“ঠোঁট লাল করিয়া ছবি দিয়া নারীবাদী হইতে আসছে?”

0

ফারজানা নীলা:

“ঠোঁট লাল করিয়া ছবি দিয়া নারীবাদী হইতে আসছে?” ইহা একটি মেসেজ যাহা আমার ফেসবুকে এসেছিল অনেক মাস আগে। এতোদিন দেখি নাই।

হ্যাঁ আমি লিপস্টিক মাখি, চোখে আইলাইনার, কাজল সবই দেই। শাড়ি চুড়ি গয়না জিন্স টিশার্ট সবই পরি ইচ্ছে অনুযায়ী। শাড়ি পরতে ইচ্ছে করলে শাড়ি পরি। অন্যান্য কাজে কামিজ বা জিন্স। আমার পোশাক এবং সাজ নির্ভর করছে আমার ইচ্ছে, আমার স্বাচ্ছন্দ্য এবং জায়গা অনুযায়ী। ট্র্যাকিং করতে গেলে আমি শাড়ি পরে যাই না, আবার বিয়ের অনুষ্ঠানে আমি জিন্স পরে যাই না।

দ্বিতীয় বক্তব্য আমি নারীবাদী কিনা এই নিয়ে আমার কঠিন সন্দেহ আছে। মাঝে মাঝে দুই-এক লাইন লিখি মানে এই না আমি কোনও বাদী হয়ে গেছি। আমার যা কিছু করতে ইচ্ছে করে, তা করতে পারলেই আমি খুশি। দিন শেষে একটা কথাই মেনে চলতে চাই, কারও জীবন কেউ যেন নিয়ন্ত্রণ না করে। এটা কোন বাদের আওতাধীন হলে আমি বাদী!

আমি স্বল্প বুদ্ধির মানুষ, বুঝে পাই না যে কেন সাজুগুজু করলে, গহনা পরলে পরাধীন হয়ে যাবে কেউ? আমি যে গহনাটা পরি সেটা আমার টাকায় কেনা, শাড়িও আমার টাকায় কেনা, জিন্সও আমার টাকায় কেনা। (গিফট পাই, সেটা ভিন্ন) আমি অন্যের উপর নির্ভর করে থাকি না কখন আমাকে কেউ শাড়ি গহনা দিবে। আমার ইচ্ছে হলেই আমি সেটা আমার করে নিতে পারি। সেই সামর্থ আমার আছে। সেই অর্থনৈতিক যোগ্যতা আমার আছে ।

এখন আপনারা বলতে পারেন, স্বয়ং বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারীদের গহনার বিরোধিতা করে গেছেন। হ্যাঁ অবশ্যই করেছেন। করার পিছনে কারণ তিনি ব্যাখ্যা করে গেছেন। নারীদের গহনায় মুড়িয়ে পুরুষরা তাদের অধীনের রাখতে চায়, আমরা নারীরা সেই গহনার লোভে অধীনস্থতা স্বীকার করে নেই।

আমার চুড়ির প্রতি লোভ আছে, এই লোভের শিকার হয়ে আমি সেটা বার বার কিনবো। কাউকে কিনে দিতে হবে না এটাই আমার স্বাধীনতা। বেগম রোকেয়া সে সব নারীদের সমালোচনা করে গেছেন, সেই সব নারীদের সাথে এখানেই আমার পার্থক্য।

জিন্স পরলে স্বাধীন, শাড়ি পরলে পরাধীন এই তথ্য কোথায় পাওয়া যায়? অনেকেই ছেলেদের মতো চুলের ছাঁট দেন, ছেলেদের মতোই পোশাক পরেন। তাতে কোন সমস্যা দেখি না। আপনাদের ইচ্ছে যেমন খুশি পরুন। কিন্তু যদি এই মর্মে পরেন যে, শার্ট প্যান্ট যেহেতু ছেলেদের পোশাক এবং ছেলেরা যেহেতু স্বাধীন তাই আমিও এই শার্ট প্যান্ট পরেছি স্বাধীন হওয়ার জন্য, তাহলে যারা শাড়ি পরে দেশ চালায়, তারা কী পরাধীন? নাকি নারীবাদ থিউরিতে আলাদা পোশাকের উল্লেখ আছে কোথাও? নাকি নারীবাদ একটি পেশা যে পেশা অনুযায়ী পোশাক থাকবে! যেমন থাকে পুলিশ ডাক্তারদের!

আপনি প্যান্ট পরেন বলে সবলা, অন্যরা শাড়ি পরলে অবলা হয়ে যায়, তাহলে আপনার সাথে টিজিং করা ছেলেদের পার্থক্য কী? তারাও পোশাক নিয়ে ব্যঙ্গ করে!

পোশাক হচ্ছে স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যাপার। যার যা পরলে আরাম লাগবে, যেমন সাজ করতে আরাম লাগবে সে তেমন পরবে, সাজবে। কারও সাজতে ইচ্ছে করলে যেমন আমার অধিকার নাই তাঁকে ব্যঙ্গ করার, তেমনি কেউ না সাজলেও আমি বলতে পারি না কেন সাজো না! “মেয়ে হয়েছো, কিন্তু কাজলও দাও না একটু” এমন তাচ্ছিল্যের কথা বলার অধিকার রাখি না।

মেয়ে হয়েছে বলে তাঁকে সাজতে হবে, এমন বাণী কই পাওয়া যায়? সাজগোজ ব্যক্তিগত ইচ্ছে। একজন মেয়ের যেমন সাজতে ইচ্ছে করে একজন ছেলেরও করে। তারাও চুলের ফ্যাশনে অনেক পরিবর্তন আনে, কালার করে ,মুখে অনেক কিছু লাগায় ইত্যাদি। এখন কী সে মেয়ে হয়ে গেছে? নাকি যে মেয়ে সাজে না সে ছেলে হয়ে গেছে?

যে চিন্তা এখনো পোশাক আশাক সাজগোজ গহনা চুড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, সে কোনো বাদ’এর মধ্যে পড়ে না। কোনও মতবাদ বাহ্যিক রূপের উপর জন্মায় না। জন্মায় সমাজে এর প্রয়োজনীয়তা এবং প্রায়োগিক উপযোগিতার উপর। পোশাক দিয়ে ফ্যাশন হয়, মতবাদ হয় না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 377
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    377
    Shares

লেখাটি ১,৪৩৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.