যে পথ গেছে সন্ধ্যা তারার পাড়ে…

সালেহা ইয়াসমীন লাইলী:

ছোটবেলায় যখন ঠিকমতো পড়তেই শিখিনি, তখন মালেকা আম্মা (ফুফু) আলাওলের সবগুলো পুঁথি পড়িয়ে শুনিয়েছিলেন। মহাকবি আলাওল পড়তে গিয়ে মালেকা আম্মার সাথে সেই ভারী বইগুলোকে খুব মনে পড়ে। সেই পদ্মাবতীর “আপদ লম্বিত কেশ কস্তুরী সৌরভ। মহা অন্ধকার মনোদৃষ্টি পরাভব।”
– কীভাবে এই লাইন দুটির ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন আজো যেন তাজা! তারপর সয়ফল মুল্ক বদিউজ্জামাল, সপ্ত পয়কর, সতী ময়না, তোহ্ফা ও সিকান্দরনামার ” মন্দকৃতি ভিক্ষাবৃত্তি জীবন কর্কশ। পুত্র দারা সঙ্গে মুয়ি হৈ লুঁ পরবশ।

আহা! আম্মা, আপনি কতো স্বশিক্ষিত ছিলেন যে এই ভাষার ব্যাখ্যা কতো সহজ করেছেন আমাদের কাছে! আপনি সময়ের আগে চলে যাওয়া এক উল্কা।
জীবনের কাছে আপনি এতো পজেটিভ ছিলেন যে কোনো পরিস্থিতিতে আপনি অবিচল থাকতেন। সমাজ, সংসার, পরিবার কেউ আপনাকে স্বস্তি দেয়নি। আপনার জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি দুঃসহ ঘটনার জন্যও পরিবার সমাজ আপনাকেই দায়ী করতো। আপনি নির্বাক্যে তা মেনে নিতেন। যেমন মেনে নিয়েছিলেন ক্যান্সারকেও। দীর্ঘদিন ক্যান্সারে চিকিৎসাহীন ভুগে আপনি অসময়ে চলে গেছেন ওপারে।

মালেকা আম্মা আমার আব্বার জ্যাঠাতো বোন হলেও আমাদের বাড়িতে চার ছেলে-মেয়েসহ কাজের লোকের মতো খাটতেন। সারাদিন বাড়ির কোন মানুষটি কোনবেলা ঠিকমতো খায়নি, কার খাবারে কী পছন্দ, অপছন্দ এসব সবচেয়ে যে মানুষটি যত্ন সহকারে মনে রাখতেন, তিনি মালেকা আম্মা।
আমাদের গল্প বলা আম্মা। পছন্দের খাবার লুকিয়ে রেখে মুখে তুলে খাইয়ে দেয়া আম্মা। যেকোনো পরিস্থিতিতে হাসিমুখের সাথে তার সর্বংসহা রুপটি পাশাপাশি চলতো দৃঢ়তার সাথে।

আমাদের বাড়িতে ৩০/৩৫ জন মানুষের রান্নাঘরের দায়িত্ব ছিল তার। তিনি ঠিক রাধুনীর কাজ করতেন না। রান্না করতেন সখিনা নামের এক বুবু। ফুপু বেড়ে দিতেন। তুলে দিতেন। আমাদেরকে গল্প বলে বলে নিজের হাতে খাইয়ে দিতেন। তিনি তার গল্প ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতেন। খেতে খেতে যেখানে গল্প শেষ হতো, পরদিন সেখান থেকেই শুরু হতো।
এক একটি গল্প বলতে তার দীর্ঘদিন লেগে যেতো। গল্পের ভেতর আমরা একে একে আট ভাইবোন বড় হয়ে গেছি, তার গল্প শেষ হয়নি। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি শিক্ষিত না হলেও অনেক বেশি জ্ঞানী ছিলেন। এই গল্প বলাতে তিনি বিরাট বিরাট পুঁথি থেকে পড়ে শোনাতেন। প্রত্যেকটি শব্দ, বাক্যের ব্যাখ্যা করতেন, বিস্তার করে বলতেন। সবাই মুগ্ধ হয়ে তার পুঁথি পাঠ শুনতে বসে যেতো।

মালেকা আম্মার নিজের ছিল চার সন্তান। তারাও আমাদের বাড়িতে যে যার মতো কাজ করতো। আব্বা অবশ্য চাইতেন তারা পড়ালেখাও করুক। কিন্তু তারা কেউ স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি। মালেকা আম্মা কোনদিন শ্বশুরবাড়ি যেতে পারেননি। বিয়ের পর তার জামাই আজগার মন্ডল আম্মার বাবার বাড়িতে নিজেই থাকতে এসেছেন। তিনি তেমন কিছুই করতেন না। বসে বসে খেতেন। অবশ্য সংসারে তার নাকি মন টিকতো না। তিনি এক নাগাড়ে তিন মাস বাড়িতে থাকতে পারতেন না। মাঝে মাঝে নিখোঁজ হয়ে যেতেন। কয়েকমাস পর পর ফিরতেন। এভাবে চার সন্তানের মা হোন মালেকা আম্মা।

পরে আসা যাওয়ার এই সময় বাড়তে থাকে তার। একসময় ফুফা যখন ফিরে আসতেন, সাথে করে নিয়ে আসতেন নতুন এক একজন বউ। মালেকা আম্মা তখন নিজের ঘরটি জামাই ও তার নতুন বউকে দিয়ে মায়ের সাথে ঘুমাতে যেতেন নিজের সন্তানদের নিয়ে। এই নতুন বউ কখনও পুরাতন হতো না। কিছুদিন যেতে না যেতেই ফুফা যখন আবার বেরিয়ে পড়তেন, নতুন বউও হারিয়ে যেতো। এই নতুন বউদের সাথে আম্মার কোনো বিবাদ হতো না। বিবাদ হতো না ফুফার সাথেও। এভাবে ফুফা মালেকা আম্মাকে বাদ দিয়ে আরো সাতজন বউ নিয়ে এই বাড়িতে এসেছিলেন। শেষবারের বউয়ের বাবার বাড়িতে মারা যান ফুফা।

মালেকা আম্মা নিজের জীবনে কখনই শান্তি পাননি। কিন্তু সবাইকে শান্তি দিতে চেয়েছেন। নিজে কখনই আনন্দ পাননি, আনন্দ দিতে চেষ্টা করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। তার বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি যেতে না পারা, জামাই সংসারী না হওয়া, সন্তানদের মানুষ করতে না পারা, সবকিছুর জন্য পরিবার তাকেই দায়ী করতো। তিনিও নিজের নিয়তি ভেবে নির্লিপ্ত মেনে নিতেন। শেষে যখন ডাক্তার তাকে জানালেন যে তার ক্যান্সার হয়েছে, সেটাও তিনি মেনে নিয়েছিলেন। কোনো চিকিৎসা হয়নি তার। কারণ তার চিকিৎসা করার মতো কেউ ছিল না।

আপনার প্রতি আমার খুব রাগ হচ্ছে আম্মা। আপনি যে অপরাধ করেননি, তার জন্য কেন শাস্তি মেনে নিলেন? আপনি কেন সমাজকে বদলাতে কোন আঘাত করেননি? যে পরিবার-সমাজ আপনাকে ভাবেনি, আপনি তাকে কেন তোয়াক্কা করে গেছেন?

আজও আপনার পরিবার একটুও বদলায়নি আম্মা। এখনও তারা মেয়েদেরকে নিয়তি ভেবে অশান্তির সংসারে দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে থাকতে বাধ্য করে! মনের মাঝে ক্যান্সার বেশিদিন বয়ে বেড়ালে তা শরীরেও বাসা বাঁধে। আপনার পরবর্তী প্রজন্ম আপনার পথেই হয়তো চলে যাবে।

লেখক সাংবাদিক

শেয়ার করুন:
  • 204
  •  
  •  
  •  
  •  
    204
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.