আমার যত অনলাইনীয় অপরাধ…

0

শেখ তাসলিমা মুন:

অনলাইনে জীবন বাঁধা দিয়েছি সে নয়, তবে অনলাইন কিছু সুবিধা দিয়েছে, সে অর্থে সেই সুবিধাভোগী হিসেবে অপরাধ করেছি, সেটি অস্বীকার করতে পারছি না।

আজকের যে শিশু একটি ডিজিটাল সময়ে জন্মগ্রহণ করে বেড়ে উঠছে, তারা যে সুবিধা পেয়ে বড় হয়ে উঠছে, তারা একটি বিষয়ে অনভিজ্ঞ থেকে যাচ্ছে, এসকল সুবিধা ছাড়া যারা বেড়ে উঠেছিল, তাঁরা কীভাবে বেড়ে উঠেছিল?

সেই ‘তারা’র ভেতর আমি একজন নিঃসন্দেহে। অনলাইনের সুবিধা অনেকটা না চাইতেই বৃষ্টির মতো। অন্তত আমার মতো যে বিদেশ বিভুঁইয়ে জীবনের একটি বড় সময় কাটিয়েছে। বলা যায়, আমার বিদেশে পদার্পণের মুহূর্তে টেকনোলজি কোনো অর্থেই এখন যা সেটি ছিল না। এসে পৌঁছুনোর খবর আমাকে চিঠি লিখে জানাতে হয়েছিল। সে চিঠি বাড়িতে পৌঁছেছিল ১৫ দিন পরে। তাতে বাসার কারও সমস্যা হয়েছে, তা নয়। তাঁরা জানতো, বিদেশ থেকে চিঠি আসতে দু-তিন সপ্তাহ লাগবে। তাঁরা সেভাবেই মাথায় বিষয়টি প্রোগ্রাম করে নিয়েছিল। খুব এমারজেন্সি হলে টেলিফোন করতাম। মনে আছে, পাশের বাসায়। তিন মিনিট। প্রতি মিনিট এখানকার ১৮ টাকা। গলাটা শুনতে পেলেই আনন্দে প্রাণ পূর্ণ হয়ে যেতো। তিন-ছ মাস থাকা যেতো চোখ বন্ধ করে। এ গল্প খুব বেশিদিন আগের কথা নয়।

সে সময় আমাদের কোনো মোবাইল ফোন ছিল না। ঘরের বাইরে থেকে ফোন করার ভেতর ছিল কয়েন বক্স। কয়েন ফেলেই তখন অনেক স্টুডেন্ট ফোনের কাজ সারতো। ল্যান্ড টেলিফোনের খরচ বাঁচানোর জন্য অনেক ছাত্র নিজেদের ঘরে ফোন রাখতো না। স্টুডেন্ট করিডোরগুলোতে একটি করে মোবাইল কয়েন বক্স থাকতো। সেটি মুভ করা যেতো। কয়েন ফেলতো, আর কথা বলতো। পেছনে অনেকে লাইন দিয়ে থাকতো। কাজেই বেশিক্ষণ কথা বলাও যেতো না।

সিটিতে মাঝে মাঝে কয়েন বক্স খারাপ হয়ে যেতো। কিংবা দুষ্টু ছেলেরা বলতো, কিছু ‘এক্সপার্ট’ ছেলেপুলে এটি নষ্ট করতো। তাতে যা হতো, তাঁরা পাঁচ টাকার কয়েন ফেলে দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতো। দেশেও কথা চলতো। নিজেদের ভেতর ঘটনা চাউর হয়ে যেতো কোন কয়েনবক্স নষ্ট। দেশে ফোন করার হ্যাপি আওয়ার চলতো। একদিন রাত-দুপুরে সবাই গিয়ে দেখি সেখানে লাইন বিশাল। কে যেন টেলিবিভাগে ফোন করে দিয়েছে। সুযোগ শিকেয় উঠলো। এরপর কোথাও কয়েন বক্স নষ্ট হলে কেউ আর মুখ খোলে না।

সে এক সময় ছিল। তবে খুব কাছের সময়! শেরশাহ’র সময় না!

প্রথম প্রথম এসে বাংলা অক্ষর দেখতে বড় ইচ্ছে করতো। দেশ থেকে নিয়ে আসা কয়েকটি দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ত্যানা ত্যানা হয়ে গিয়েছিল। তবু পড়তাম। কিছু লেখা সম্পাদক বরাবর লিখে পাঠাতাম। সেগুলো ছাপা হয়েছে কিনা কোনদিন জানতে পারিনি। অনেক বছর পর দেশে গেলে দেখি আমার ছোটবোন কিছু কিছু লেখা ‘পেপার কাটিং’ করে রেখেছে। সেগুলো আমি লিখেছিলাম মনেও করতে পারিনি।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলন দেশে থাকতে শুরু করি। কিন্তু শেষ করার মুহূর্তে বিদেশ চলে আসি। যোগাযোগ করতে না পারার সে কী বেদনা, কাউকে বুঝানোর নয়।

এরপর কতদিন চলে গেছে! অল্পদিন, নাকি অনেকদিন। জানি না। হিসেব করা বন্ধ করে দিয়েছি। বাংলা অক্ষর দেখিনি বহুকাল। রাতদিন ভিন ভাষা শিখি। কাজ করি রাতে-দিনে। কত কী! একটি কাগজে কলম চেপে বাংলা লিখিনি। অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল।

হঠাৎ ইন্টারনেট বলে একটি বিষয়ের আবির্ভাব। পৃথিবী এলোমেলো। ইমেইল করা যায়। সে আনন্দে চোখে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। একজন আমাকে দেখিয়ে দিল, কীভাবে বাংলা নিউজ খুঁজে পাওয়া যায়। নিউজের দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে থাকলাম। ফেসবুক তারও বহু পরের কথা।

ব্লগে রেজিস্ট্রেশন ছিল আমার জন্য একটি চমক। একটি লেখাকে ঘিরে উত্তর-প্রত্যুত্তর পড়ে চমকিত হতাম। ভাষা ছিল মুক্ত। তখনও আন্দাজ করিনি, লেখার জন্য চাপাতি নামক একটি কুঠার দিয়ে সেইসব কর্ষিত চিন্তাশীল মস্তকগুলো দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য কোথাও একটি গ্রুপ প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

ফেসবুক একাউন্ট আমার তারও পরে। ফেসবুকের কাছে কৃতজ্ঞতার সীমা নেই। সেবার যখন ইভটিজিং প্রকোপ বাড়লো, শিক্ষক প্যারেন্টস ভাই নিহত হতে লাগলো উত্যক্তকারিদের হাতে, আমরা একত্রিত হয়েছিলাম ফেসবুকে। ফেসবুক থেকেই রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল শহরে প্রতিবাদ নিয়ে যেতে পেরেছিলাম।

সেই শুরু।

ফেসবুকের কাছে সবচাইতে কৃতজ্ঞতা ২০১৩ এর ৫ ফেব্রুয়ারি। কিভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল একটি আন্দোলন। ‘জয়বাংলা’ উচ্চারণ ফিরে এসেছিল জনতার মুখে। ‘রাজাকারের ফাঁসি চাই’ এ দুর্বার উচ্চারণ ফিরে এসেছিল এ ফেসবুকের ইভেন্টের মাধ্যমেই। শাহবাগের মহাসমুদ্র সৃষ্টি করতে পেরেছিল ফেসবুক। সেদিন মানুষ একটি গন্তব্য পেয়েছিল। শাহবাগ। ছোট, বড়, শিশু, বৃদ্ধা, জননী-জনক, গৃহবধূ, চাকুরীজীবী, হতদরিদ্র ভিক্ষুক, খেটে খাওয়া মানুষ, মৃত্যু পথযাত্রী ক্যান্সার পেশেন্টস রাস্তায় নেমে এসেছিল।

আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ। তাঁদের জন্য আমরা কিছু ঘাতকের বিচার চোখে দেখে যেতে পারলাম এ জীবনে। ফেসবুক থেকে শুরু করে সকল অনলাইন মাধ্যম সেদিন বাঁচতে শিখিয়েছিল। মরার পরও আবার মৃত স্বপ্নরা বেঁচে ফিরে এসেছিল। মানুষ মানুষের কাছাকাছি আসতে পারার কারণেই সেটি সম্ভব হয়েছিল। সে দিনগুলো কোনদিন ভুলে থাকতে পারবো না। ফেসবুকের মাধ্যমেই পৌঁছেছিলাম প্রিয়ভূমিতে। আমাদের বাবা-মায়ের হত্যার বিচারের জন্য সোচ্চার হতে পেরেছিলাম। এ পাওয়ার সাথে কোনকিছুর তুলনা হয় না।

একের পর এক সতীর্থদের হত্যা করা হয়েছে। কেঁদেছি, চিৎকার করেছি ফেসবুকে। দূর থেকে এভাবেই হাহাকার ও প্রতিবাদকে পৌঁছে দিয়েছি।

আন্দোলনের একজন হতে পেরে, প্রতিবাদ করতে পেরে এ জীবনের অর্থ খুঁজে পেয়েছি।

এরপর কখন কিভাবে যেন এটি জীবনের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। মত প্রকাশই শুধু নয়, একের পর এক আন্দোলনে অংশ নিতে পেরেছি। আন্দোলনকে গড়ে তুলতে পেরেছি। মতামত গড়ে তুলতে পেরেছি।

দু বছরের ধর্ষিতা থেকে রূপা, তনু থেকে মিতু ছুটে গেছি প্রতিদিন। ছুটে গেছি রানা প্লাজা ধ্বসের কাছাকাছি। আমার ক্ষুদ্রতা থেকে এক লাখ টাকা পাঠিয়ে দিয়েছি অনলাইনের মাধ্যমেই।

হোক হাজার মাইল দূরে, কাছে যেতে পেরেছি প্রাণ নিয়ে। প্রতিবাদ নিয়ে। কখন, কীভাবে এর সবটুকুন জীবনের অংশ হয়ে গিয়েছে।

ডিসেম্বরের ২০১৭ থেকে সেই আমার ফেসবুক একাউন্ট একের পর এক স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদ ধরে ব্যান করা অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ নিশ্চয়ই গুরুতর। সে গুরুতর অপরাধ উপরে বলেছি যৎসামান্যই।

বার বার দীর্ঘমেয়াদী ব্যান হয়ে চলেছি। এখন নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সময়। যা কিছু নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তার প্রতি নির্ভরতা গড়ে তুলে কিছু করার ভাবনা চিরস্থায়ী হতে পারে না। সময় এসেছে আবার নতুনভাবে ভাবার। নতুন পথে এগুনোর। অনুধাবন করার, কোন পন্থাই স্থায়ী নয়।

এখন নতুন করে ভাবতে হবে, কীভাবে নিজের আদর্শিক মতামত ও পথ নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। একটি প্লাটফরম যখন এতোটাই নড়বড়ে যেখানে কিছু মানুষ কিছু একাউন্টকে জিম্মি করে রাখতে পারে সম্পূর্ণ অর্থহীন পন্থায়, সেখানে এ মাধ্যমগুলোর উপর নির্ভরতা একটি হাস্যকর শব্দ।

সময় এসেছে ফেসবুক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার। সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। নতুন পথে এগুনোর।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 38
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    38
    Shares

লেখাটি ৩৮২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.