লেডি অব দ্য ল্যাম্প

0

সঙ্গীতা ইয়াসমিন:

হঠাৎ সেদিন রাত দুটোর দিকে সজোরে বাড়ির প্রধান ফটকে ধাক্কাধাক্কিতে আমাদের ঘুম ভেঙে গেল, বাবা বাইরে গেলেন, ফিরে এলেন একটি খাম হাতে করে, গুনগুনিয়ে খুশির সুর ভাঁজতে ভাঁজতে, তাঁর চোখমুখে প্রশান্তির ছাপ। খামের ভেতরে ছিল আমার পিতৃতুল্য প্রিয় শিক্ষকের স্বহস্তে লিখিত আশীর্বাদপত্রসহ লাল দাগে চিহ্নিত আমার মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলের পেপার কাটিং! আমি যে গ্রামে জন্মেছি, সেখানে জাতীয় পত্রিকা পাওয়া যেত দুইদিন পরে এবং তাও নিয়মিত নয়।

সেবারই প্রথম একযোগে ঢাকায় ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো, আমি চান্স পেলাম রংপুরে। শুরু হলো নতুন জীবন আমার। বাবা আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, “মামনি! একটা কথা মনে রেখো দুঃস্থ মানুষের কাছে ডাক্তার হলো ভগবান।”
পাবনার এক প্রত্যন্ত গ্রাম বনওয়ারীনগরে জন্ম আমার। গ্রামের গার্লস হাই স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ ছিল না, বাবা জোর করেই আমায় ভর্তি করে দিলেন ছেলেদের স্কুলে, যেখানে ক্লাশ নাইনে আমিই ছিলাম একমাত্র মেয়ে বিজ্ঞান বিভাগে। মাধ্যমিকে খুব ভালো ফলাফল করে নিজের ওপর আস্থা বেড়ে গেল। তারপর পাবনা সরকারী মহিলা কলেজ। দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে কখনো সখনো ৪/৫ মাইল পায়ে হেঁটেই করতে হতো কলেজ-বাড়ি। গায়ে এখনো কাদামাটির গন্ধ লেগে আছে আমার।

কথা হচ্ছিল একজন মানবীয় নারী, দলিত-গরীবদের ডাক্তার দিদিমণি, সমাজসেবী, বিদুষী, শিল্পানুরাগী এবং সর্বোপরি একজন ব্যস্ততম নারীর সাথে। ডাঃ সমর্পিতা ঘোষ তানিয়া, একজন জয়িতার সাথে। তাঁর শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়েই ওপরের কথাগুলো বলেছিলেন তিনি।

চারিদিকে যখন বরাভয়ের বড় আকাল, মন্দ সময়ের ডঙ্কা বাজছে দুন্দুমার,চিকিৎসা সেবা নিয়ে নানা গুঞ্জন, জাল-জালিয়াতি হচ্ছে চিকিৎসকের সার্টিফিকেট, চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসা, ক্লিনিক ও ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের ব্যবসা রমরমা, ডাক্তারখানা যখন রোগীর কাছে কষাইখানা এমন বিষবাষ্পে যখন সকলের নাভিশ্বাস উঠছে, ঠিক তখনই আমাদের চারপার্শ্বের আবর্জনার স্তূপ সরিয়ে কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থাকেন আলোর মশাল জ্বালিয়ে।যুগে যুগে এমন আলোর কাণ্ডারীরা এসেছেন আমাদের আঁধার ঘোচাতে, এমন মহাত্মারা ছিলেন বলেই আজও পৃথিবীটা সুন্দর।আলো দেয় সূর্য, পাখি গান গায়, রাতের অমানিশা কেটে ফুটে ওঠে দিনের নতুন আলো।

স্বভাবে ডানপিটে, মেধাবী,তার্কিক,আবৃত্তি-গান পাগল এমন প্রাঞ্জল ব্যক্তি যিনি পড়াশুনার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চায়ও একশতে একশ।মায়ের হাতেই হয়েছিল হাতে খড়ি।বাবা-মা দুজনই ছিলেন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ।তাঁরা মেয়েদেরকে মেয়ে নয় মানুষ হিসেবে দেখেছিলেন, এবং সেটাই ছিল তাঁর বেড়ে ওঠার বীজমন্ত্র।

পেশাগত জীবনে তাই শুধুমাত্র ডাক্তারী করেই তাঁর সাধ মিটল না।শিক্ষাজীবন শেষ করে রংপুর এফপিএবিএ তে চাকরি শুরু করেন।তৃণমূল, অবহেলিত, বঞ্চিত নারীদের জীবনের দুর্দশা খুব কাছ থেকে দেখেন সে কাজ করতে গিয়ে।তখনই ভাবেন তাদের জন্য কিছু করার কথা;সেই উপলব্ধিই পরবর্তীতে প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন মা ও শিশু স্বাস্থ্যবিষয়ক সেবাদান কেন্দ্র, “মুন ক্লিনিক”।যে ক্লিনিকের ২৯ জন কর্মীর মধ্যে ২৪ জনই নারী, যাদের বেশিরভাগই তৃনমূলের অবহেলিত, ভাগ্যবিড়ম্বিত নারী।

চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি করেন কাউন্সেলিং।কারো দাম্পত্য কলোহ, মেয়ের পড়াশুনা কিংবা বিয়ের খরচ নিয়ে সমস্যা, ছেলে ড্রাগে আসক্ত কিংবা কারো স্বামী বহির্মূখী! আসুন ডাক্তার দিদিমণির কাছে, প্রাণখুলে বলুন, উপায় বেরিয়ে আসবেই।তিনি শুধু তাদের ডাক্তার দিদিমণিই নন, তাদের কাছে তিনি ‘মাদার তেরেসা’। রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরে খেয়ে দেয়ে ঘুমোতে যাবেন, এমন সময় ফোন কল, অপর প্রান্ত থেকে কাকুতি মিনতি, ডাক্তার দিদি, আমার বৌয়ের খুব খারাপ অবস্থা, আপনি বাঁচান তাঁরে।

দিদিমণি সারাদিনের ক্লান্তি নিবারণে নরোম বিছানার পরশ উপেক্ষা করে ছুটলেন তৎক্ষণাৎ ক্লিনিক পানে ছুরিকাঁচি হাতে।আর এই দৃশ্য হঠাৎ কখনও কিংবা কালেভদ্রে নয়!এইই তাঁর নিত্যদিনের রোজনামচা।শুধু ক্লিনিকেই নয়, রোগির বাড়ি গিয়েও চিকিৎসা দেন তিনি।অবশ্যই বেশি লাভের জন্য নয়, বিনা ফিসে এবং ব্যবস্থাপত্রের সাথে ঔষধের খরচ-খরচাও দিয়ে থাকেন নিজ পকেট থেকে। তিনি এ যুগের ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল!মানুষের ভালোবাসাই যার ফি।

কাউন্সেলিং করতে গিয়ে প্রথমেই নারীদের আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলার কাজটি করেন, বলেন, আমি যদি পারি আপনিও পারবেন, আমিও যে আপনারই মত একজন নারী!গ্রামের অশিক্ষিতা, দুঃস্থ নারীদের সাথে নিজের কোনো তফাত দেখেন না তিনি। তাঁর এই নৈকট্য তিনি আত্মিকভাবেই অনুভব করেন।যার প্রমাণ মেলে কর্মচারীদের সাথে তাঁর সম্পর্কের মেলবন্ধনে।তাঁর প্রতিষ্ঠানে মালিক-কর্মচারীসূলভ সম্পর্ক নেই, আছে দাদা-দিদি।কাজের শেষে বিভিন্ন বিশেষ দিবসে তাদের জন্য বিশেষ আয়োজন থাকে, সাংস্কৃতিক চর্চায়ও তাঁরা সিদ্ধহস্ত; যা তাদের মনের খোরাকেরও জোগান দেয়।সকলে নিজের পরিবারের মতো ভালোবাসেন এই প্রতিষ্ঠানকে।আর সেটাই তো স্বাভাবিক, এর কর্ণধার যখন একজন মায়াবতী!

নিজের পেশার বাইরে রোটারী ইন্টারন্যাশনাল, ‘সুজন’, দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলন, ইনার হুইল ক্লাব, সাহিত্য পরিষদ, আবৃত্তি সংগঠন, ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে রয়েছে তাঁর আত্মিক যোগাযোগ।যখনই কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে, মঙ্গা-খড়া কিংবা বন্যা, তিনি ছুটে যান দুর্গত এলাকায়, শীতার্ত মানুষের পাশে শীতবস্র, ত্রাণ,গৃহনির্মান কিংবা দুঃস্থদের রক্তের প্রয়োজনে সন্ধানীর সদস্যসহ মেডিক্যাল টিম নিয়ে দাঁড়ান তাঁদের পাশে।

মানুষের ভালোবাসা ও প্রশংসার সাথে নানামুখি এই কর্মকাণ্ডের জন্য ইতোমধ্যে তিনি কুড়িয়েছেন অনেক সম্মাননা এবং পুরস্কার। বেগম রোকেয়া পদকসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান তাঁকে সম্মানিত করেছেন।সেই তালিকায় সর্বশেষ সংযুক্তি ছিল ২০১৭ এ, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর আয়োজিত শিক্ষা ও সমাজসেবায় জয়িতা ফাউন্ডেশনের “জয়িতা” পদক।

কোনো পরিসংখ্যান ছাড়াই বলা যায় আমাদের দেশের বিভিন্ন শহরে এমন অনেক ডাক্তার আছেন, বিশেষত, শহর ঢাকায় অনেক বিশেষজ্ঞ আছেন যাদের দৈনিক আয় ৫০ হাজারেরও অধিক।কিন্তু ক’জন আছেন নিজেদেরকে এমন আর্তমানবতার সেবায় নিয়োজিত রেখেছেন?ক’জন নিজের পেশার বাইরে গিয়ে সমাজের খানা খন্দে নিজেকে ডোবাতে ভালোবাসেন?কিন্তু সমাজের দূর্বল অংশের দায় কি আমরা আদতেই এড়াতে পারি?পিছিয়ে থাকা বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে হাত ধরে তুলে না ওঠালে আমাদের উন্নয়ন প্রকৃতই রয়ে যাবে বইয়ের পাতায় কিংবা প্রতিবেদনের খাতায়!

আন্তর্জাতিক নারী দিবসে মমতাময়ী এই নারীর জন্য প্রাণঢালা অভিবাদন! বেগম রোকেয়ার মতো দুঃস্থ নারীদের শিক্ষা ও সেবায় তিনি আলোক বর্তিকা। প্রত্যাশা করি বাংলা মায়ের ঘরে জন্ম হোক আরও অনেক সমর্পিতার। যারা কেবল সমর্পণ করতেই ভালোবাসবেন নিজেকে মানব কল্যাণে;পথ দেখাবেন আঁধারের পথিকেরে।

জয়তু হে সারথী, হে বন্ধু আমার!এ সময়ের লেডি অব দ্য ল্যাম্প!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 269
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    269
    Shares

লেখাটি ৫৬৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.