লেখালেখিতে কিছু না হলেও আওয়াজ তো তুলতেই হবে!

0

সালমা লুনা:

সবাই লিখছেন। লেখালিখিতে কী হয়! হয়তো কিছুই না।

আসলেও আজকাল আর কিছুতেই কিছু হয় না। এককালে বোধহয় হতো। পত্রিকায় চিঠি প্রকাশ হতো- এই এলাকার রাস্তা ভাঙা, আমাদের স্কুলে লাইব্রেরী নাই, পাড়ায় একটা ক্লাব কিংবা পাঠাগারের জন্য সাহায্য চেয়ে চিঠি যত্ন করেই ছাপা হতো। কোন বিষয়ে মতামতও ছাপা হতো মার্জিত ভাষায়।
এখন কত কী হলো । পত্রিকার কত ধরণ।
মানুষগুলোও বদলে গেলো।

গালাগালি কী শুধু এখনকার মানুষই জানে? আগের মানুষগুলো জানতো না?
তারা কি তখন কিছু পছন্দ না হলে এভাবেই গালি দিয়ে দিয়ে চিঠি লিখতো ?
হয়তো লিখতো।
সেগুলো সংশ্লিষ্ট সম্পাদকরা ফেলে দিতেন হয়তো। ছাপা হতো না পত্রিকায়। ছাপা হলে ঢিঁঢিঁ পড়ে যেতো পত্রিকার নামে, নিশ্চিত।

এখন কিছুই হয়না।
নামকরা কিছু পত্রিকার অনলাইন ভার্সানের খবরের নিচে যে সমস্ত মন্তব্য দেখা গেলো গত কয়দিনে তাতে যে কোন মানুষ অসুস্থ্য হয়ে পড়বে। কিন্তু পত্রিকাগুলো একটা নুন্যতম ব্যবস্থাও নিলো না এইগুলো বন্ধ করা বা না ছাপার ব্যাপারে।
গত তিনচারদিনের শুধু ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবালের আক্রান্ত হবার খবরে এবং গতকাল হতে মুক্তিযোদ্ধা ভাস্কর ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিনীর প্রয়াণের খবরে পাঠক মন্তব্যের ঘরে যা লেখা দেখলাম তাতে স্তম্ভিত হতে হয়। অসুস্থ্য হতে হয়। আতঙ্কিত হতে হয়। উদ্বেগ মাত্রা ছাড়ায়।

এটাই তবে বাংলাদেশের ভেতরের চিত্র! এমনই তবে এখনকার বাংলাদেশের মানুষ! নিশ্চয়ই না। তাহলে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ তাদের পাশে রইলেন, তাদের জন্য প্রার্থনা করলেন শুভকামনা জানালেন তারাই তো সংখ্যায় বেশি হবে বলেই মনে হয়।
তবে কেন এই আতঙ্ক?
উল্লেখিত অসুস্থ্যদের সংখ্যাটা নেহাত কম নয় বলেই এই ভাবনা। এবং সেখানে আছে আরো অনেক যোগবায়োগের অঙ্ক তাই এই উদ্বেগ।

কেউ কেউ বলছেন এটাই বাংলাদেশ নয়। আমিও তাই ভাবি। পরমুহুর্তেই যাদের অন্তত মানুষ ভাবি তাদের চিন্তাভাবনার প্রকাশ দেখে থমকে যাই। ওইসব মন্তব্য লিখিয়েদের চেয়ে তারা আরো ভয়াবহ। তাদের ভাবনায়, লেখায় প্রচ্ছন্ন সমর্থন আছে ওইসব অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত ভুলভাল বানানে গালি দেয়া, অশ্লীল কটুবাক্য বলা কিছু এদেশীয় এবং বেশীরভাগই মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতি।

তফাত শুধু এরা উচ্চশিক্ষিত। এরা তাদের ভেতরের আদিম নগ্ন ইচ্ছেটাকে ভদ্র বেশভূষায় প্রকাশ করেন এবং তাদেরই মতো আরো কিছু শিক্ষিতজনদের নিয়ে নিজেদের বলয়ে উল্লাসে মেতে উঠেন। প্রায়শঃই এদের একে অপরের পরিপূরক হতে দেখা যায়। অর্থাত তাদের মধ্যে অদৃশ্য যোগসূত্র আছে। আছে দৃশ্যমান এক বন্ধন। এরা বিচ্ছিন্ন নয় কিছুতেই। এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই শিক্ষিতরাও অনাবাসী বা প্রবাসী। এদের সাথে খুবই সন্তর্পণে যোগ দেন দেশের বিভিন্ন ধারা টারা, সাইবার ক্রাইম আইনের ভয়ে ভীতু বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেশেই বসবাসকারী মানুষ। ফাইনালি এদের যোগফলে যে বিশাল এক অংশ দাঁড়ায়, তাকে প্রতিবাদী গোষ্ঠী হিসেবে তারা নিজেরাই দেখাতে চাইলেও তাতে বরং বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের নীতিহীন বিবেকহীন অমানবিক এবং জ্ঞান খোকলা হয়ে আসা জীর্ণ রূপটাই প্রকাশ্য হয়ে উঠে। মনে ভীষণই ভীতির সঞ্চার হয়। আশাহীন হয়ে মুষড়ে পড়তে হয়।

অনেকেই পড়েনও। কিন্তু তখনও কেউ মুখ খুলতে চান না। তারা চুপ থাকেন। ভেতরেও নাকি কীসব ব্যাপার টেপার আছে। তাই চুপ থাকাই শ্রেয়।

অনেকেই আবার এসব দেখেন না। এসব নাকি দেখতে হয়না।
না দেখলে শান্তি হয়তো সাময়িক মেলে, কিন্তু পুরোপুরি পরিত্রাণ পাওয়া যায় কি ? যাবে কি?

এই যে একটা গোষ্ঠী গড়ে উঠলো যারা অন্যের মাথায় চাপাতির কোপে খিলখিলিয়ে হাসে, ঠাট্টা মশকরা করে, ইনিয়ে বিনিয়ে উনি কী কী কারণে কোপ খেয়েছেন তা জাস্টিফাই করতে চায়- সেই মানুষগুলি তো মধ্যম শ্রেণীর মানুষই। যারা খুব সহজেই সুখী বা দুঃখী হতে পারতো। যারা পড়ে যাওয়া মানুষের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় এখনো। মানুষের প্রতি মমতা যাদের এখনো আছে।

নইলে যেই মানুষটি প্রিয়ভাষিণীর মৃত্যুর খবরের নিচে কুৎসিত মন্তব্য লিখেন তার প্রোফাইলে গিয়ে কেন দেখি ফুটফুটে বাচ্চার ছবি দিয়ে দোয়া চাইছেন সকলের কাছে, নিজ সন্তানের জন্য! মৃত মাকে স্মরণ করছেন মায়ের সাদাকালো ছবি দিয়ে।
কেনইবা যিনি জাফর ইকবালকে কোপানো নিয়ে মজাদার বৈঠকে বসেন একটা পোস্ট দিয়ে, সেই তিনিই নিজ সন্তানের সফলতার খবর, বিজ্ঞানের প্রজেক্ট তৈরি করে বা কবিতা লিখে তার সন্তান কতোটা নাম করেছে স্কুলে সেই খবর দিতে গিয়ে গর্বিত পিতা হয়ে উঠেন। অথচ জাফর ইকবাল কী কী করে ভণ্ডামি করলেন তার খবর যত্ন করে ফলাও করে প্রচারে নেমেছেন। কিংবা প্রিয়ভাষিনী কেন মুক্তিযোদ্ধা হলেন বা কপালের বড় টিপে উনি কী বোঝাতে চাইলেন তা নিয়ে রগড় করছেন।

এইসব কেন? কোথায় কী ভুল হলো কার ?

আমরা চাইলেই এই গোষ্ঠীটাকে না দেখি করে থাকতে পারবো না। কেননা এরা আমাদেরি মানুষ, আত্মীয় বন্ধু বা স্বজন।

আবার জোর করে তাদের মুখ বন্ধ করানোও যাবে না। পাল্টা গালি দিয়ে তো নয়ই।
এইজন্য কোন পথ চাই। সুস্থ্য আলোচনা চাই। না হলে পরিস্থিতি তো খারাপের দিকেই যাবে। যাচ্ছেও।

আর অনলাইন পত্রিকাগুলোর ভূমিকার সমালোচনা না করে পারা যায় না। এ ভূমিকা যেন অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের। চোখ নাই, তামাশা দেখছে ঠিকই। বুঝতে পারছে সবই, কী করা উচিত। কিন্তু স্বার্থ বুঝে চুপ করে আছে। অবশ্য সকল মিডিয়াই এখন এইমতোই চলছে। তবুও অনলাইন পত্রিকাগুলো যেখানে চাইলেই পাঠকের জঘন্য এবং অমানবিক মন্তব্যগুলো ছাঁটাই করতে পারে বা না ছাপতে পারে, সেখানে শ’য়ে শ’য়ে সেসব ছেপে ওইসব আপাত পথভ্রষ্ট মানুষগুলোর অমানবিকতাকেই প্রমোট করছে। উৎসাহিত করছে আরো কিছু মানুষকে সংক্রামিত হতে, ওই পথে চলতে। শুধুমাত্র হিট হবার জন্যে। পাঠক পাবার জন্য।
এটিও অবিশ্বাস্য।

কেউই কি বুঝতে পারছে না বিদেশী সিনেমায় দেখা জম্বিদের মতোই এইসব সামাজিক জম্বিদের দ্বারা আক্রান্ত এই দেশ। এরা নিজেরা আক্রান্ত হয়েছে, পুরো দেশটাকেও আক্রান্ত করতে চাইছে।
এইসব জম্বিরা কুরে কুরে খেতে চাইছে মানবিকতার মগজ, রক্ত- মাংস। সবাইকেই তাদের মতোই জম্বি বানাতে চাইছে।

শিক্ষা , অর্থনীতি, চিকিৎসার মতো সেক্টর খাচ্ছে একদল হায়না। এখন মানুষও খাবে আরকদল। নিজেরাই মরবে নিজেদের হাতে। এত হতাশা আর কীভাবে বহন করবো আমরা ?
যারা বুঝতে পারছেন তারাও কিছু করছেন না। চুপ করেই আছেন। এই আক্রমণ অদৃশ্য। তবে ভয়ানক।

ভেতরের ব্যাপার যাই হোক এখানেই টার্নিং পয়েন্ট। এখান থেকেই ঘুরে দাঁড়াতে পারতেই হবে। বাংলাদেশের ভালোর জন্য । আমরা যারা যেকোনভাবেই দেশে থাকতে চাই। সন্তানদের দেশেই রেখে শিক্ষিত করতে চাই। সৎভাবে খেয়েপরে বাঁচতে চাই এবং সবকিছুর উপরে দেশটাকেই এখনো স্থান দিতে চাই তাদের জন্য এটা জরুরি- জীবন মরনের প্রশ্ন।

সব শেষ হয়ে যাবার আগেই সবাই মিলেই কিছু করুন।

নইলে ইতিহাস তো কাউকেই ক্ষমা করবে না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 155
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    155
    Shares

লেখাটি ৩০৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.