেতর বড় হয় আত্মীয়-স্বজন দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে। মুখ বুঁজে সয়ে সয়ে অপমান আর গ্লানিতে বড় হয় কুৎসিত স্মৃতি নিয়ে।
বলতে সাহস পায় না, কারণ সাহস দেয় না পরিবার। “কাউকে বোলো না, বললে লোকে খারাপ বলবে”। হায়, পরিবারই শিখিয়ে দিচ্ছে “তোমার সাথে খারাপ কিছু হয়েছে মানে তুমি খারাপ, তোমার দিকে লোকে আঙুল তুলবে”।
কয়টা পরিবার আছে যারা শেখায় যেই করুক, প্রকাশ করবে তার নাম, কোনো ভয় নেই, তোমার সাথে আছে তোমার মা-বাবা। কয়টা পরিবার থেকে পায় সাহস, কয়টা পরিবার থেকে শেখে, “আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেই আমাকে ছোঁবে, সেই অপরাধী, আমি না”।

যদি ভাই থাকে তাহলে তো কথাই নেই। স্পষ্ট আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, “সে ছেলে তুমি মেয়ে, মেয়েদের এভাবে চলতে নেই”।
আচ্ছা, মেয়েদের যখন শেখানো হয় “তুমি এভাবে চলো না, ওভাবে চলো, ওড়না পরো, বাইরে কম বের হও, আস্তে কথা বলো, তর্ক করো না, ছেলেরা শিষ দিলেও মাথা নিচু করে হাঁটবে, তখন ছেলেদের কি শেখায় “মেয়েদের সাথে কীভাবে মিশতে হয়, সম্মান দিতে হয়”?
কই আশেপাশে তো হরহামেশাই শুনি মায়েরা বলাবলি করে “ঐ মেয়ের চরিত্র ভালো না, আমার ছেলের সাথে জোর করে মিশে”।
অন্যের মেয়ে সম্পর্কে কী অবলীলায় দোষ দিয়ে দেয় নিজে মেয়ে হয়েও তবু যেন “ছেলে”রা শুদ্ধ থাকে!

এতো ছেলে প্রীতি কেন আমাদের? বৃদ্ধ বয়সের অবলম্বন?
বুড়ো বয়সে ছেলে দেখভাল করবে এই থিয়োরি কখনো মেয়েদের বেলায় প্রযোজ্য হয় না কেন? সন্তান তো দুজনই। দুজনেরই দায়িত্ব বাবামার দেখাশোনা করা। এই দায়িত্ব যখন এক তরফা ছেলেদের ঘাড়ে দিয়ে দেন, তখনই আপনারা মেয়েদের দুর্বল বানিয়ে দেন। মেয়ে চলে যাবে অন্যের ঘরে, সে পারবে না দেখাশুনা করতে এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসা যায় না?

এমন মেয়ে কী নাই যে বিয়ে করেও বাবা মার দায়িত্ব নিয়েছে? আছে। সংখ্যাটা কম। কিন্তু আছে। তাদের উদাহরণ মানেন। একটু দায়িত্ব দিয়ে ছেলেমেয়ে দুজনকেই বড় করেন। দুজনকেই সবল করেন। গোড়ায় তো আমাদের গলদ, এটাকে ঠিক না করে সামনে যাই কী করে?

এইসব দিবস নিয়ে কিছু হবে না যদি না সামান্য এবং প্রধান অধিকারটাই না পাই। নিরাপত্তা।
নিরাপত্তা না দিয়ে একটা দিবস হাতে ধরাই দিয়ে কিছুই পরিবর্তন হবে না। ৮মার্চে যে হাল, ৯মার্চেও সেই হাল।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 329
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    329
    Shares

লেখাটি ৮৬৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.