এবার আইন নিজের গতিতে চলুক!

0

রীতা রায় মিঠু:

জাফর ইকবাল স্যারের হত্যা প্রচেষ্টাকারীকে উপস্থিত জনতা হাতে নাতে ধরে বেদম পিটিয়ে আধমরা বানিয়ে আইনের হাতে তুলে দিয়েছে। আধমরা যুবকের ছবি দেখে সকলেই খুব খুশি এই ভেবে যে, এবার পালাবি কোথায়!

আইন এখন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।

ওয়াশিকুর বাবুকে তার মহল্লায় যে দুই যুবক চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল, সেই দুই যুবকও হাতে নাতে ধরা পড়েছিল। ঘটনাক্রমে দুজন হিজরা ঐ সময় ঐপথে যাচ্ছিল, তারাই ঐ দুই যুবককে চাপাতিসহ জাপটে ধরে ফেলেছিল।আশে পাশে তেমন জনগণ উপস্থিত ছিলনা তাই সেই দুই যুবককে পিটানি ছাড়াই আইনের হাতে সোপর্দ করা হয়েছিল।সেদিন সেই হাতে কড়া পরা দুই খুনিকে পুলিশের জিম্মায় দেখে খুশিতে কতজনে কেঁদেছিল! অভিজিতের খুনি ধরা পড়েনি, ওয়াশিকুরের খুনি ধরা পড়েছে। ঐ দুই হিজরা আমাদের চোখে জিরো থেকে ‘হিরো হয়ে গেছিল। আমরা সেদিন প্রথম জানতে পারলাম, ‘হিজরারাও মানুষ, তাদেরও মানবতা আছে, তারা খুব সাহসী”। আইনের হাতে সোপর্দ দুই খুনিকে দেখে নিশ্চিন্ত হয়েছিলাম ভেবে, এবার অভিজিতের খুনিরাও ধরা পড়বে।

সেই থেকে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে আজও।

আমেরিকান নাগরিক অভিজিত হত্যাকাণ্ডের রহস্যের জট খুলতে সহায়তা করতে এসেছিল আমেরিকার এফবিআই। তারা গজ ফিতা দিয়ে হত্যাকান্ডের জায়গার পরিধি মেপে টেপে আমেরিকা ফিরে এসেছিল। অভিজিত হত্যাকাণ্ড রহস্য এখনও রহস্যই রয়ে গেছে। অভিজিতের বাবা ডঃ অজয় রায় আইনি প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন।

আইনি প্রক্রিয়া চলছে, এখনও আইন নিজের গতিতে চলছে।

নীলয়, অনন্ত, জুলহাস, তন্ময়রাঅ চাপাতির নীচে মাথা রেখে দুই টুকরা হয়ে মরে গেছে। ওদের খুনিরা ধরা পড়েনি মনে হয়। তাই আইনের হাতে কেউ সোপর্দ হয়নি, খুনি ধরা পড়ে আইনের হাতে সোপর্দ হওয়া মাত্র আইনী প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং আশা রাখি,

ওদের বেলায়ও আইন তার নিজের গতিতে চলবে।

আইনের ধর্মই নিজের গতিতে চলা। আইন কখনও শোকাতুরের শোক বোঝে না, সন্তান হারানোর ব্যথা বোঝে না। আইন কখনও ধেয়ে আসা অপরাধের গতি নির্ণয় করতে পারে না। কারণ আইন থাকে বইয়ের পাতার ভেতর সযত্নে রক্ষিত অবস্থায়। আইন ভদ্রজনের জন্য, দলে দলে গণ্ডায় গণ্ডায় উৎপন্ন হওয়া চাপাতিওয়ালা ঠেকানোর আইন আইনের বইয়ে লিপিবদ্ধ নেই। তাই আইন নিজের গতিতে চলে।

জাফর স্যার, আপনি জানতেন একদিন চাপাতির কোপ আপনার ঘাড়ে এসে পড়বে, এও জানতেন যে তখনও আইনি প্রক্রিয়ায় আপনার খুনিদের তত্ত্ব তালাশ চলবে, এবং আইন তার নিজের গতিতে চলবে।

খুনি ধরা পড়বে কিনা, ধরা পড়লেও জনগণ আর তাদের কথা মনে রাখবে কিনা, জনগণের স্মৃতি বিভ্রমের সুযোগে খুনিরা কোন এক ফাঁকে টুক করে আইন ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে যাবে কিনা, তাতো আর জানতে পারতেন না।

এত দামী প্রাণ চাপাতির নীচে চলে যেতো, মানববন্ধন হতো দুই একদিন। এরপর বছরের একদিন আপনার ফটো সাজিয়ে কিছু মানুষ মোমবাতি জ্বালিয়ে স্মরণ করতো। নিজের মনকে হয়তো প্রবোধ দিয়েছেন এতদিন, তবুও আমাকে স্মরণ করার জন্য কিছু ছাত্র ছাত্রি, পাঠক ভক্ত আছে, যেমনি আছে অভিজিতের কিছু ভক্ত। একইভাবে মারা গেলো ওয়াশিকুর, নিলয়, প্রিয় ছাত্র অনন্ত, জুলহাস, তন্ময়রা! কই, তাদেরতো কেউ মনে রাখেনি, বছরের কোন দিন তারা চাপাতির নীচে মাথা দিয়েছে, সেটাও সবাই ভুলে গেছে। তাদের প্রাণওতো তাদের কাছে দামী ছিল, এমন করুণ মৃত্যুতে তারা কি পেলো! তাদের বেলায় খুনিও ধরা পড়লোনা, আইনও চলতে শুরু করলোনা, কেউ তাদের ফটো সাজিয়ে একটা মোমবাতিও জ্বাললোনা।

ভাগ্যবান জাফর স্যার, আপনি সত্যি সত্যি ভাগ্যবান। চাপাতি লিস্টে এক নাম্বারে আছেন, তাই সরকার থেকে নিরাপত্তা প্রহরী পেয়েছিলেন। নিরাপত্তা প্রহরীদের দেখলাম মঞ্চে আপনার পেছনে না দাঁড়িয়ে মঞ্চে উপবিষ্ট অন্যদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল সাক্ষাৎ দুই মৃত্যুদূত! এতো কাছে মৃত্যুদূত দাঁড়িয়ে, এতো দূরে নিরাপত্তা রক্ষীরা, তারপরেও চাপাতির আঘাতে আপনার মাথাটা ঘাড় থেকে খুলে পড়ে যায়নি। স্যার, আপনি ভাগ্যবান, মৃত্যু দরজায় দাঁড়িয়ে, আপনি অরক্ষিত অবস্থায়, তারপরেও বেঁচে গেছেন। আপনার মায়ের দোয়া মাথায় আছে তাই মাথাটা রক্ষা পেয়েছে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে হয়তো ভাবছেন, “আহারে, আমার ছাত্র-ছাত্রীরা ফয়জুর নামের ধর্মোন্মাদ যুবকটিকে আইনের হাতে সোপর্দ করার আগে কী মারটাই মেরেছে! আমি তো মারা যাইনি, আমি তো বেঁচে আছি। ছেলেটাকে পিটানোর কী দরকার ছিল, জাপটে ধরে আইনের হাতে তুলে দিলেই হয়ে যেতো, আইন তার নিজের গতিতেই চলতো।”

স্যার, আইন নিজের গতিতেই চলে, এখনও নিজের গতিতেই চলবে। আইনের গতি কচ্ছপের গতির চেয়েও ধীর। আইন দৌড়ে চলার নীতিতে বিশ্বাস করে না, আইন চলে ধীরে সুস্থে চারদিক দেখেশুনে। আইনের গতির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করা যায়, কিন্তু কতকাল অপেক্ষা করবেন? জাতির পিতা সপরিবারে নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলেছে বলেই বিচার সম্পন্ন হতে ৩২ বছর পেরিয়ে গেছে। আর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার গড়িয়েছে ৪২ বছর।

স্যার শুনুন, যা হাতে নাতে পাওয়া যায়, ওটাই আসল, বাকি সব উপরি। উপরি আয়ের ভরসা নাই। আপনি ভাগ্যবান, নিরাপত্তা রক্ষী কাছে-পিঠে থাকার পরেও আপনার উপর এমন ন্যাক্কারজনক হামলা হয়েই গেলো, হামলাকারী দুজন ছিল, একজন পালিয়ে গেছে আরেকজন তো ঠিকই ধরা পড়েছে। সেও তো পালিয়ে যেতে পারতো।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার, সবচেয়ে খুশির ব্যাপার যেটা, হামলাকারীর উপর ছাত্রছাত্রীদের উত্তম মধ্যম। আপনার উপর ছোঁড়া হামলার বিচার হাতে-নাতে নগদে নগদে পেয়ে গেলেন। আপনার প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা ছোরা হামলাকারীকে ধরে উত্তম মধ্যম দিয়ে আধমরা বানিয়ে জায়গার বিচার জায়গাতেই করে দিয়েছে।

এবার আইন তার নিজস্ব গতিতে চলুক।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 66
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    66
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.