মৃত্যুর পরও কাঠগড়ায় নারী!

0

শেখ তাসলিমা মুন:

তারুণ্যে কিছু কিছু হিন্দি ছবি দেখা হয়েছে। তবে খুব কম। তখন ‘ভিসিআর’ বলে একটা জিনিসের প্রাদুর্ভাব হয়েছিল। ঘরে ঘরে। না থাকলে পাড়ার দোকানে ভাড়া পাওয়া যেতো। শুক্রবার সারাদিনের জন্য ভাড়া করে যত পারো দেখো। চুলোয় গরু ভুনা পুড়ছে। গৃহিণী ভিসিয়ার আর রান্না ঘর করছেন। চলছে জমজমাট হিন্দি ছবি।

আমার হিন্দি ফিলিম সেই সময়ের। শ্রীদেবীকে দেখা আমার তখন। মিষ্টি চেহারার শ্রীদেবী কিছুটা “chubby”। আসলো মাধুরী দীক্ষিত। চিকনি ফিগার। নাচে জয় করে ফেললো। ইউনিভার্সিটিতে পড়াকালীন বিকেলে কার ফিগার কেমন তা নিয়ে তুলকালাম আলোচনা হতো।

‘উহু, শ্রীদেবী যতো সুন্দর নাচই নাচুক, মোটাসোটা ‘গাইয়া’।’ মতামত আমার ছবি বিশেষজ্ঞ বন্ধুর। তখনও চিকনা ফিগারের কায়দাটা মনে হয় শ্রীদেবী আয়ত্বে আনতে পারেনি। আমার অবশ্য সেসবে কোন আগ্রহ ছিলো না। আমি হিন্দি ছবি দেখেছি হাতে গুণে, তবে আমার প্রেম ছিল শাবানা আজমি, স্মিতা পাতিল, নাছিরুদ্দিন শাহ। পাশের ঘরে দেখতাম দূর দেশে এসে কী দেখবে সেজন্য পাবলিক শ্রীদেবীর পাঁচটা নাচের ভিডিও করিয়ে এনে দিনরাত দেখছে, তখন এই শ্রীদেবী বিষয়টির উপরই মনটা বিষিয়ে গিয়েছিল। শ্রীদেবী মানে আমার কাছে পাশের রুমে সমানে নাচের ভিডিও চলা। ধুম ধাড়াক্কার নাচ চলছে। দেহ কসরত চলছে। কিছুটা “chubby” শরীর দুলছে। আমি রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা পড়ছি।

আমি স্বীকার করছি, সেটি শ্রীদেবীর প্রতি আমার ন্যায়বিচার ছিল না। নিশ্চয়ই শ্রীদেবী তার থেকে অনেক বেশি। তার জনপ্রিয়তা শুধু তার নাচ ছিল না। কেবল আমার মনস্তত্ব আমাকে শ্রীদেবী বিষয়ে অজ্ঞ করে রেখেছিল।

এরপরে কিছু লিঙ্ক দেখেছি আমি ফেসবুকের কল্যাণে। কোনো টিভি শোতে। দেখে আমি চিনতে পারিনি ওটি শ্রীদেবী ছিলেন। আমার দেখা শ্রীদেবী তখন বদলে গেছেন। অনেক স্কিনি ফিট এবং অন্যরকম। যাই হোক ছবি আমার দেখা হয়নি বড়।

হঠাৎ আবার শ্রীদেবী খবর হয়ে এসেছেন। বড় মর্মান্তিক খবর হয়ে। তিনি দুবাইয়ের একটি হোটেলে মৃত্যুবরণ করেছেন। সেখানে তিনি গিয়েছিলেন একটি বিয়েতে অংশ গ্রহণ করতে। সেখানে তিনি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন, এমনই শুনলাম। মনে মনে ভাবতে চেষ্টা করলাম, এতোটা বয়স হয়ে গিয়েছিল বুঝি? না, দেখলাম বয়স ৫৪। বেশ খারাপ লাগলো। আমার থেকে খুব বেশি বড় নন তিনি! হায়! তবে কি দুয়ারে দাঁড়িয়ে গাড়ি?

ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে জনগণের কারণ নির্ণয় করা, কেন তার ম্যাসিভ কার্ডিয়াক এরেস্ট? তার প্লাস্টিক সার্জারি, বোটক্স, অতিরিক্ত স্কিনি হওয়া, মদ খাওয়ার অভ্যেস বা এন্টি ডিপ্রেসিভ পিলস। এতো এতো কারণ তার মৃত্যুর! শুরু হয়ে গেল জৌলুসপূর্ণ তারকার ‘অন্ধকারের জীবন’ উপড়ানো!

একদিনও পেরুলো না। শ্রীদেবী মারা গেছেন মদ্যপ অবস্থায় বাথটাবে ডুবে। দাঁড়িপাল্লায় তোলা হয়ে গেছে তাঁর মৃতদেহ। কতবার বিয়ে হয়েছে তাঁর। কার কত নাম্বার স্ত্রী, কার ঘর ভেঙে কার স্বামীকে ভাগিয়ে নিয়ে কার কার সন্তানের মা হয়েছে, কত নাম্বার সন্তান কার ইত্যাদি ইত্যাদি। ফরেনসিক পরীক্ষায় তাঁর দেহ থেকে সের সের অ্যালকোহল পাওয়া গেছে। মদ খেয়ে হুঁশ না থাকায় সে বাথটাবের জলে ডুবে তলিয়ে গেছে।

শ্রীদেবী একজন স্টার হলেও সে একজন নারী, সেটি আর আলাদা করে বলার দরকার নেই। না হলে এতো গবেষণা, এতো বিচারের দণ্ড নিয়ে বসার সময় কারও হতো না। একটি দেহ ওখানে পড়ে আছে। যে দেহে প্রাণ নেই। সেই প্রাণ কীভাবে গেল সেটি নিয়ে অবশ্যই মানুষ জানবে। পুলিশ বিভাগ, মেডিকেল বিভাগ সে বিষয়ে কাজও করছে।

এরই ফাঁকে লাশের চরিত্র নিয়ে বাজার বসে গিয়েছে।

শ্রীদেবী মদ খেয়ে তুমুল মাতাল ছিলেন। শ্রীদেবী বিউটি সার্জারি করিয়েছেন এক হাজার বার। শ্রীদেবী শ খানেক বিয়ে করেছিলেন। হায় নারী! মরেও তোর মুক্তি নেই!

ফ্যাক্ট হলো, শ্রীদেবী জীবিতকালে একজন এডাল্ট পার্সন ছিলেন। এগুলো যদি তিনি করে থাকেন, তবে তিনি তাঁর নিজ দায়িত্বে করেছিলেন। তিনি এখন মারা গেছেন। তাঁর মৃত্যুটাকেও কি রেসপেক্ট করা যায় না?

কেবল জীবদ্দশায়ই নয়, মৃত্যুর পর যেন নারীর কলঙ্ক লক্ষগুণে বেড়ে যায় সমাজে। রমরমা হয়ে ওঠে খবরের কাগজ, রেডিও, টেলিভিশন, সিনে পত্রিকা, ঘর গ্রৃহস্থালি, চায়ের দোকান আর তাসের আড্ডা।

উপমহাদেশে নারীর দেহ আর চরিত্রের পোস্টমর্টেমের এ উৎসব আর কত? আরও কতদিন? কতো কাল?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 271
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    271
    Shares

লেখাটি ২,৬৯২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.