বইমেলা নিয়ে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির শেষ কোথায়?

সালমা লুনা:

মানুষই অহংকার করে।
স্বভাবজাতভাবেই কেউ কেউ অহং এর অধিকারী হোন। আবার কেউ যত্ন করে পেলেপুষে অহংকারকে সর্বস্ব দিয়ে নিজের ভেতরে বাইরে লেপে রাখেন।
অহংকার করতে কোনো যোগ্যতা লাগে না। সেই অহংকারই যোগ্য, যাতে মনুষ্যত্বের আলো ঠিকরায় ঝকঝকে সূর্যকিরণ কিংবা স্নিগ্ধ চন্দ্রালোকের মতো। কারোরই তাতে অস্বস্তি হয় না, বরং সমীহ জাগরণের পাশাপাশি স্বীয় ক্ষুদ্রতা অনুসন্ধানে সচেষ্ট হয় মানুষ।

এবারের বইমেলা নিয়ে ফেসবুকে কাদা ছুঁড়াছুড়ি জাতীয় কিছু বিষয় চোখে পড়লো। লিখতে হলে অন্যকে হেয় করতে হয়, নিজের লেখাটিকে নানা আকারে প্রকারে উত্তম দাবি করে নানা আয়োজনের সাথে অন্যের লেখাকে আবর্জনা জ্ঞানে ঘেঁটে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে দেয়ার কাজে মনোনিবেশ করতে হয় – সেসব দেখে এটাই বুঝলাম।

এটি বুঝি কেবল শুরু !
সামনে আরো আছে দিন। সেসব সুদিনই হবে – এই আশা দূরীভূত হচ্ছে ধীরে ধীরে।

সেদিন এক স্টলে একটি বাচ্চা মতো মেয়ে কিছুতেই আমার পছন্দের দুটা বই খুলে মেলে দেখতে দিচ্ছে না। বিরক্ত করছিলো একটু পরপর একটা বই ঠেলে দিয়ে, ‘আপু এটা নেন, খুব ভালো লিখেছে, পড়লে ভালো লাগবে।’
আমি বইগুলো দেখছিলাম উল্টেপাল্টে। ব্যাঘাত হচ্ছিলো। তার দেয়া বইটা একটু পাতা উল্টে দেখলাম। এরপর পাশে সরিয়ে রেখে আমার বই দুটার দাম কতো জিজ্ঞেস করায় মেয়েটি বললো ওইটা নিবেন না?
আমি হেসেই বলি, নাহ। আজ আর নেই না।
মেয়েটি মরিয়া হয়ে বললো, পড়ে দেখবেন ভালো লাগবে।

আমি হেসে খুব সুন্দর করে না বলে কত হয়েছে জিজ্ঞেস করায় মেয়েটা পূর্ণদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে বললো, বইটা আমি লিখেছি।
বলেই আমার কাছ থেকে দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। চোখে বালিকাসুলভ অভিমানী দৃষ্টি।
শেষে অন্য একজন এসে বইদুটো প্যাক করে টাকাটা নিলো।
আমি যারপরনাই লজ্জিত হলাম। কিন্তু শুধুই বালিকাকে খুশি করতে বইটা কেনার মতো সাহস অর্জন করতে পারলাম না কিছুতেই।

পরশু দিনের মেলায় ঘুরাঘুরি করি। একলোকের বগলে কিছু বই। সামনে এসে আমাকে বললেন, আপা মনে হয় লেখালিখি করেন !

আমি থতমত করে হ্যাঁ না এর মাঝামাঝি কিছু বললাম কীনা, এরমধ্যেই তিনি নিজের বগলে চেপে ধরা বই দেখিয়ে বললেন, ‘আমিও লেখালেখি করি, আমার বই বেরিয়েছে এবার।’

আমি কিছু বলতে পারিনি। তাকিয়েছিলাম বিব্রত হয়ে। উনি আমাকে এই অবস্থায় রেখে সরে গেলেন সামনে থেকে।

ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে সূচীপত্রের আমন্ত্রণে গিয়েছি দীপনপুর। সেখানে প্রকাশক লেখক এবং পাঠকের মিলনমেলা নামক অনুষ্ঠান। বিখ্যাত লেখক কবি সাহিত্যিকদের পাশাপাশি নবীন লেখক যাদের বই সূচীপত্র প্রকাশ করেছে তারা বেশীরভাগই উপস্থিত ছিলেন।

প্রকাশক সেদিন আমার হাতেও মাইক ধরিয়ে দিয়ে কিছু বলতে বললেন।

বক্তা নই ভালো, তবুও কিছু কথা কী বলবার থাকে না মানুষের?
মনের কথাগুলোই তাই বললাম, লেখক পাঠক এবং প্রকাশকরা এখন ফেসবুক ব্যবহার করেন। যেহেতু তাদের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই সামাজিক মাধ্যমের সুবিধা কাজে লাগিয়েও তো তারা পরস্পরকে উদ্ধার করতে পারেন! এবং সেটির উদ্যোগ কে নেবে? নিশ্চয়ই প্রকাশক। লেখক বাছাই করে প্রকাশক সুযোগ দিলেই না পাঠক আর লেখকের জানাশোনা হবে।

আমি লেখক নই। লেখক হবো সেই ইচ্ছা ছিলো বটে।
তা এক কবিকে সেকথা বলায় তিনি বললেন, বয়সটা আরেকটু কম হলে আর আরেকটু স্লিম হলে সম্ভব ছিলো।
বয়স কমানোটা আমার হাতে নেই। আর লেখক হতে গিয়ে আগে ক্ষীণাঙ্গি হবো অতটা করতে প্রাণে বাঁধলো। তাই বুঝি আর লেখক হওয়া হলো না আমার।

আমার বক্তব্যে হাস্যরস হলেও বিষয়টা নারী লেখকদের জন্য একটু ভাবনার কিন্তু।

চমৎকার কথা বললেন একজন প্রবীণ সাংবাদিক এবং কবি। তাঁর বক্তব্যের সার অংশ অনেকটা এরকম – তোমার যদি কলমে লেখা বেরোয়, সেটি যদি পাঠকের কাছে সুপাঠ্য হয় তবে তুমি যেখানেই থাকো লিখতে থাকো। বিশেষ কোন জায়গায় তোমাকে লিখার দরকার নেই। পাঠকই তোমাকে খুঁজে নেবে।’
এই কথাটা একদমই সূর্যালোকের মতো সত্য এবং সবারই পছন্দ হয়েছে।

তবে কথা সর্বাংশে সত্য হলেও সময় বদলেছে বলে এখন একটু প্রচার লাগে বৈকি। সেই প্রচার কি নিজের অহং বিসর্জন দিয়ে? কিংবা অযোগ্য অহংকারে অন্যকে ধূলায় গড়াগড়ি খাইয়ে? অন্যের গায়ে নিজের ঘিনঘিনে ঈর্ষাপ্রসূত কাদা ছুঁড়ে দিয়ে?

এমনটিও তো সাহিত্য অঙ্গনে একেবারেই অনভিপ্রেত, অনাকাঙ্খিত।

শেয়ার করুন:
  • 218
  •  
  •  
  •  
  •  
    218
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.