ফ্যাশন আর ধর্মের মাঝে আটকা পড়েছে পর্দা

0

সাবরিনা স. সেঁজুতি:

আমার উপর দায়িত্ব পড়লো বড়মা-কে নিয়ে মেজো মামার বাসায় বেড়াতে যাবার। বড়মা মানে আমার নানা ভাইয়ের আম্মু। তখন বয়স আমার ৬/৭, কিনবা আরো কম হবে। বড়মা আর আমি মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা রিক্সা করে যাবো না, হেঁটে যাবো। রিক্সা নেয়াটা যে খুব জরুরি তা নয়, তবু এতোটুকু দূরত্বে ঢাকার অনেকেই রিক্সা ব্যবহার করেন। বড়মা তাতে রাজি নন। আমার কাছেও ব্যাপারটা বেশ উত্তেজনাময় এবং একই সাথে এডভ্যাঞ্চারাস মনে হয়েছিল সেই বয়সে।

পরের দিন দুজনে সুন্দর জামা কাপড় পরে তৈরি। বাসা থেকে বের হবো, ঠিক দরজার কাছে এসে বড়মা বললেন, “দাঁড়া দাঁড়া, ছাতা নিতে হবে।“ আমি বললাম, “ছাতা কেন বড়মা? বাইরে তো বৃষ্টি নাই।“ বড় মা বললেন, “আরে বৃষ্টির জন্য না, ছাতা সাথে নিতে হবে পর্দার জন্য”।
“পর্দা?” আমি তো অবাক! বয়স কম বলেই হয়তো কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছিল না যে ছাতা আর পর্দার মাঝে যোগসূত্রটা কোথায়! মনে মনে ভাবলাম, ছাতা আর পর্দা কি এক হলো নাকি? বড়মা এসব কী বলে?
এদিকে বড়মায়ের যেই বলা সেই কাজ, ঘরের ভিতর থেকে বিরাট এক কালো ছাতা নিয়ে হাজির। ব্যস! আমরা রোদ বৃষ্টি ছাড়াই ছাতা মাথায় দিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলাম।

কালো ছাতা মাথায় দিয়ে আমরা দুজন হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি, আর যখনই রাস্তায় অপরিচিত কেউ আমাদেরকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন, বড়মা সেদিকে ছাতাটা কাত করে ধরছেন, অনেকটা ঢালের মতো। আমি ভাবলাম, সাথে একটা তলোয়ার হলে মন্দ হতো কি? এই ছাতা তো শুধু পর্দা নয়, এ হলো পর্দা কাম হাতিয়ার। শিশুকালের অতিকল্পনা বলতে পারেন। মূলত অপরিচিত লোকের কাছ থেকে নিজেকে আড়াল করাই ছিল ঐ ছাতা কাম পর্দার মূল ব্যবহার।

ছাতা, মানে বড়মায়ের পর্দা বিষয়ক এই স্মৃতিটি এখনো আমার মস্তিষ্কে একদম স্পষ্ট, ঠিক যেমন স্পষ্ট বড় মায়ের সেই আকর্ষণীয় সাদা পোশাক। তখন অবশ্য সাদা পোশাকের পেছনের ইতিহাস বা গুরুত্ব কোনটাই আমার জানা ছিল না। জানলেও কতটা বোধগম্য হতো কে জানে। ঠিক যেমন কখনই বোধগম্য হয়নি নানুর শাড়ির ওপরে ওড়না জড়ানোর কারণটা। চমৎকার টাঙ্গাইলের শাড়ির উপরে একটা একরঙা ওড়না যে কেন জড়াচ্ছে নানু, যখনই দেখতাম মনে প্রশ্ন জাগতো, জিজ্ঞাসা করলে বলতেন, এটা পর্দা।

দেশে তখনো পর্দা বিষয়ক আদিখ্যেতা শুরু হয়নি। তাই বোরকা পরা নারীর সংখ্যাও ছিল কম। পর্দা বলতে ঐ, মাথায় ঘোমটা বা নানুর মতো একটা অতিরিক্ত ওড়না। আর বোরকা মানে বৃদ্ধা, দরিদ্র গরমে হাঁস-ফাঁস করা এক চিত্র। মা-খালার জেনারেশন তখন শাড়ি ছেড়ে সালোয়ার কামিজ ধরি ধরি করছেন। আর গ্রামের দৃশ্য বেশ শোচনীয় বলা চলে। অনেকেরই একখান শাড়িই মূল পোশাক। ব্লাউজ-পেটিকোট তখনো বিলাসিতা। বালিকাবেলায় নারী পোষাক বিষয়ে এর বেশি জ্ঞান লাভের সুযোগ আমার হয়নি ।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্পনের পর এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর হঠাৎ করেই যেন আমার চিরচেনা ঢাকার মেয়েগুলো অচেনা হয়ে গেল। অনেকেই পোশাককে ফ্যাশন, বিলাসিতা আর ধর্মের সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করে ফেললো।
আমার মারাত্মক স্মার্ট, ড্যাশিং বান্ধবী যে কিনা দুদিন আগেও পার্লারে যেয়ে শরীরের এখানে সেখানে হেয়ার রিমুভিং আর চুল স্ট্রেট করা নিয়ে ব্যস্ত ছিল, হঠাৎ-ই একদিন তাকে আবিষ্কার করলাম ভারি মেকাপ আর মাথায় উঁচু করে রঙ্গিন কাপড় পেঁচানো অবস্থায়। অবাক হয়ে ঘটনা কী জানতে চাইলে যা উত্তর পেলাম, তা বড়মায়ের ছাতা বিষয়ে উত্তরের চেয়েও অবাক করেছিল সেদিন আমাকে।

বান্ধবী ফিসফিস করে বললো, “পর্দা দিয়ে শুরু করলাম রে!” আমি বুঝতে পারিনি, পর্দা দিয়ে আসলে কী শুরু করলো? তবে উত্তর দেবার ভঙ্গিতে এতোটুকু বুঝেছিলাম যে সে ধর্ম পালন বা স্বামী আজ্ঞা পালন টাইপের কিছু ইঙ্গিত করছে। তাই চুপ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেছি সেদিন।
যদিও কিছুদিন পরে উপলব্ধি হলো এই শুরু সেই শুরু নারে বোকা! এতো ফ্যাশন ট্রেন্ড। ভাবলাম, ক্ষতি কি, কত রকম ফ্যাশনই তো করেছে বাংলাদেশি মেয়েরা, এখন না হয় একটু মালয়েশিয়ান ফ্যাশন করলো।

আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের বেশ সাদামাটা তরুণী তখন। ফ্যাশন ট্রেন্ডের সাথে চট জলদি ওয়্যারড্রবের সকল জামা কাপড় বদলে ফেলা আমার পক্ষে আর্থিকভাবে সম্ভব নয়। তাছাড়া হিজাবি ফ্যাশন আমার কাছে বেশ ব্যয়বহুলই মনে হয়, কারণ প্রতিটা জামার সাথে মিলিয়ে স্কার্ফ, মাথার ব্যান্ড, তার সাথে মিলিয়ে নেইলপলিশ, আংটি, আরো কত কী! আমার পক্ষে এতো কিছু একসাথে সংগ্রহ করা অসম্ভব। আমি তো এমন জামা বানাই যাতে পুরোনো সালোয়ার আর ওড়না দিয়েই কাজ চলে যায়। তাই ফ্যাশন ট্রেন্ডের সাথে গা ভাসানো হয়নি তখন।

তাছাড়া ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকেরই মনে হতে পারে হিজাবিদের এই নানা রকম মেকাপ এবং কাপড় চোপড় অযথা অপচয় এবং নিজেকে আকর্ষণীয় করে তোলার আরেকটি উপায় মাত্র, যা কিনা ধর্মীয় হিজাবের ঠিক বিপরীত। কিন্তু বিশ্বাস করুন, একজন ফ্যাশন সচেতন ব্যক্তির কাছে এসব অপরিহার্য। তাই ফ্যাশন থেকে দূরেই ছিলাম সব সময়।
যখন নিজের সামর্থ্য হয়েছে তখন অভ্যাসই নষ্ট হয়ে গেছে।
অর্থাৎ তখন ফ্যাশন অনুকরণ করার অভ্যাসটাই আর থাকেনি। তবে এই হিজাবি ফ্যাশন দেখে সব থেকে বোকা হয়েছি যখন দেখেছি কেউ কেউ এই ফ্যাশনটাকে ধর্মের সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে একাকার করেছেন। আর বিপদে ফেলেছেন সত্যিকারের ধার্মিক নারীদের, মানে যারা আসলে পর্দা দিয়ে শুরু করেননি, অনেক আগেই থেকেই যারা ধর্মের অন্যান্য বিধি নিষেধ মেনে চলছেন, এবং অযথা অপচয় বা পর্দা করার অছিলায় নিজেকে আকর্ষণীয় করা থেকে দূরে থেকেছেন।

নারী পোষাক নিয়ে সমালোচনা বাজারের আনন্দদায়ক বিষয়ের মধ্যে একটি। সুযোগ পেলেই নারী পুরুষ উভয়ই তা নিয়ে কথা বলেন এবং জ্ঞান দেন। তবে পোষাক এবং পর্দার নানাবিধ ব্যবহার দেখে আমি সমালোচনাও করতে চাচ্ছি না, আবার জ্ঞান দিতেও চাইছি না, তবে নানা মুনির নানা মতে আমি যে দ্বিধায় পরি সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আর তখন ছোট বেলার বড়দের মুখে শোনা একটা কথা খুব মনে পড়ে, তাহলো, “পর্দা থাকতে হয় মনে। মনের পর্দা উঠে গেলে, শরীরের পর্দার কোনো দাম নাই। ঠিক যেমন ছেলেদের পর্দা থাকতে হয় চোখে”।

কথাগুলো তখন দুর্বোধ্যই মনে হতো, এখন মনে হয় একটু একটু বোধগম্য হয়ে উঠছে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 622
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    624
    Shares

লেখাটি ২,৩৬৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.