জেবার গল্পটা একটু অন্য রকম

0

রুশদ ফরিদী:

কিছুদিন আগে উইমেন চ্যাপ্টারে একটা লেখা পড়লাম। পড়ে বেশ ভালো লাগলো। লেখাটা হচ্ছে ‘গল্পটি শুধুই রেবা রহমানের’। সেখানে ষাটের কাছাকাছি বয়সী এক নারীর কথা বলা হয়েছে। যিনি বৃদ্ধ বয়সে এসে উপলব্ধি করেছেন যে সারাজীবন তিনি সংসারের ঘানি টেনেছেন। ছেলেপিলেকে বড় করেছেন। এখন সময় হয়েছে নিজেকে সময় দেয়ার। তিনি এখন রংপুর শহরে একা নিজের মতোন থাকেন। তার ছেলেমেয়েরা তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন। তিনি সৌখিন ফটোগ্রাফার এবং তাঁর ফটো আবার আন্তর্জাতিক পুরষ্কারও পায়।

মোদ্দা কথা তিনি জীবনের শেষ বেলায় এসে নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন। এই বয়সে এসে আর দশটা পাচঁজন নারীর মতন ছেলেমেয়ের ঘাড়ে বসে নাতি নাতনীর দেখভাল করে জীবন গুজরান করেননি। এটা সত্যি একটা খুবই অনুপ্রেরণা দায়ক গল্প।

কিন্তু এর মধ্যে কোথায় যেন একটা বেদনার ছায়া আছে। রেবা রহমান অবশ্যই অন্য রকম। কিন্তু সেই অন্য রকম মানুষের জীবন কি আরেকটু অন্য রকম হতে পারতো না? কেন তাকে এসে জীবনের শেষবেলায় নিজেকে খুঁজে পেতে হলো? জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়গুলোও কি আরেকটু অর্থবহ কাটাতে পারতেন না?
সেতো গেলো রেবা রহমানের গল্প।

এ প্রশ্নগুলোর উত্তরই খোঁজা যেতে পারে একালের জেবা রহমানের জীবন থেকে।
কিন্তু একালের জেবা রহমানের গল্পটা কেমন হতে পারে?

রেবা রহমানের ষোল বছর বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। বিশ বাইশ বছরের মধ্যে তিনি তিন সন্তানের মা হয়ে যান। অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও লেখাপড়া করতে পারেননি, গান শিখতে পারেন নি।

জেবা রহমানের পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী বাবা জেবাকে ঠিক ষোল বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিতে চেয়েছিলো। তাঁদের বংশের ঘরানাই এরকম। জেবা ছোটবেলা থেকে তাঁর খালাতো ফুফাতো বোনদের বেলায় তাই দেখে এসেছে। কিন্ত জেবা বলেছে সে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে। পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগে কোনমতেই বিয়ে করবে না। পড়াশোনায় সে খারাপ না। জেএসসিতে জিপিএ ফাইভ আছে। ও অংকে অনেক ভালো। চোখের সামনে স্বপ্ন হচ্ছে সামনে ম্যাথ অলিম্পিয়াডে নাম লেখাবে। এইসব এইসব ফালতু এক মুশকো জোয়ান লোকের সাথে বিয়ে করে জীবন বিসর্জন দেয়ার কোনো মানেই সে দেখতে পায় না।

বাসায় তখন মোটামুটি আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে। বাবা বলেছে, এই বিয়ে যদি না হয় তাহলে বংশের মুখে কালি পড়বে। হয় বাবা এই বাড়িতে থাকবে, নয় জেবা বাড়িতে থাকবে। মা দিনরাত কান্নাকাটি করছে। ছোট বোন দু’টো ভীত চোখে ঘুরাঘুরি করছে। আত্মীয় স্বজন এসে বোঝাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু কাজ হচ্ছে না। জেবা মুখ শক্ত করে যে বসে আছেই তো আছেই, বিয়ের পিঁড়িতে সে কিছুতেই বসবে না।

জেবার কঠিন জেদ দেখে বাবা তাঁর শেষ চাল চাললেন। বললেন, জেবা বিয়ে না করলে জেবাকে তাঁর বাবার লাশের উপর দিয়ে স্কুলে যেতে হবে। জেবা এতে এক্কেবারে ভেঙ্গে পড়লো। আর এদিকে মায়ের কান্নার জোর আরো বেড়ে গেলো। আত্মীয় স্বজন, মুরুব্বীরা অভিশাপ দেয়ার মতন করে বলতে লাগলো দেখ তোমার জন্য আজকে এই সোনার সংসার উচ্ছন্নে যেতে বসেছে।

জেবার কিশোরী মন এই চাপিয়ে দেয়া অপরাধ বোধের ভার বেশীদিন বইতে পারলো না। একসময় রাজী হয়ে গেল।
মুহুর্তে বাড়িতে এক আনন্দের ঢেউ খেলে গেলো। সবাই মিলে এক সম্মিলিত স্বস্তির নিঃস্বাস ফেললো।
সেই রাত্রিতেই জেবা পালালো। পালিয়ে বনানীতে এক বান্ধবীর বাসায় উঠলো।

যাই হোক এরপর অনেক লম্বা কাহিনী। অনেকদিন গেল, অনেক জল গড়ালো, জেবাকে নিয়ে হাজার ধরনের ঘটনা ঘটলো। তারপর একসময় বাবা-মা যখন বুঝলো আর কিছু করার নেই, জেবা বিয়ে করবেই না। একসময় ফিরিয়ে আনলো। আত্মীয় স্বজন রা বোঝালো আচ্ছা আমরা চলেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত অপেক্ষা করি। এর পরে নিশ্চয়ই জেবা আর আপত্তি করবে না।

যাই হোক বছর তিনেক গেলো। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার শেষ পরীক্ষা ছিলো বায়োলজি। সেদিন রাতেই মা কথা পাড়লেন।
জেবু, তুই তো জানিস, তোর বাবা কত দুঃখ পেয়েছে তোর বিয়ে নিয়ে। এবার পড়াশোনা তো অনেক হলো, এখন ঘর সংসার কর মা।

জেবা মুখ ঘুরিয়ে বললো, দেখি। সামনে ইউনিভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষা, পড়াশোনার অনেক চাপ। এই সময় এই ঝামেলা নিতে পারবো না। সাথে সাথে মায়ের চেহারা পাল্টে গেলো। ওই পোড়া মুখপুড়ী জাতীয় বেশ কিছু বাছা বাছা গালি গালাজ করলেন মিনিট দশেক ধরে। তারপর কাঁদতে বসলেন।
এরপর থেকে আবার শুরু হয়ে গেলো প্রতিদিন একই কাহিনী, একই মানসিক অত্যাচার। জেবা বুঝতে পারলো, এভাবে চললে তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার স্বপ্ন পাটে উঠবে।

কিছুদিন পরে, ব্যাগ ট্যাগ গুছিয়ে বগুড়াতে ছোট চাচার বাসায় চলে গেল। একমাত্র এই ছোট চাচাই তাঁকে সব সময় পড়াশোনায় উৎসাহ দিয়েছে। বলেছে যে মা, বিয়ে সন্তান, শুধু এসবের জন্য মেয়েদের জন্ম হয় নাই। মেয়েদের জীবনে আরো অনেক কিছু করার আছে। ওই কথাগুলোই জেবার জীবনে দাগ কেটে গেছে।
এরপর আরো অনেক কেচ্ছা কাহিনীর পর জেবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ম্যাথমেটিক্স বিভাগে ভর্তি হলো। বাবা-মা আর আত্মীয় স্বজনের বিয়ে নামক অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচার জন্য রোকেয়া হলে এসে উঠেছে।

ফোর্থ ইয়ারে উঠে জি আর ইর জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করলো। অংক শাস্ত্রের শেষ দেখে নেয়ার ইচ্ছে তাঁর। তাই এখন টার্গেট পিএইচডি করে শিক্ষকতা আর গবেষণা করার। মাস্টার্সের পড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে ইউনিভার্সিটি অফ কলাম্বিয়াতে এডমিশন পেয়ে গেলো।

এইসবই জেবা করেছে পুরোপুরি বাবা-মা, আত্মীয় স্বজনের অগোচরে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে এবং পরে,প্রতিটি বছর,প্রতিটি সময় তাকে শুনতে হয়েছে বিয়ে করো্‌ সংসার করো ,সন্তান নাও। সে প্রাণপণে চেষ্টা করে গেছে এটিকে প্রতিরোধ করার। এখন অবশেষ পেতে যাচ্ছে মুক্তির টিকেট। এমন এক দেশে যাচ্ছে,আর এমন এক পরিবেশে যেখানে রাত দিন পড়াশোনা নিয়ে থাকা যাবে। বিয়ে নামক এই দুষ্টগ্রহের হাত থেকে অবশেষে রেহাই পেতে যাচ্ছে।
এমন সময়ে কিভাবে খবর পেয়ে বাবা-মা সহ চৌদ্দ গুষ্ঠী আত্মীয় স্বজন জেবার হলে এসে হাজির। এসে সে কি আহাজারি। তাঁদের পরিবারে মেয়ে অবিবাহিত, একা অবস্থায় আমেরিকার মতন দেশে যেয়ে থাকবে এই ব্যাপারটি মেনে নেয়া তাঁদের পক্ষে মোটামুটি অসম্ভব। শুরু হয়ে গেল আরেক রাউন্ডের নরক গুলজার।

দশ পনের বছর পরের কথা। জেবা পড়শোনা, পিএইচডি, পোস্টডক, ইত্যাদির পাট চুকিয়ে এখন দেশের প্রথম সারির এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথমেটিক্স ডিপার্টমেন্টের শিক্ষিকা। সে এখনও বিয়ে করেনি। একাই থাকে একটা ফ্ল্যাটে।
বাবা-মা একেবারেই হাল ছেড়ে দিয়েছেন খুবই মর্মাহত হয়ে। নাছোড়বান্দা কিছু আত্মীয় স্বজন এখনও প্যান প্যান করেন দেখা হলেই।
জেবার বন্ধুরা মাঝে মধ্যেই ওকে জিজ্ঞেস করে, কিরে জেবা তুই এই জীবনে কি বিয়ে করবি না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিস?
জেবা বললো, না দেখ, তোরা যেরকম মনে করছিস, ব্যাপারটা কিন্তু সেরকম না। আমার কিন্তু কখনই বিয়ে করতে আপত্তি ছিলো।
বন্ধুরা আকাশ থেকে পড়লো। কিরে কি বলিস? আমরা থেকে শুরু করে তোর চৌদ্দ গুষ্ঠী আত্মীয়স্বজন জানে যে তুই মরণ পণ করছিস, বিয়ে করবিনা।
জেবা মৃদু হেসে বলে, সেরকম কিছু না। আমি আসলে বিয়ে করতে চেয়েছি আমার নিজের ইচ্ছায়। সমাজ, সংসার আর বাবা-মার চাপে পড়ে বিয়ে করাটা আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি নাই। বিয়ে করবো, একটা মানুষের সাথে জীবন কাটাবো? কত বড় ব্যাপার। সেটা কেন আমি অন্যের ইচ্ছায় করবো?
বাহ ভালো! ভালো কথা! কিন্তু এখনতো করতে পারিস, ইন ফ্যাক্ট আরো আগে থেকেই তো পারতি। তুই অনেকদিন ধরেই স্বাধীন ভাবে বাস করছিস।
হ্যাঁ পারতাম, কিন্তু সেই ইচ্ছেটাই তো আসে নি কখনও আমার মধ্যে।
কেন?
দেখ, বিয়ে করা মানেই আমাদের এই বাংগালী ফ্যামিলিতে সন্তান উৎপাদনের প্রক্রিয়া।
সন্তান হলে অসুবিধা কি? তুই তো ছোট বাচ্চাদের অনেক পছন্দ করিস।

বাচ্চাদের পছন্দ করা এক জিনিস আর সেই বাচ্চাকে মানুষ করতে গিয়ে নিজের জীবন দিয়ে দেয়া অন্য জিনিস। অন্য কিছু মনে করিস না, দিনের শেষে বাচ্চা উৎপাদন করা আমাদের জন্য এক ধরনের এন্টারটেইনমেন্ট। একটা বাচ্চা আসা একটা পরিবারের সবার জন্য অনেক আনন্দ। আর বাচ্চা আসা মানেই হচ্ছে এই বিশাল দায়িত্ব, এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার কোন উপায় নেই। নিজের যা কিছু স্বপ্ন, যা কিছু অর্জন করার আকাংখা সব তখন বিসর্জন দিতে হয়।
আরে বাবা এভাবেই তো যুগে যুগে চলে আসছে। মেয়েরাই তো স্যাক্রিফাইস করে।

কিন্তু কেন? মেয়েরাই কেন করবে? যেই মেয়েটি একটি বিরাট ডাক্তার হতে পারে, ডাকসাইটে ইঞ্জিনিয়ার হতে পারে,ফাটাফাটি নৃত্যশিল্পী হতে পারে, সে কেন তাঁর সাধের স্বপ্নের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়ে সন্তান পালন করবে? একটা, দু’টো নতুন মানব সন্তান পৃথিবীতে নিয়ে আসার চেয়ে সেই প্রতিভার লালন, পালন এবং বিকাশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ না? তাঁর চেয়ে ওই মেয়েটির ডাক্তারী প্রতিভা, ঐ মেয়েটির ইঞ্জিনিয়ারিং দক্ষতা, ঐ মেয়েটির নৃত্যের মায়াজাল এই সমাজ বা পৃথিবীর জন্য অনেক মূল্যবান হতে পারতো না? আরেকটি মানুষ পৃথিবীতে আনার জন্য কেন এই পৃথিবী এই প্রতিভাবান মানুষদের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ থেকে বঞ্চিত হবে?

জেবা কঠিন মুখে বলতেই থাকে ………

যেই মেয়েটির সন্তান, সংসার নিয়ে জীবন যাপন করতে ইচ্ছে করবে, সে তাই করবে। যার ইচ্ছে করবে না, সে করবে না। কেন তাঁর পেছনে পুরো সমাজ, আত্মীয় স্বজন বাবা-মা লেগে যাবে বিয়ে করানোর জন্য, কেন? মেয়েদের কি স্বাধীনতা নেই নিজেদের মতন থাকার? নিজের জীবন নিজের মতন উপভোগ করার?
আমার জীবন হচ্ছে মেয়েদের প্রতি এই প্রচলিত ধ্যান ধারণার বিরুদ্ধে আঘাত। আমি আমার মতন চলবো। যখন খুশী বিয়ে করবো। ইচ্ছে না হলে করবো না। বিয়ে করলেও সন্তান নেবো কিনা সেটা জানি না। আমার জীবনের এখনো অনেক স্বপ্ন আছে। আমি চাই এই দেশের মেয়েদের একটা বড় অংশ ম্যাথমেটিক্স এবং অন্যান্য কোয়ান্টেটিভ স্কীল বাড়ুক। এজন্য আমার স্কুল লেভেল থেকে কিছু কাজ করার ইচ্ছে। এইজন্য আমাকে অনেক সময় দিতে হবে। একটা শিশুকে এই পৃথিবীতে নিয়ে আসলে আমার এই সব স্বপ্ন শিকেয় উঠবে। তাঁর চেয়ে আমার স্বপ্নের পেছনে ছোটা এই দেশ আর সমাজের জন্য অনেক উপকারী কি না?
বন্ধুরা কি উত্তর দেবে কিছু ভেবে পেলোনা।

রেবা শেষ জীবনে এসে নিজেকে খুঁজে পেয়েছিলেন। আর জেবা প্রথম জীবন, সেই ষোল বছর থেকেই নিজেকে খুঁজেছে, নিজের মতন চলার চেষ্টা করেছে। দু’জনেরই সংগ্রাম ভিন্ন, আঙ্গিক ভিন্ন। কিন্তু আমার মনে হয় জেবাকে অনেক কঠিন একটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। এবং এর বিনিময়ে তাঁর প্রাপ্তির ঝুলিও ছিল অনেক বেশী। আশা করা যায় সামনের জীবনগুলোতে সেই প্রাপ্তি আরো বেড়েই চলবে।

জেবা এবং তাঁর সতীর্থ যারা এই বিশাল সংগ্রামে রয়েছেন এই প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থাকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে, তাঁদের প্রতি রইলো অনেক অভিনন্দন এবং শুভ কামনা।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 572
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    572
    Shares

লেখাটি ২,৯৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.